বেসরকারি খাতে দেশের ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক পতন এখন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ বেড়ে যাওয়া ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে আশানুরূপ বিনিয়োগ না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে আসা স্থবিরতার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তার মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কার, ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। সুদহার বিবেচনায় নিলে প্রকৃতপক্ষে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক। কেননা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির হিসাব করা হয় সুদহার যোগ করে। গত মার্চে ব্যাংকগুলো গড়ে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। ঋণ ও আমানতে সুদহারের গড় ব্যবধান ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ ছিল।
ড. এম মাসরুর রিয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দেড় বছর ধরেই বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই ধীরগতি আরও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর প্রভাব ইতিমধ্যে সামষ্টিক অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে।
তিনি বলেন, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি কমে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর যোগাযোগের অভাবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ও পরে অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাত সংস্কারের বিষয়ে প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি আশানুরূপ হয়নি।
অর্থনীতিকে টেকসই পথে এগিয়ে নিতে নীতিগত সংহতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন এম মাসরুর রিয়াজ। একই সঙ্গে রপ্তানি ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা বজায় রাখা, গ্যাস ও তেলের সরবরাহে সংকট এড়ানো এবং জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং ছোট-বড় লজিস্টিকস খাত সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) প্রেসিডেন্ট তাসকীন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে আসার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করলেও সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে বিনিয়োগে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা এবং ব্যবসায়িক আস্থার ঘাটতি। উচ্চ সুদহার উদ্যোক্তাদের নতুন ঋণ গ্রহণে নিরুৎসাহিত করছে। বিশেষ করে যখন উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট এবং মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি নিয়ন্ত্রণের কারণে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমে গেছে, ফলে নতুন শিল্প বিনিয়োগও মন্থর হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, তারল্য ব্যবস্থাপনায় অতি সংকোচনমূলক মনোভাব এবং সরকারি ঋণগ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোও বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে, উচ্চ সুদহার ও আমদানি সীমাবদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগ স্থবিরতাই বর্তমানে বেসরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার মূল কারণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি সময় মানুষ ঋণ নিয়ে পাচারসহ নানা জালিয়াতি করে। সেসব ঋণ অনাদায়ী হয়ে এখন খেলাপি উঠেছে ৩০ শতাংশের ওপরে। ওই সময়ে যেসব ব্যবসায়ী বেশি ঋণ নিতেন তাদের অধিকাংশই এখন পলাতক কিংবা জেলে আছেন। অনেকের কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যে কারণে ঋণ পরিস্থিতি এ রকম অবস্থায় নেমেছে।
বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসায়ীরা বেশ আগে থেকে নীতি সুদহার কমানোর দাবি তুললেও ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে তা ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত আছে। নানা কারণে তা কমানো যাচ্ছে না বলে মনে করে কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর কাছে এখন তারল্যের কোনো সংকট নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এ পর্যন্ত বাজার থেকে প্রায় ৬১৪ কোটি ডলার কিনে ব্যাংকগুলোকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। আবার সরকারের ঋণও বাজেট নির্ধারিত সীমার মধ্যে আছে। এরপরও ঋণ বৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। একটি সময় বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে ছিল। তবে করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর কলকারখানা বন্ধসহ নানা কারণে অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসে। এরপরও ২০২০ সালে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এরপর আবার বেড়ে দুই অঙ্কে ওঠে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রবৃদ্ধি আবার এক অঙ্কে তথা ৯ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমে আসে। সেখান থেকে কমতে কমতে গত বছরের মার্চে ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশে আসে। এখন তা আরও কমে এসেছে।