গণতন্ত্র চর্চা ও প্রক্রিয়ার বিকাশ ঘটুক

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৬ এএম

গণতন্ত্রের চর্চা হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সবার মতামতকে সম্মান জানানো, আইনের শাসন বজায় রাখা এবং নিয়মিত ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা হয়। এটি কেবল রাষ্ট্রে নয়, বরং সমাজ ও কর্মক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। আমরা জানি, গণতন্ত্রের কিছু অপরিহার্য শর্ত আছে। যেমন- গণতন্ত্রের মূল নীতিবাকস্বাধীনতা : সবার কথা বলার ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা

থাকা। সহনশীলতা এর অন্যতম। অন্যের ভিন্ন মতকে শ্রদ্ধা করা এবং অধিকাংশের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া। আইনের শাসনও এ ক্ষেত্রেও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রে আইনের চোখে সবাই সমান হওয়া। আমাদের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে আলোচনার শুরুতেই এ বিষয়গুলো উল্লেখ করার যৌক্তিকতা অনুভব করলাম।  

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার পাঁচ মাসের কিছু বেশি সময় অতিক্রম করেছে। নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রিসভা গঠন করে কাজ শুরু করেই কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যেগুলো প্রশংসা কুড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই এই সরকার নির্বাচনের আগে তাদের দেওয়া কয়েকটি প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়িত করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং বাস্তবায়িত করেছে। এটি আশা জাগানিয়া। আমি যেহেতু বলছি ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে সেতু এই আলোচনা এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

ক্রীড়াঙ্গনে নতুন করে আস্থার জš§ হয়েছে। মানুষ বিশ্বাস করতে চাইছে বর্তমান সরকার ক্রীড়াঙ্গনের বিষয়ে আগের যেকোনো সময় থেকে অনেক বেশি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ক্রীড়াচর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেবে। ক্রীড়াঙ্গনে জনস্বার্থকে যথাযথ গুরুত্ব দেবে। বর্তমান সরকার এসেছে রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে। জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে পারাটা জুলাইয়ের অন্যতম অর্জন। স্বাভাবিকভাবে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রতি ক্রীড়াঙ্গনের মানুষের প্রত্যাশা বেশি আর প্রত্যাশার ধরনও গতানুগতিক নয়। সরকার যেহেতু গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনা শুরু করেছে সংগতভাবে এই সরকারের লক্ষ্য হলো ক্রীড়াঙ্গনেও গণতান্ত্রিক চর্চা ও মূল্যবোধের সঠিক বাস্তবায়ন। বিগত বছরগুলোতে অগণতান্ত্রিক চর্চা, একনায়কতন্ত্র এবং দলীয় রাজনীতি কর্মীদের ক্রীড়াঙ্গনে পাইকারি হারে পুনর্বাসন করে ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। এতে করে ক্রীড়াঙ্গন সবসময় ধুঁকেছে।

ক্রীড়াঙ্গন পরিচালনার দায়িত্ব তো ক্রীড়া সংগঠকদের। একমাত্র ঐক্যবদ্ধ, নিবেদিত ও যোগ্য সংগঠকরা পারবেন ক্রীড়াঙ্গনে রূপান্তর ঘটাতে। ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ছাড়া উপায় নেই। ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলেই ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তন সম্ভব। ক্রীড়াঙ্গনে স্থিতিশীলতা এবং আস্থা অর্জন এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ক্রীড়াঙ্গনে যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তাদের দায়িত্ব শুধু গণতন্ত্রের কথা বলা নয় বরং তার চর্চার জন্য প্রতিশ্র“তিবদ্ধ হওয়া। ক্রীড়াঙ্গনের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে একদল তৃণমূল পর্যায়ে থেকে জাতীয় পর্যায়ে পর্যন্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারাই ক্রীড়াঙ্গন পরিচালিত হতে হবে। সেখানে নিশ্চিত করা হবে সুশাসন, শৃঙ্খলা, জবাবদিহি এবং দায়বদ্ধতা।

দেশের ক্রীড়াঙ্গনে মানবসম্পদ এবং সম্ভাবনার ঘাটতি কখনো ছিল না, তবে ক্রীড়াঙ্গন পরিচালিত হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও সমষ্টির ইচ্ছায়। পরিবেশে ছিল না জবাবদিহির। এতে ক্রীড়াঙ্গন প্রগতির পথ ধরে হাঁটতে পারেনি। ক্রীড়াঙ্গনে সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা ছিল বছরের পর বছর ধরে অনুপস্থিত। ক্রীড়াঙ্গনে উদ্ভাবনী বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। সব সময় ক্রীড়াঙ্গনের মানুষের মধ্যে রেষারেষি এবং পরমতসহিষ্ণুতার অভাব লক্ষণীয় হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তথাকথিত সংস্কার সাধনের নামে ক্রীড়াঙ্গনের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, চেতনা, ঐতিহ্যগতভাবে ক্রীড়াঙ্গন পরিচালনা পদ্ধতির ক্ষেত্রে অবিবেচকের মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের চলমান ক্রীড়াচর্চার মারাত্মক ক্ষতি করা হয়েছে। এতে প্রায় আঠারো মাস ধরে ক্রীড়াঙ্গনে বিরাজ করেছে এক ধরনের স্থবিরতা। পিছিয়ে গেছে ক্রীড়াঙ্গনের জীবনপ্রবাহ। লোপ পেয়েছে ক্রীড়া মানসিকতা এবং চেতনার। ক্রীড়াঙ্গনের একদল আবার ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে গিয়ে সাময়িকভাবে সফল হয়েছে। যারা কখনো যা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি সেটি সাময়িক সময়ের জন্য হলেও বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে তারা ক্রীড়াঙ্গনে প্রাণের সঞ্চার করতে পারেননি।

তারেক রহমানের সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রীড়াঙ্গনকে ঘিরে বাস্তবধর্মী অঙ্গীকার করেছেন। ইতিপূর্বে আর কখনো কোনো রাজনৈতিক দল এত স্পষ্টভাবে বাস্তবতার আলোকে চিন্তাশীল অঙ্গীকার করেনি। একে একে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক অঙ্গীকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার হলো দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্নভাবে গড়ে তোলা। ক্রীড়াঙ্গন চলমান ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রে উন্নতি ও অবনতি খুবই দৃশ্যমান। বাইরের জগতের মানুষরাও এটা সহজে বুঝতে পারে। বাস্তবতার আলোকে এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ক্রীড়াচর্চা এখন জাতি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ইতিবাচক পর্যবেক্ষণ হলে সামগ্রিকভাবে ক্রীড়া সচেতনতা বাড়ে। আর তাই ক্রীড়াঙ্গন ঘিরে মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়ানোর জন্য কাজ করতে হবে। ক্রীড়াঙ্গনকে দেখার ক্ষেত্রে মনমানসিকতায় পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।

অতীতে কর্তৃত্ববাদিতা এবং স্বার্থ তাড়না ক্রীড়াঙ্গনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দলীয় রাজনীতির ছত্রছায়ায় বিভিন্ন খেলার সংস্থাগুলোতে স্থান হয়েছে অকার্যকর মানুষের। শাসক দলের আশীর্বাদপুষ্ট মানুষরা ক্রীড়াঙ্গনের সব বড় তালগাছগুলোর দখল পেয়েছেন। এতে করে ক্রীড়াঙ্গনে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। দলীয় লোকজনকে পুরস্কৃত করতে চাইলে ক্রীড়াঙ্গনে না এনে তাদের বিভিন্নভাবে ঠিকাদারি বা অন্য কাজের ক্ষেত্রে পুনর্বাসন করা যেতে পারে। আবার মনে রাখতে হবে, দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে তার স্থান ক্রীড়াঙ্গনে হবে না এটা কিন্তু নয়। দলীয় রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত অথচ ক্রীড়াঙ্গনকে ভালোবাসেন, খেলাধুলা সংঘটিত করেন, ক্রীড়াঙ্গনে সেবা করতে চান এমন মানুষদের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। যেটি গুরুত্বপূর্ণ তিনি যেন তার নিজস্ব দলীয় রাজনীতি এবং মতাদর্শকে ক্রীড়াঙ্গনে প্রতিফলিত করতে চেষ্টা না করেন। তিনি যাতে সব মতের মানুষকে একত্রিত করে কাজ করেন। ক্রীড়াঙ্গনে টিমওয়ার্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সবাই আসেন প্রাণের তাগিদে। আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে অতীতে বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ছিলেন অনেক রাজনৈতিক খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। কই তারা তো কখনো দলীয় রাজনীতিকে ক্রীড়াঙ্গনে টেনে আনেননি। সবাইকে নিয়ে তারা কাজ করেছেন আন্তরিকতার সঙ্গে।

ক্রীড়াঙ্গন থেকে তো পাওয়ার কিছু নেই শুধু দেওয়ার আছে। ক্রীড়াঙ্গনে নিজের মূল্যবান সময় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় করে ক্রীড়াঙ্গনে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন, এটি অবশ্য একটি শক্তিশালী মোহ এবং ভালোবাসার বিষয়। মনে রাখতে হবে, পক্ষাঘাতদুষ্টতা, সাংগঠনিক ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং স্তাবকতা ক্রীড়াঙ্গনের চেতনাকে সবসময়ই দুর্বল করে। যে কথাটি বারবার বলতে চাচ্ছি, ক্রীড়াঙ্গন পরিচালিত হবে সত্যিকারের সংগঠকদের দ্বারা। ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপ এবং তাদের পুনর্বাসনের স্থান নেই এগুলো মুখে না বলে বাস্তবতায় প্রমাণ দিলে ক্রীড়াঙ্গন উপকৃত হবে। আমরা বিশ^াস করি, যদি ক্রীড়াঙ্গন নৈতিকতা, সুশাসন, জবাবদিহির মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হয় তাহলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ক্রীড়াঙ্গনে একটি বড় পরিবর্তন হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কাজ করার ইচ্ছাশক্তি। ক্রীড়াঙ্গনে প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ণয় করে কাজ করতে হবে। যে কাজটি করা হবে সেটি বুঝে শুনে শৃঙ্খলার সঙ্গে করতে হবে, কেননা জবাবদিহি তো করতে হবে। বিশ^াস করি পরিবর্তন আসবে। আসতেই হবে। এটাও জানি কিছু মানুষ পরিবর্তনের বিরোধিতা করবেন। ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ ঠিকই সুস্থ, সুন্দর, অগ্রসরমান এবং টেকসই পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

জাতীয় ক্রীড়াপরিষদ অনেকগুলো জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশন এবং অ্যাসোসিয়েশনের এডহক কমিটি ঘোষণা করেছে। জানানো হয়েছে কমিটি ঘোষণার তিন মাসের মধ্যে এই কমিটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের উদ্যোগ নেবে। যাদের অ্যাডহক কমিটিতে স্থান হয়েছে তারাও নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। অ্যাডহক কমিটি নিয়ে কথা উঠেছে। আলোচনার জš§ হয়েছে। বলা হচ্ছে, এমন অনেকের স্থান হয়েছে বিভিন্ন খেলার কমিটিতে, যাদের সঙ্গে ক্রীড়াঙ্গনের সম্পর্ক নেই। অনেক ক্ষেত্রে সোজাসুজি স্বজনপ্রিয়তা হয়েছে। এখন যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাডহক কমিটিকে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে। নির্বাচিত কমিটি ছাড়া তো খেলার চর্চাকে সচল করা যাবে না। ক্রীড়াঙ্গনে স্থিতিশীলতা ছাড়া উপায় নেই। ক্রীড়াঙ্গনে চলছে নৈতিকতা সংকট। বিরাজ করছে আদর্শগত শূন্যতা। আমরা চেয়েছিলাম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ক্রীড়াঙ্গনে সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করবেন যেটি হয়নি। দলীয় মতাদর্শ বড় করে দেখা হয়েছে। মৌলিক চেতনাগুলো মার খেয়েছে ব্যক্তি এবং সমষ্টির স্বার্থের কাছে।

ক্রীড়াঙ্গনে গণতন্ত্রের চর্চা বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নিচ থেকে নেতা নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই  ক্রীড়াঙ্গনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, ক্রীড়াঙ্গনে নজর দিতে হবে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে  ও নির্মোহ অবস্থান থেকে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়, দেশের স্বার্থ থাকবে অগ্রগণ্যের তালিকায়। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবার ভূমিকা থাকতে হবে সার্বিক কল্যাণে। সবার আগে দেশ, ব্যক্তি বা মহল বিশেষ নয়।   

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত