মিরপুরে টিসিবির লাইনে কলেজের সীমানাপ্রাচীর ধস

নিহত ২, শিশুসহ আহত ৭

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:০১ এএম

কেউ রিকশাচালক, কেউ দিনমজুর, আবার কেউ বাসাবাড়িতে কাজ করেন। ব্যাগ হাতে নিম্নআয়ের এসব মানুষ স্বল্পমূল্যে পণ্য কিনতে সকাল থেকেই টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অপেক্ষা ছিল সিরিয়াল এলে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ঘরে ফিরবেন। ধীরে ধীরে সামনে এগোচ্ছিল লাইন। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হলো না। হঠাৎ পাশের একটি কলেজের সীমানাপ্রাচীর ধসে পড়ে তাদের ওপর। যাদের বাজারের ব্যাগ হাতে ঘরে ফেরার কথা ছিল, তারা কেউ ফিরলেন লাশ হয়ে, কেউ হাসপাতালে। নিত্যপণ্য কেনার আশায় যে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই লাইনই শেষ পর্যন্ত দুজনের জীবনের শেষ লাইনে পরিণত হলো।

নিহতরা হলেন নাসিমা বেগম (৪৫) ও মো. ফিরোজ (৪০)। ফিরোজকে ঢামেক হাসপাতালে ও নাসিমা বেগমকে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আহত হন শিশুসহ আরও ছয়জন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বরে মিরপুর বিশ^বিদ্যালয় কলেজের পেছনে এ ঘটনা ঘটে। কলেজটির প্রায় ১১ ফিট উচ্চতার দেওয়ালধসে এ ঘটনা ঘটে। তবে দেওয়ালটি কয়েক মাস ধরে একদিকে হেলে থাকলেও সেটি সংস্কার করা হয়নি। নাসিমা মিরপুর-২ জনতা হাউজিংয়ে থাকতেন। তিনি একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলে কয়েকজন জানালেও কেউ সঠিক তথ্য জানাতে পারেননি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, ওখানে প্রতিদিনই টিসিবির গাড়ি এসে থামে। গতকালও অনেক মানুষ পণ্য সংগ্রহে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ করেই প্রাচীরটি লাইনে দাঁড়ানো লোকজনের ওপর ধসে পড়ে। লাইনে দাঁড়ানোর মধ্যে একজন কবির খান। তিনি জানান, দাম একটু কম হওয়ায় তিনি প্রায়ই লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির চাল, ডাল, তেল নেন। গতকাল দীর্ঘ সময়  দাঁড়িয়ে থাকায় পা ব্যথা হয়ে যায়। তাই পাশে ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিই। নারী-পুরুষ কয়েকজন বিশ্রাম নিতে ধসেপড়া দেওয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। ঠিক তখনই বিকট শব্দে দেওয়ালটা ধসে পড়ে। এতে কয়েকজন দেওয়ালচাপা পড়েন। লোকজন ভাঙা দেওয়াল সরিয়ে আহতদের উদ্ধার করেন। তিনি লাইনের একটু দূরে দাঁড়িয়েছিলেন। তাই অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন। আহতদের কারও মুখ, কারও পা থেঁতলে যায়। তাদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ফিরোজ কাজী বলেন, কলেজের দেওয়ালের অপর পাশে বসে চা খাচ্ছিলাম। দেওয়ালঘেঁষে সড়কে টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য বিতরণ করা হচ্ছিল। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি কলেজের দেওয়ালধসে পড়েছে।

আহত দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন মো. রুবেল। চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ফিরোজকে মৃত ঘোষণা করেন। মাথায় ও পায়ে আঘাত পাওয়া রাজিয়া বেগমকে ভর্তি করেন। রুবেল জানান, রাজিয়া বেগম তার শাশুড়ি। থাকেন মিরপুর-১০ নম্বর সেনপাড়া এলাকায়। টিসিবির পণ্য নিতে তার শাশুড়িও লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তখনই কলেজের সীমানাপ্রাচীর ধসে তাদের ওপরে পড়ে। এতে তার শাশুড়িও দেওয়ালচাপা পড়েন। খবর পেয়ে তিনি এসে শাশুড়ি ও ফিরোজকে অ্যাম্বুলেন্সে দেখতে পান এবং ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসেন।

রুবেল বলেন, ইট পড়ে তার শাশুড়ির মাথা ফেটে গেছে। রক্তে পুরো শরীর, শাড়ি ভিজে গেছে। বাম পায়ের তিন জায়গায় ভেঙে গেছে। নিহত ফিরোজকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তার মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। এক পা ফোলা ছিল। হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে রেখেছিলেন। তার যে নাম-পরিচয় জিজ্ঞেস করব, সেই সুযোগ ছিল না। তিনি শুধু ‘ও মা গো’ বলে চিৎকার করেই আর কোনো শব্দ করেননি। হয়তো তখনই তিনি মারা গেছেন। 

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত ফিরোজ মিরপুর শাহআলীবাগ এলাকায় থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি নওগাঁর পানগাঁও। স্ত্রী সাহিদা আক্তার এবং পাঁচ ও সাত বছরের দুই মেয়েসন্তান নিয়ে মিরপুরে থাকতেন। ঘটনার পরপরই তিনি মারা গেলেও তার পরিবার জানতে পারে সন্ধ্যার দিকে। খবর পেয়ে স্ত্রী সাহিদা আক্তার দুই শিশুসন্তান নিয়ে ঢামেক মর্গে ছুটে আসেন। সেখানে এসে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন।

সাহিদা আক্তার জানান, তার স্বামী রিকশা চালাতেন। এই আয় দিয়ে কোনোভাবে সংসার চলত। রিকশা চালাতে গিয়ে সামনে টিসিবির গাড়ি দেখতে সেখানে থেকে কম দামে প্রায়ই চাল, ডাল কিনে আনতেন। মঙ্গলবারও মিরপুর-২ এলাকায় টিসিবির গাড়ি দেখে রিকশা দাঁড় করিয়ে পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়ান। এরপরই এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুই শিশুসন্তান নিয়ে কোথায় যাবেন, কীভাবে সংসার চলাবেন এসব বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাহিদা।   

আহতদের করুণ অবস্থা : এ ঘটনায় আহত সাতজন পঙ্গু ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে রাজিয়া বেগম, মনোয়ার ও মোশারফ নামে তিনজন ঢামেকে ভর্তি রয়েছেন। এক শিশু চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছে। বাকিরা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের অবস্থাও গুরুতর। কারও মাথা ফেটে গেছে, কারও পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চামড়ার সঙ্গে ঝুলে ছিল, কারও শরীরের একাধিক স্থানের চামড়া উঠে গেছে।   

হেলে ছিল দেওয়াল : স্থানীয়রা জানিয়েছেন দেওয়ালটি কয়েক মাস ধরে একদিকে হেলে ছিল। এই পথ ধরে শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ চলাচল করলেও এটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়নি কলেজ কর্তৃপক্ষ। সরেজমিন দেখা যায়, ভেঙে যাওয়া দেওয়ালটি প্রায় ১১ ফিটের মতো উচ্চতার হবে। ধসেপড়ার পর এতে কোনো রড কিংবা কংক্রিটের ঢালাই দেখা যায়নি। শুধু ইটের গাঁথুনি দিয়ে সীমানাপ্রাচীরটি করা হয়েছিল। দুর্ঘটনার পেছনে কলেজ কর্তৃপক্ষের গাফলতির অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাৎক্ষণিকভাবে কলেজটির অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষকে পাওয়া যায়নি। 

মিরপুর থানার ওসি হাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনার পর কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে যেটা জানতে পেরেছি, এই ওয়ালটি দীর্ঘদিনের পুরনো এবং এটি তেমন মজবুত ছিল না। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত আমরা এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি, যাতে বাকি অংশের দেওয়ালধসে আর কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত