‘খাবার নাকি বিষ খাচ্ছেন’ শিরোনামে ২০ মে দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে প্রশ্ন জাগে অসাধু খাদ্যপণ্য ব্যবসায়ীরা কি জীবন নিয়ে জুয়া খেলে নিজেদের আখের গোছানোর অপপ্রক্রিয়া এভাবেই চালিয়ে যাবেন? এটি এখন সাধারণ সমস্যা নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য রীতিমতো ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে পড়ছে ওপার বাংলার প্রখ্যাত কবি ও সুরকার রজনীকান্ত সেনের বিখ্যাত একটি গীতিপঙ্্ক্তি। ‘কত কিছু খাই ভস্ম ও ছাই’ তার এই পঙ্ক্তিটি বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক নির্মম ও কঠিন পরিচিত বাস্তবতা। ‘আমি সকল কাজের পাই হে সময়, তোমারে ডাকিতে পাই নে/ আমি চাহি দারা, সুত, সুখ সম্মিলন, তব সঙ্গসুখ চাই নে।/ আমি কতই যে করি, বৃথা পর্যটন, তোমার কাছে তো যাই নে;/ আমি কত কী খাই, ভস্ম আর ছাই, তব প্রেমামৃত খাই নে...’।
রজনীকান্ত সেনের জনপ্রিয় ব্যঙ্গাত্মক গানের এই পঙ্ক্তি শুধু ভেজালের ছড়াছড়ি নয়, আমাদের সমাজে আরও বহু বিষয়েই কতটা প্রাসঙ্গিক এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। প্রতিদিনের খাদ্যে বিষ ও ভেজালের ছড়াছড়ির কারণে মানুষ অনিরাপদ খাবারগুলো গ্রহণ করছে এবং বহু সংখ্যক মানুষ যেন মরার আগেই মরছে, জেনে বা না জেনে। দেশে খাদ্যে ভেজাল রোধে বেশ কয়েকটি আইন রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা আইন ২০১৩, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এবং দণ্ডবিধি ২৭২ ধারা। এসব আইনে খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান মেশানো বা ভেজাল বিক্রি করলে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে এ যেন‘কাজির গরু কিতাবে আছে গোয়ালে নেই’র মতো অবস্থা। আইন প্রয়োগে দুর্বলতা ও তদারকির ঘাটতি থাকায় অপরাধীরা সহজে নানা ক্ষেত্রে কীভাবে পার পেয়ে যায়, তার অনেক নজির আমাদের সামনে আছে।
হয়তো অনেকের মনে আছে, ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলার কথা। তিনি দেশের একজন অত্যন্ত আলোচিত ও জনপ্রিয় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছিলেন ২০০৫-২০০৬ সালের দিকে ভেজালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। তার নেতৃত্বে পরিচালিত ভেজালবিরোধী অভিযান, দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় তৈরি করেছিল ও ‘খাদ্যসন্ত্রাসী’দের অনেকটা নিবৃত্ত করেছিল। খাদ্যে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বিরুদ্ধে রোকন উদ-দৌলার সাহসী ও আপসহীন অভিযানগুলো সাধারণ মানুষের মনে দারুণ আলোড়ন তোলে এবং তাকে আইকনিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। আরও একজন এ ক্ষেত্রে কিছুটা ঝড় তুলেছিলেন। তিনি হলেন সারওয়ার আল। তিনিও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গেছেন। এই দুজন ম্যাজিস্ট্রেটের নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন, দেশে সফলতার নতুন গল্পের অধ্যায় হয়ে উঠেছিল। সচেতন ও শুভবোধসম্পন্ন মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। কিন্তু তাদের ওই সফলতার গল্প পরবর্তীকালে মøান হতে থাকে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের পক্ষে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পাড়ার কারণে এবং এর পরিণতিতে আজ ফের ডিএল রায়ের সেই অতীত ভাবনা বর্তমানের প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা জানি, যথাযথভাবে কর্তব্য পালন করা নিঃসন্দেহে একটা গুণ। আর সরকারি কর্মকর্তা হলে তো কথাই নেই, মানুষ সংগত কারণেই ভীষণ স্বস্তিবোধ করে এবং শ্রদ্ধা জানায় দায়িত্বশীলদের। জনগণের করের টাকায় যাদের বেতন হয়, সেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের যথাযথভাবে কর্তব্য পালন করারই কথা। কিন্তু আমাদের সমাজে এর ঘাটতি কতটা? এই প্রশ্নটির উত্তর প্রীতিকর নয়। আমাদের সমাজ যেন অধঃপতনের কতটা চরম সীমায় গিয়েছে, এর অনেক প্রমাণ আছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ঠিকঠাক কর্তব্য পালন করতে দেখে, জনগণের উচ্ছ্বসিত হওয়ার মতো বিষয় দৃশ্যমান হয় কালেভদ্রে। হয়তো অনেকের মনে আছে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করাকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়েছিল। রিটের রায়ে ২০১৭ সালের ১১ মে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ২০০৯ সালের আইনের ১১টি ধারা ও উপধারা অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। ওই রায়ের পরও প্রশাসনিক ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে পরিচালিত মোবাইল কোর্ট চলতে পারছে। কারণ সরকার আপিল করেছে।
যতদূর জানি, সেই আপিলের শুনানি হয়ে ব্যাপারটা আজও সুরাহা হয়নি। বিষয়টি যদি তাই হয়, তাহলে বৈধতার প্রশ্ন মাথায় নিয়ে চলছে মোবাইল কোর্ট। এ ব্যাপারে এর বেশি কিছু অবগত নই। এক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আসে। দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কালক্ষেপণ না করে আইনানুগ কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। খাদ্যে ভেজাল দেওয়া বা পরিচয় গোপন করে খাদ্যপণ্য বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আইনের সঠিক ব্যবহারই পারে, জনস্বাস্থ্যবিধ্বংসী প্রজন্ম বিনাশের ভেজাল বাজার বন্ধ করতে। এও মনে রাখা দরকার, কেবল শাস্তির ভয়ে নয়, নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে নীতিবান ব্যবসায়ীদের খাদ্যে ভেজাল বন্ধে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা জরুরি। ভুলে যাওয়া অনুচিত যে, খাদ্য কেবল পেট ভরানোর উপকরণ নয়, এটি আমাদের জীবনের জ¦ালানি। সেখানে যদি বিষ মেশানো হয়, তাহলে পরিণতি কী হতে পারে এরও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। সুরক্ষিত খাদ্যই নিরাপদ জীবনের প্রথম শর্ত এ সত্যটি উপলব্ধিতে ঘাটতি থাকলে ভয়াবহ বিপদের ছায়া আরও বিস্তৃত হবে, যা শুভবোধসম্পন্ন কারোরই কাম্য হতে পারে না। এ নিয়ে দায়িত্বশীলদের ‘গর্জন’ ইতিমধ্যে কম শোনা যায়নি, কিন্তু অর্জন যে শূন্য দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনটি এরই উদাহরণ। ভেজাল খাদ্যপণ্য জনস্বাস্থ্যহানি ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের যে দ্বৈত সংকট কঠিন থেকে কঠিনতর করেছে, এই উপলব্ধি সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা অনুধাবন করতে যদি এখনো অপারগ হন, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে যে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অর্থনৈতিক ক্ষতিটা হলো, বিষাক্ত খাবারের কারণে দেশে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে, চিকিৎসা খাতে বাড়ছে ব্যয়, কর্মক্ষমতা কমছে সব শ্রেণির মানুষের। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর হিসাবে, ভেজালজনিত অসুস্থতায় উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় প্রতি বছর অর্থনীতি প্রায় ২০-২৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে।
আমাদের দায়িত্বশীলদের অনেক ক্ষেত্রেই সম্বিৎ ফিরেছে সময়ক্ষেপণ করে এবং পরিস্থিতি যখন সামাল দেওয়া চরম কঠিন হয়ে পড়েছে। এর নজিরও কম নেই। ভেজালের ভয়ংকর বাস্তবতা কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে এর সাক্ষ্য দিচ্ছে খোদ সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (আইপিএইচ)-এর একটি সমীক্ষা। নিকট অতীতে তাদের পরিচালিত এক জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দেশের বাজারে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ খাদ্যপণ্য কোনো না কোনোভাবে ভেজালযুক্ত। তবে কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে এ হার তুলনামূলকভাবে কম বা বেশি হতে পারে।’ এরপরও এটুকু মনে করি, খাদ্যে ভেজালের এই দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ। আমরা যদি চাই, ‘ভেজাল অর্থনীতি’ থেকে ‘নিরাপদ খাদ্য সংস্কৃতি’তে রূপান্তর, তা ঘটানো মোটেও দুরূহ নয়। এ জন্য জরুরি রাষ্ট্র, সৎ ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের ত্রিমাত্রিক উদ্যোগ। যেখানে আইন, নৈতিকতা ও সচেতনতা একসঙ্গে কাজ করবে। আমাদের পরিচয় মাছে-ভাতে, বিষে-ভাতে নয়।
মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে যারা তুঘলকিকাণ্ড চালাচ্ছে, তারা জনশত্রু। তাদের ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়। ব্যবসায়ী নামের খাদ্যপণ্য সন্ত্রাসীদের রোগটা যেহেতু গুরুতর, সেহেতু টোটকা দাওয়াইয়ে এ ব্যাধি সারবে না। দরকার সাঁড়াশি অভিযান ও যথাযথ আইনানুগ কঠোর প্রতিবিধান। প্রয়োজনে বিদ্যমান আইনের সংশোধন জরুরি। সময় বয়ে গেছে অনেক, আর নয় সময়ক্ষেপণ। ‘কত কিছু খাই ভস্ম ও ছাই’ এই বেদনাময় উপলব্ধি থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের পৌঁছাতে হবে নিরাপদ খাদ্য ও সুস্থ জীবনের বাস্তবতায়। কারণ নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নে আপসের সুযোগ নেই। এটি শুধু জনস্বাস্থ্য নয়, জাতির অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন। জনশত্রুদের চারণভূমি হতে পারে না রক্তস্নাত বাংলাদেশ।
লেখক: সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও কবি
deba_bishnu@yahoo.com