মুঠোফোন সেবা

টেলিটককে প্রত্যাশার জায়গায় নিন

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৪ এএম

মানুষের সঙ্গে প্রযুক্তির মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক এবং মানব আচরণের ওপর ডিজিটাল সংস্কৃতির প্রভাব নিয়ে গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাত মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক শেরি টার্কলের কথা স্মরণে আসে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা মুঠোফোনের স্ক্রিনের পেছনে এমন এক দুনিয়া তৈরি করেছি, যেখানে আমরা একে অপরের সঙ্গে নানাভাবে সংযুক্ত’। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের রাষ্ট্রীয় মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর টেলিটক কেন মুঠোফোনের বিকাশের এই যুগেও তার পরিসর বাড়ানো তো দূরের কথা, লোকসানের বোঝায় নুইয়ে পড়েছে? প্রশ্নটির বহুমাত্রিক উত্তর উঠে এসেছে ২৮ জুলাই দেশ রূপান্তরের শীর্ষ ও এর পার্শ্ব প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে স্বার্থবিরোধী নীতিমালা করে বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ায় বিগত দুই দশকের বেশি সময় ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে টেলিটক। বিলুপ্ত বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ডের (বিটিটিবি বা টিঅ্যান্ডটি) অদক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের টেলিটকে পুনর্বাসনের অভিঘাতও লেগেছে।

রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটিতে  ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগ্য এবং দক্ষ জনবলের অভাবে সংস্থাটি ধুঁকছে। সময়মতো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারায় প্রতিযোগিতার সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি সংস্থাটির। বিপুল সম্ভাবনা-স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন পর্যন্ত টেলিটক লাভের বদলে লোকসানের ঘানি টানছে এবং ক্রমেই তা স্ফীত হচ্ছে। এখানেই থেমে নেই টেলিটকের ব্যর্থতার খতিয়ান। ইন্টারনেটের ধীরগতির জন্য দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনায় থাকা টেলিটকের প্রকল্প বাস্তবায়নেও ধীরগতি দৃশ্যমান। এর ফলে সেবার মানোন্নয়নে ঘাটতির পাশাপাশি দ্রুত পরিবর্তনশীল টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তিতে শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকির আশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠেছে। আমাদের দেশে অন্যান্য সেলফোন কোম্পানিগুলো যেখানে ক্রমেই তাদের জগৎ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন নতুন সেবার দরজা উন্মুক্ত করে দিয়ে গ্রাহকদের আকর্ষণ করে বাণিজ্য স্ফীত করছে, সেখানে রাষ্ট্রীয় সংস্থা টেলিটক পড়েছে অস্তিত্ব সংকটে।

জগৎ যেখানে চলে এসেছে সেই আলোকে অন্যান্য সেলফোন কোম্পানিগুলো মুঠোর মধ্যে তুলে দিচ্ছে অনেক কিছু। তারা গ্রাহকের চাহিদার নিরিখে প্রযুক্তির সবটুকু সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিত্যনতুন প্রদান বা নিবেদনের ডালি সাজিয়ে দিচ্ছে গ্রাহকদের সামনে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বিপণন বা বাজারজাতকরণে প্রদান বা নিবেদনের প্রস্তাব এমন একটি সম্পদ, যা বাণিজ্যের অন্যতম কৌশল। টেলিটক এসবের ধারেকাছেও নেই। এর সর্বাঙ্গে যেন ‘বিষ পিঁপড়ার কামড়’। হিসাব অনুসারে টেলিটকের সম্পদ ও দায়ের অনুপাত ১০০:১৫৮। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবসার ক্ষেত্রে এ ধরনের দায় উচ্চমাত্রার ঝুঁকি বহন করে। রাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিষ্ঠানেরই ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়েছে ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতার কারণে এই অভিযোগও নতুন নয়। ফোন এখন শুধু একটি ডিভাইসই নয়, এটি আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মসহ অনেক কিছুর অবিচ্ছেদ্য অংশও। এই প্রেক্ষাপটে গ্রাহক যার কাছে উন্নত সেবা ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন সেদিকেই আকৃষ্ট হবেন। আমরা মনে করি, এই দৃষ্টিকোণ থেকে টেলিটককে সময়ের চাহিদানুসারে ঢেলে সাজানোর বিকল্প নেই। লোকসানি রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটির লাভের মুখ না দেখার কারণসহ এর গতিহীন কার্যক্রমের বিষয়গুলো যেহেতু অচিহ্নিত নয়, সেহেতু এর প্রতিবিধানও কঠিন কিছু নয়। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে পরিচালন ব্যয়, উচ্চ বেতন কাঠামো, আউটসোর্সে জনবল নিয়োগে অত্যধিক ব্যয়, এন্টারটেইনমেন্ট, পরিবহনসহ অন্য অনেক খাতে অস্বাভাবিক ব্যয়ের যে চিত্র উঠে এসেছে তাও বিস্ময়কর। আধুনিক প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এবং যুগোপযোগী কর্মকৌশলের নিরিখে টেলিটকের রুগ্নদশা কাটাতে হবে। নীতিমালা নিয়েও নতুন প্রেক্ষাপটে ভাবা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। দক্ষদের হাতে অর্পণ করতে হবে এর ব্যবস্থাপনা পরিচালনার দায়িত্ব।

টেলিটক কেন পারল না এই প্রশ্নের উত্তর জরুরি। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের এ জন্য জবাবদিহি করতে হবে। দূর করতে হবে আমলাতান্ত্রিক জটিলত। আমলে রাখা বাঞ্ছনীয়, রাজনৈতিক অর্থনীতির কারণে দেশের অনেক সরকারি সংস্থার অস্তিত্ব সংকট দেখা গেছে। টেলিটক নিয়ে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন কালক্ষেপন না করে। গ্রাহকসেবার মান, পরিধি ও বাণিজ্য বাড়াতে কিংবা এর অস্তিত্ব টিকাতে এর বিকল্প নেই।    

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত