গত ১৬ মাসে ৫২৫ শিশুর প্রাণ হরণের নৃশংস ঘটনার সংবাদ পড়ে গা শিউরে ওঠে। ওই শিশুদের মাঠে খেলার কথা, বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার বয়স। মা-বাবার মানসিক দ্বন্দ্ব ও তর্কের মুহূর্তে মাটিতে আছড়ে ফেলে শিশু হত্যার ঘটনা কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? আবার কিছু শিশু যৌন লালসার শিকার হয়ে পারিবারিক ও স্বজনের হাতে খুন হচ্ছে। কাজের মেয়েকে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নির্যাতনের পর হাসপাতালে ভর্তি করেও বাঁচানো যায়নি। হত্যাকারী বিবেচনায় গৃহকর্তা ও কর্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিচারক হয়তো ন্যায়বিচার করবেন। কিন্তু ফিরিয়ে দিতে পারবেন না ওই শিশুর জীবন। এই আক্রোশের পেছনে কোন ধরনের মনস্তত্ত্ব কাজ করে তা বলতে পারবেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। ওদের নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা আমাদের অপরাধী করে দেয়। এই মানবিক অপরাধবোধ আমরা কী দিয়ে শুশ্রƒষা করব? প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে, প্রতিশোধ নিতে, যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে, মুক্তিপণ আদায়ের টোপ হিসেবে পারিবারিক কলহের জেরে শিশু হত্যাকে বলা যায় অপরাধ। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে চাচাত ভাইয়ের হাতে নির্মমভাবে খুন হয় সামস। ঘাতকের আক্রোশের ১৭টি চিহ্ন নিয়ে সে জীবনের পরপারে চলে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, শিশুদের টার্গেট করেই হত্যা করা হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে। পুলিশের সীমাবদ্ধতার কারণে ঘাতকরা আইন মানছে না, ভয় পাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলার কর্তারা বলছেন, খুনি সবসময় দুর্বলকে টার্গেট করে। শিশুরা যেহেতু শারীরিকভাবে দুর্বল, তাই পারিবারিক কলহের জেরে তাদের হত্যা করা হয়েছে। ৯ মাসের সন্তানকে পানিতে চুবিয়ে মেরে, নিজে যখন আত্মহত্যা করেন একজন মা, তার এই আত্মহনন আমাদের কষ্ট দেয়। বিবেককে তাড়িত করে। স্বামীর কারাবন্দিত্বই তাকে হত্যার অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। এমন নৃশংস হত্যা, শিশুহত্যা মনস্তাত্ত্বিক বিষয় হলেও, এটি অপরাধ বলেছেন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হেলালউদ্দিন। পাশবিক প্রবৃত্তি জাগ্রত হলে মানুষের কাম বাসনার ইচ্ছা জাগে। আবার সুপার ইগো মনকে স্বাভাবিক রাখে। কিন্তু যারা নৃশংস হত্যাকা- ঘটায়, তাদের সুপার ইগো কাজ করে না। মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে সে অপরাধের দিকে ধাবিত হয়। এসব প্রতিরোধে পারিবারিক শিক্ষা বেশি প্রয়োজন। পরিবার ও সমাজ ঐক্য গড়ে তুলে প্রতিরোধ করতে পারে এমন অপরাধ।
আইনের যথাযথ প্রয়োগ, বিচারের ব্যবস্থা দ্রুত করলেও সমাজে মানসিক স্বস্তি ও নির্বিরোধ পরিবেশ তৈরি করা য়ায়। এই সমাজে পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা অত্যন্ত শিথিল। শিথিলতা দূর করতে হলে সমাজ থেকে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা কমাতে হবে। সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন করতে হবে সবাইকে। শিশুকাল থেকে কৈশোর ও যৌবনের প্রারম্ভিককালে এই শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের স্কুলগুলোতে, কারিকুলামে নৈতিকতা শিক্ষা অবহেলিত। এই নৈতিক শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষার মতো ও কল্যাণপরায়ণতায় উন্নীত করা জরুরি। বিক্ষিপ্ত ও নৈতিকভাবে স্খলিত সমাজে নানা অপরাধ সংঘটিত হয়। আমাদের সেটা মনে রাখতে হবে। সমাজ-সংসারে স্বস্তি ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে স্থিতি আনতে হবে সরকারকে। শিশুরা যাতে হত্যার টার্গেটে পরিণত না হয়, তা প্রতিরোধে সরকারের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে শিক্ষিত সচেতন মানবিক মানুষকে। মানুষের প্রতি যে দরদ, যে ভালোবাসা, তা মানবতারই শিখা জে¦লে দেয় মনে ও সমাজে। আমরা শিশুদের নির্মম মৃত্যু দেখতে চাই না।