জ্ঞান মানুষের মর্যাদা বাড়ায়। সত্যের পথ দেখায়। কিন্তু সব জ্ঞান মানুষকে সফল করে না। এমন জ্ঞানও আছে, যা কেবল মুখস্থ থাকে। বইয়ের পাতায় বন্দি থাকে। জীবনে সেটার কোনো ছাপ পড়ে না। সেই জ্ঞান মানুষকে আলোর বদলে অন্ধকারে ঠেলে দেয়। পবিত্র কোরআন শুধু পাঠ করার গ্রন্থ নয়। এটি জীবন পরিচালনার বিধান। এর শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। কাজে বাস্তবায়ন করতে হয়। কোরআনের শিক্ষা অনুসরণ না করলে শুধু জ্ঞান অর্জন মানুষকে মহান আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান করে না। সুরা জুমুআয় মহান আল্লাহ অত্যন্ত শক্তিশালী একটি উপমার মাধ্যমে এই বাস্তবতাই তুলে ধরেছেন। তা এমন এক উপমা, যা প্রত্যেক জ্ঞানী, আলেম, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষের জন্য গভীর সতর্কবার্তা।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যাদের ওপর তাওরাতের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল, অতঃপর তারা তা পালন করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত সেই গাধার মতো, যে অনেক বই বহন করে (কিন্তু তা বুঝে না)। কতই না নিকৃষ্ট সেই সম্প্রদায়ের দৃষ্টান্ত, যারা আল্লাহর আয়াগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে হেদায়েত দেন না।’ (সুরা জুমুআ ৫)
এই আয়াতে মহান আল্লাহ প্রথমে বনি ইসরায়েলের এক শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের তাওরাত দেওয়া হয়েছিল। তারা মহান আল্লাহর বিধান জানত। কিন্তু সেই জ্ঞান অনুযায়ী তারা জীবন পরিচালনা করেনি। বরং মহান আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেছে। সত্য গোপন করেছে। নিজেদের প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করেছে। তাই তাদের অবস্থা বোঝাতে মহান আল্লাহ এমন একটি উপমা দিয়েছেন, যা যুগে যুগে সব মানুষের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকবে।
গাধা তার পিঠে মূল্যবান বই বহন করতে পারে। কিন্তু সে জানে না বইয়ের ভেতরে কী লেখা আছে। সে বইয়ের জ্ঞান বুঝতে পারে না। বই তার চিন্তা বদলায় না। চরিত্র গড়ে না। বই শুধু তার কাধে একটি বোঝা।
ঠিক তেমনই সেই ব্যক্তি, যে কোরআন বা দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করে, কিন্তু তা অনুযায়ী আমল করে না, তার অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। তার জ্ঞান কেবল স্মৃতিতে থাকে। মুখে থাকে। কিন্তু হৃদয়ে পৌঁছায় না। জীবনে প্রতিফলিত হয় না।
ইসলামে জ্ঞানের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়। উদ্দেশ্য হলো মহান আল্লাহকে চেনা। অন্তরে তার ভয় সৃষ্টি করা। জীবনকে তার আদেশ অনুযায়ী পরিচালনা করা। তাই কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে যথার্থ ভয় করে।’ (সুরা ফাতির ২৮)
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও জ্ঞান ও আমলের সম্পর্ক অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, কেয়ামতের দিন কোনো বান্দার দুই পা সরবে না, যতক্ষণ না তাকে তার জ্ঞান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, সে তা অনুযায়ী কী আমল করেছে। (সুনানে তিরমিজি)
এ হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু জ্ঞান অর্জনের হিসাব হবে না। সেই জ্ঞান অনুযায়ী জীবন গড়েছি কি না, তারও হিসাব দিতে হবে।
আজ আমাদের সমাজে ইসলামি বইয়ের অভাব নেই। কোরআনের অনুবাদ রয়েছে। তাফসির রয়েছে। অসংখ্য ওয়াজ, বক্তৃতা ও ইসলামি ভিডিও হাতের নাগালে। মানুষ প্রতিদিন নানা ইসলামি আলোচনা শোনে। অনেকেই কোরআন তেলাওয়াত করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই জ্ঞান আমাদের আচরণে কতটা পরিবর্তন আনছে?
যদি নামাজ সম্পর্কে জানার পরও নামাজ অবহেলা করি, তবে সেই জ্ঞান আমাদের উপকার করবে না। সুদ যে হারাম, তা জানার পরও যদি সুদ থেকে বিরত না থাকি, তবে সেই জ্ঞান কেবল বোঝা হয়ে থাকবে। গিবত, মিথ্যা, প্রতারণা ও জুলুম যে কবিরা গুনাহ, তা জেনেও যদি সেগুলোতে লিপ্ত থাকি, তবে আমাদের অবস্থাও সেই উপমার আওতায় চলে আসবে।
এই আয়াত আলেমদের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা। কারণ তাদের ওপর দায়িত্ব আরও বেশি। তারা মানুষকে শিক্ষা দেন। তাই তাদের নিজেদের জীবনও সেই শিক্ষার প্রতিচ্ছবি হওয়া উচিত। মানুষ আলেমের কথা যেমন শোনে, তেমনি তার জীবনও অনুসরণ করে। যদি জ্ঞান ও চরিত্রের মধ্যে মিল না থাকে, তবে সেই দাওয়াতের প্রভাবও কমে যায়।
তবে এই আয়াত শুধু আলেমদের জন্য নয়। প্রত্যেকের জন্য। কারণ প্রত্যেকেই কোরআনের কিছু না কিছু শিক্ষা জানে। প্রত্যেকেই নিজের জানা বিষয় অনুযায়ী দায়িত্বশীল।
এই উপমা আমাদের অহংকার থেকেও দূরে থাকতে শেখায়। অনেক সময় মানুষ কিছু ইসলামি জ্ঞান অর্জন করেই নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শুরু করে। অথচ প্রকৃত মর্যাদা বেশি জানার মধ্যে নয়। বরং বেশি মানার মধ্যে।
হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, জ্ঞান হলো সেই জিনিস, যা অন্তরে প্রভাব ফেলে এবং আমলে প্রকাশ পায়। শুধু মুখে বর্ণনা করার নাম জ্ঞান নয়।
আজ তথ্যের যুগ। কয়েক সেকেন্ডেই হাজারো ইসলামি তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু তথ্য আর হেদায়েত এক বিষয় নয়। তথ্য মস্তিষ্কে জমা হয়। হেদায়েত হৃদয়কে বদলে দেয়। তাই একজন মানুষ বহু ইসলামি তথ্য জানলেও, যদি তার চরিত্রে পরিবর্তন না আসে, তবে সেই জ্ঞান তাকে মহান আল্লাহর কাছে সম্মানিত করবে না।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন জ্ঞান থেকে মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন, যা উপকারে আসে না। তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এমন জ্ঞান থেকে আশ্রয় চাই, যা উপকার করে না।’ (সহিহ মুসলিম)
এটি প্রমাণ করে, সব জ্ঞান সমান নয়। যে জ্ঞান মানুষকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়, সেটিই উপকারী জ্ঞান।
আমাদের উচিত, প্রতিদিন নিজের কাছে একটি প্রশ্ন করা। আমি যা জানি, তার কতটুকু পালন করি? আমি যে আয়াত তেলাওয়াত করি, তা কি আমার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে? আমি যে হাদিস পড়ি, তা কি আমার আচরণ বদলায়? যদি উত্তর নেতিবাচক হয়, তবে আমাদের নতুন করে নিজের জীবন গুছিয়ে নিতে হবে।
পবিত্র কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু তেলাওয়াতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এর অর্থ বোঝা প্রয়োজন। শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এরপর ধীরে ধীরে সেই শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। একদিনে সব পরিবর্তন সম্ভব নয়। কিন্তু প্রতিদিন একটি করে শিক্ষা নিজের জীবনে যুক্ত করা সম্ভব।
যে ব্যক্তি কোরআনের একটি নির্দেশ জেনে তা বাস্তবায়ন করে, সে মহান আল্লাহর কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে। আর যে ব্যক্তি জেনে-শুনে অবহেলা করে, সে নিজের ক্ষতিই ডেকে আনে।
সুরা জুমুআর এই উপমা আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দেয়। আমরা কি শুধু ইসলামি বই সংগ্রহ করছি? শুধু বক্তৃতা শুনছি? শুধু উদ্ধৃতি শেয়ার করছি? নাকি সেই শিক্ষাগুলো আমাদের পরিবার, ব্যবসা, সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে?
প্রকৃত সফল মানুষ সেই ব্যক্তি, যার জ্ঞান তার চরিত্রকে সুন্দর করে। যার ইলম তাকে বিনয়ী বানায়। যার কোরআন তেলাওয়াত তার চোখে অশ্রু আনে। যার জানা বিষয়গুলো তার আমলকে সমৃদ্ধ করে।
গাধার পিঠে থাকা বই তার কোনো মর্যাদা বাড়ায় না। কারণ সে বইয়ের মূল্য বোঝে না। তেমনি পবিত্র কোরআনের জ্ঞান অর্জন করেও যদি মানুষ সেই আলো নিজের জীবনে ধারণ না করে, তবে সেই জ্ঞান তাকে মুক্তি দিতে পারবে না। তাই প্রতিটি মুসলমানের চেষ্টা হওয়া উচিত, শুধু জ্ঞান অর্জন নয়, সেই জ্ঞানকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা। এ পথেই রয়েছে দুনিয়ার কল্যাণ, আখেরাতের মুক্তি এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি।
লেখক : ইসলামি গবেষক
