বিএনপির ডা. শাহাদাতের সঙ্গে রেসে নাজিমুর

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:০২ এএম

দিনক্ষণ ঠিক না হলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন সামনে রেখে নগরীতে বইছে আগাম নির্বাচনী হাওয়া। মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী নিয়ে হিসাব মেলাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। বেড়েছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী। আর আগভাগেই দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করে ভোটের মাঠে নেমে গেছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গোছানো মাঠকে কাজ লাগাতে তৎপর। অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে।

চলতি বছরের শেষ দিকে চসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। আদালতের রায় নিয়ে বর্তমানে মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন বিগত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। তবে এ রায়ের আগেই স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সিটি করপোরেশনের পর্ষদ ভেঙে দেওয়ায় দুই বছর ধরে কাউন্সিলরবিহীন অবস্থায় চলেছে করপোরেশনের কার্যক্রম।

প্রতিযোগিতায় বিএনপির যারা : মেয়র হিসেবে ডা. শাহাদাত হোসেনের মেয়াদ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে মাঠপর্যায়ে। জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের দাবি মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ডা. শাহাদাত অবৈধভাবে মেয়রের চেয়ারে বসে আছেন। তবে ডা. শাহাদাত হোসেন দাবি করছেন ২০২৯ সাল পর্যন্ত তার মেয়াদ রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন যে কোনো সময় চসিক তফসিল ঘোষণা করলে তিনি পদত্যাগ করে আবারও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা জানিয়েছেন। সেভাবেই নির্বাচনের মাঠও গোছাচ্ছেন তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতেও নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। এসব কর্মসূচিতে সিটি করপোরেশনের ইতিবাচক নানা কার্যক্রম তুলে ধরছেন তিনি।

সম্প্রতি টানা বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত নগরবাসীর পাশেও থেকেছেন বিভিন্ন সহায়তা নিয়ে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রামে দলীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন তিনি।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমানও সম্ভাব্য মেয়রপ্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠ গোছানোর কাজ করে যাচ্ছেন। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে দলীয় মনোনয়নও চেয়েছিলেন। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পর থেকে অনেকটা এককভাবেই সংগঠনের হাল ধরে রেখেছেন তিনি। সংগঠনের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় রয়েছেন তিনি। চট্টগ্রাম বিএনপির রাজনীতির আরেক প্রভাবশালী নেতা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক সরকারের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের নীরব সমর্থন রয়েছে তার প্রতি।

এ ছাড়া মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করের নামও মেয়র পদের সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। তবে তিনি মহানগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পেতেই অধিক আগ্রহী বলে তার ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে যে কোনো পর্যায়ের নির্বাচনে বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকবে এটাই স্বাভাবিক। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও এর বাইরে নয়। মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও রাজনীতির মাঠেও সবাই নিজ নিজ অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করবে। তিনি বলেন, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম মহানগরীর তিনটি আসনেই উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। তাই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর জন্য ভোটের মাঠ অনেকটা গোছানো বলা যায়। নির্বাচন কমিশন যখন চসিক নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে, তখন দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে দলীয় প্রার্থীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।

সব পদে প্রার্থী ঘোষণা জামায়াতের : পাঁচ মাস আগে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গোছানো মাঠ নিয়েই চসিক নির্বাচনে ভোটযুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। সাংগঠনিক নানা কর্মসূচি, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মানবিক কার্যক্রম ইত্যাদি নিয়ে মাঠে এখন সরব তারা।

জামায়াতে ইসলামীর একাধিক সূত্র জানায়, চসিক নির্বাচন সামনে রেখে বেশ আগভাগেই দল থেকে মেয়র, ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড কাউন্সিলরপ্রার্থী চূড়ান্ত করে তাদের মাঠে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

আগামী নির্বাচনের জন্য দলের মেয়রপ্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে মহানগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালীকে। তিনি এর আগে শুলকবহর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রায় ৭৭ হাজার ভোট পান। দলীয় সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর থেকেই তিনি পুরোদমে মাঠে রয়েছেন। টানা বর্ষণের সময় প্রতিদিন কোমরপানি ডিঙিয়ে তাকে বিভিন্ন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি বর্তমান মেয়রের কর্মকা-ের সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়ে ভোটের মাঠে নিজের অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহানগরীর যেসব কেন্দ্রে জামায়াতের প্রার্থীরা ভালো ভোট পেয়েছেন, সেসব কেন্দ্রে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামী ঘোষিত মেয়রপ্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিটি করপোরেশনভুক্ত আসনগুলোতে আমাদের দলীয় প্রার্থীরা হারলেও অনেক কেন্দ্রে আমরা বিজয়ী প্রার্থীর তুলনায় বেশি ভোট পেয়েছি। এতে স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায়, সেসব এলাকার জনগণ জামায়াতের প্রার্থীকেই তাদের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চায়। আশা করছি, আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেটার প্রতিফলন ঘটবে।

তিনি বলেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বর্তমান সিটি মেয়রের দায়িত্ব না ছেড়ে অনেকটা অবৈধভাবে চেয়ারে বসে থাকাকে নগরবাসী ইতিবাচক হিসেবে নিচ্ছে না। দুই বছর ধরে ওয়ার্ডগুলো কাউন্সিলরবিহীন অবস্থায় রয়েছে। যে কারণে নগরবাসী প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না। নগরীর বিশাল এলাকার মানুষ বারবার করে জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। কিন্তু কে নো প্রতিকার পাচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন করপোরেশনের নির্বাচিত প্রতিনিধি ও তাদের সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা। আমরা চাই, চট্টগ্রাম নগরবাসীকে দুর্ভোগ থেকে বাঁচাতে এবং তাদের নাগরিক সেবা সুনিশ্চিত করতে সরকার যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের উদ্যোগ নেবে।

এনসিপিও প্রস্তুতি নিচ্ছে : নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) চসিক নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত তারা প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি। সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমকে দলটি মেয়রপ্রার্থী করার বিষয় ব্যাপক চাউর হলেও সেটি আবার ভাটা পড়ে গেছে। এখন দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের মধ্য থেকেই তাদের মেয়রপ্রার্থী করার চিন্তাভাবনা চলছে। একইভাবে প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে দল থেকে কাউন্সিলর প্রার্থী করার বিষয়টিও ভাবছে তারা।

এ প্রসঙ্গে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক জোবাইরুল হাসান আরিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, চসিক নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে আমাদের দলের প্রার্থী থাকবে। তবে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। আশা করছি, শিগগিরই প্রার্থী চূড়ান্ত হয়ে যাবে।

প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী বিজয়ী হন। নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির ডা. শাহাদাত হোসেন। নির্বাচনী ফলে নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে ওই সময় আদালতে মামলা করেন তিনি। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর ওই মামলার রায়ে ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে ডা. শাহাদাত মেয়র হিসেবে শপথ নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত