নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.) দশম হিজরির জিলহজ মাসে আরাফার ময়দানে বিদায় হজের ভাষণ প্রদান করেন। এ ভাষণ ছিল একটি সর্বজনীন মানবিক ঘোষণা, যা কালো, সাদা, আরব, অনারব সব মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এ ভাষণ ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিকসহ সবদিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। সেই ভাষণ থেকে নির্বাচিত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ উল্লেখ করা হলো।
আল্লাহভীতি : নবীজি (সা.) ভাষণের শুরুতে মহান আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং তাকওয়ার (আল্লাহভীতি) গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘হে মানুষ! তোমাদের প্রভুর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করো, যিনি তোমাদের একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সহিহ বুখারি)
জাতিগত অহংকারের অবসান : নবীজি (সা.) এই ভাষণে বংশ, ভাষা, জাতি ও বর্ণভিত্তিক সব ধরনের বৈষম্য বাতিল করেছেন। তিনি বলেন, ‘হে মানুষ! তোমাদের প্রভু এক। তোমাদের পিতা এক। কোনো আরবের ওপর অনারবের বা অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো সাদা মানুষের ওপর কালো মানুষের বা কালো মানুষের ওপর সাদা মানুষের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শ্রেষ্ঠত্ব শুধু তাকওয়ার ভিত্তিতে।’ (বায়হাকি)
মানবাধিকার রক্ষা : মানুষের নিরাপত্তা, সম্পদের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিত্বের সম্মান রক্ষাই একটি আদর্শ সমাজের ভিত্তি। নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমাদের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান পরস্পরের জন্য হারাম, যেমন এই দিন (আরাফাতের দিন), এই মাস (জিলহজ) এবং এই শহর (মক্কা) পবিত্র।’ (সহিহ বুখারি)
আমানত রক্ষা : নবীজি (সা.) সেদিন বলেছিলেন, ‘তোমাদের কাছে যা আমানত রাখা হয়েছে, তা আদায় করো।’ আমাদের চাকরি, নেতৃত্ব, সম্পদ কিংবা সম্পর্ক সবকিছুই আমানত। প্রতিটি ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা ও বিশ্বস্ততা মুসলমানের অপরিহার্য গুণ হওয়া উচিত।
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা : নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘নারীদের সম্পর্কে আল্লাহকে ভয় করো। তিনি নারীর অধিকার রক্ষা, সদ্ব্যবহার এবং দাম্পত্য জীবনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন।’ হাদিসে এসেছে, ‘নারীদের ব্যাপারে আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি। তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো। তারা তোমাদের সহচর। তাদের ওপর তোমাদের যে অধিকার আছে, তেমনি তাদেরও তোমাদের ওপর অধিকার আছে।’ (সহিহ মুসলিম)
সুদ নিষিদ্ধ : বিদায় হজের ভাষণে নবীজি (সা.) সুদের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেন। নবীজি (সা.) বলেন, ‘জাহেলি যুগের সব সুদ বাতিল করা হলো। প্রথম যে সুদ আমি বাতিল করছি, তা আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ।’ (সহিহ মুসলিম)
অধিকার রক্ষা : নবীজি (সা.) প্রত্যেকের অধিকার আদায়ের তাগিদ দেন। তিনি বলেন, সব ঋণ পরিশোধের যোগ্য, ধারকৃত বস্তু ফেরতযোগ্য, জামিনদার জরিমানা আদায় করতে বাধ্য থাকবে। কারও জন্য তার অপর ভাইয়ের কোনো কিছু বৈধ নয়, যতক্ষণ না সে নিজে সন্তুষ্টচিত্তে তা প্রদান করে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া)
কোরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা : নবীজি (সা.) জীবনের পথনির্দেশনার জন্য কোরআন ও হাদিসের ওপর অটল থাকার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ‘আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা এ দুটির ওপর অটল থাকবে, ততক্ষণ পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব (কোরআন) এবং আমার সুন্নাহ।’ (মুয়াত্তা মালেক)
দ্বীন প্রচার : ইসলামের বার্তা প্রচার করা এবং সৎকর্মে অন্যদের উৎসাহিত করা মুসলমানের দায়িত্ব। নবীজি (সা.) তার ভাষণে বলেন, ‘যারা এখানে উপস্থিত আছে, তারা যেন অনুপস্থিতদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়। হতে পারে যে বার্তা গ্রহণ করবে, সে এখানে উপস্থিত ব্যক্তির চেয়ে বেশি উপকৃত হবে।’ (সহিহ বুখারি)
শয়তানের ব্যাপারে সতর্কতা : শয়তান মানুষের চিরশত্রু। নবীজি (সা.) আমাদের সতর্ক করে বলেন, শয়তান মানুষকে বড় গুনাহ দিয়ে ধ্বংস করতে না পারলে ছোট ছোট গুনাহের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পতনের পথে নিয়ে যায়। হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা গুনাহকে তুচ্ছ করে দেখো না, কেননা ছোট ছোট গুনাহও একত্র হয়ে পাহাড়সম হয়ে যায়।’ (তাবারানি)
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক