আজান ধ্বনিত হলে মুমিনরা ছুটে আসে আল্লাহর ঘরের দিকে। কিছু সময়ের জন্য তাদের দুনিয়ার সব ব্যস্ততা পেছনে পড়ে থাকে। তারপর নামাজ শেষ হয়। আবার শুরু হয় কর্ম। ইসলাম এখানেই তুলে ধরে জীবনের এক অনন্য সৌন্দর্য। ইবাদত ও কর্মকে মুখোমুখি দাঁড় করায় না। বরং এক সুতোয় গেঁথে দেয়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করো। আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা জুমুআ ১০)
এই আয়াত মুসলমানদের জীবনদর্শন স্পষ্ট করে দেয়। নামাজ শেষে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে আল্লাহর অনুগ্রহ, অর্থাৎ হালাল জীবিকা অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ থেকে বোঝা যায়, হালাল উপার্জন ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। এটি শুধু দুনিয়াবি প্রয়োজন নয়। বরং সঠিক নিয়ত থাকলে এটিও ইবাদত। নিজের পরিবারকে হালাল খাদ্য দেওয়া, তাদের ভরণপোষণ দেওয়া এবং মানুষের মুখাপেক্ষী না হওয়া একজন মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
জীবিকার জন্য চেষ্টা করা মানেই আল্লাহর ওপর ভরসা কমে যাওয়া নয়। বরং ইসলাম শিক্ষা দেয়, মানুষ চেষ্টা করবে, আর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে। এটিই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও ব্যবসা করেছেন। তার অনেক সাহাবি ছিলেন ব্যবসায়ী, কৃষক ও শ্রমজীবী। তারা ইবাদত করতেন। আবার পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করতেন। কখনো কর্মবিমুখতাকে তাকওয়ার পরিচয় মনে করেননি।
ইসলাম কখনো হারাম উপায়ে সম্পদ অর্জনের অনুমতি দেয় না। প্রতারণা, ঘুষ, সুদ, মিথ্যা ও জুলুমের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদে বরকত থাকে না। পক্ষান্তরে হালাল উপার্জন অল্প হলেও তা শান্তি, তৃপ্তি ও বরকতের কারণ হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেউ কখনো নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য ভক্ষণ করেনি।’ (সহিহ বুখারি) এই হাদিস শ্রমের মর্যাদা তুলে ধরে। ইসলাম মানুষকে কর্মঠ হতে উৎসাহিত করে। অন্যের ওপর অযথা নির্ভরশীল হতে নিরুৎসাহিত করে।
একজন মুসলমান কর্মস্থলেও আল্লাহর বান্দা। তাই কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা, নেয়ামত পেলে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা, ভুল হলে ইস্তিগফার করা এবং নামাজের সময় হলে সব ব্যস্ততা ছেড়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া তার ইমানের পরিচয়।
অনেকেই মনে করেন, ইবাদত মসজিদের ভেতরে সীমাবদ্ধ, আর কর্মজীবন সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কিন্তু ইসলাম এই বিভাজনকে স্বীকৃতি দেয় না। সততা, আমানতদারি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করা প্রতিটি হালাল কাজ ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে।
লেখক : ইসলামি গবেষক
