বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আয়তনের বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে এসে মাত্র ৩০ টাকা টিকেট কেটে ঈদ আনন্দ উপভোগ করছেন হাজার হাজার দর্শনার্থীরা। ঈদুল আজহার পরের দিন সকাল থেকে প্রতিদিন এ জমিদার বাড়িতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। এ জমিদার বাড়ির পর্যটকদের ঘিরে তৈরি হয়েছে শতাধিক ভাসমান বিভিন্ন দোকান। টানা ছুটিতে প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন দেখতে আগ্রহী দেশ-বিদেশের নানা স্থান থেকে পর্যটকরা ছুটে এসেছেন প্রাচীন ঐতিহ্যপূর্ণ এই জমিদার বাড়িতে।

ঈদুল আজহার পরের দিন শুক্রবার ও শনিবার ছিল উল্লেখযোগ্য পর্যটক। আজ রবিবার ও আগামীকাল সাপ্তাহিক বন্ধ থাকলেও বিশেষ কারনে তা বাতিল করা হয়েছে। ফলে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ভিড় করছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আয়তনের এ বালিয়াটি জমিদার বাড়ি।  

বালিয়াটি জমিদার বাড়িটি মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি ইউনিয়নের বালিয়াটি গ্রামে অবস্থিত। ঢাকা থেকে মাত্র দুই ঘণ্টা ও মানিকগঞ্জ জেলা শহর থেকে ৩০ মিনিটে সহজেই আসা যায় এ স্থানে। ফলে দিন দিন এ স্থানে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে দুই ঈদ ও বিভিন্ন দিবসে আরো বেড়ে যায়। 

ধামরাই উপজেলার কাওলিপাড়া গ্রামের আবু রাসেল বলেন, খুব কাছেই এ বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে ঘুরতে এসেছি। ১০ বছরের উপরের মাত্র ৩০ টাকা ছোট বাচ্চাদের মাত্র ১০ টাকা টিকেট কেটে এখানে পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়ানো যায়। কোন বহিরাগতদের কোন হেসেল নেই। যেখানে বেসরকারি কোন গার্ডেন কোন স্থানে গেলে হাজারের উপরে শুধু প্রবেশ ফি লাগে। আমরা বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে ৩০ টাকার টিকিট কেটে ঈদের আনন্দ উপভোগ করলাম। 

মির্জাপুর উপজেলার কান্দাপাড়া গ্রামের মিজানুর রহমান বলেন, আমি ধামরাই উপজেলায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। রবিবার স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে বালিয়াটি জমিদার বাড়িতে বেড়াতে আসলাম। জমিদার বাড়ির সামনে অস্থায়ী দেশীয় খাবার খেলাম। খুবই অল্প টাকা খরচে বিনোদন হয়ে গেল। স্ত্রী ও সন্তান সবাই খুশী।

ঢাকার আমিন বাজারের বাসিন্দা সাজ্জাদ বলেন, ঢাকায় বিভিন্ন কোলাহল। আমিন বাজার থেকে বাসে উঠে সাটুরিয়ায় ৮০ টাকা, ১০ টাকা করে ইজিবাইকে বালিয়াটি জমিদার বাড়ির সামনে নামলাম। টিকেট মাত্র ৩০। আর দুপুরে ১৫০ টাকায় ভাত সব মিলে ২৭০ টাকায় ঈদ আনন্দ উপভোগ করলাম। ঢাকায় যে কোন স্থানে ঘুরলে কমপক্ষে জন প্রতি ১ হাজার টাকা খরচ হত। ৩০ টাকায় টিকেট কেটে দিনভর ঘুরলাম এ নান্দনিক জমিদার বাড়িতে। 

রবিবার জমিদার বাড়ির ভিতরে সকাল ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত অবস্থান করে দেখা যায়। টিকিট কেটেই প্রথমে চলে যাচ্ছে অন্দর মহলে। জমিদার বাড়ির ৪টি ভবনের বা থেকে ২য় টির ২য় তলায় অবস্থিত ৪টি রুমে জমিদার বাড়ির বিভিন্ন আসবাব পত্র সাজানো। কথিত আছে বড় রুমের ভিতরে জমিদারগণ নৃত্য দেখত আর আনন্দ উপভোগ করত। ৪টি ভবরের বারান্দায় প্রবেশ করে কেউ সেলফি তুলছেন। পিছনে রয়েছে ৭ ঘাটলা বিশিষ্ট পুকুর। ৪টি বড় ভবন ছাড়াও পিছনে রয়েছে আরও ৩টি বড় অট্টালিকা। সবগুলি আবার সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। সামনের সীমানা প্রাচীরের মধ্যে রয়েছে ৪টি সিংহদ্বার। যার পিছনে ফেলে ছবি তুলতে বেশী ব্যস্ত পর্যটকদের। গ্রুপ ছবি তুলতে তুলতে কাচা ঘাসের উপর বসে সময় পার করছেন অনেকেই।

আবার জমিদার বাড়ির মাঝের ভবনের বারান্দায় জানালার ফ্রেমের নাম দিয়েছে ভাইরাল জানালা। এখানে ছবি তুলে ফেসবুকে পোষ্ট করছেন আর ক্যাপশন দিচ্ছেন, জমিদার বাড়ি আসব। আর ভাইরাল পয়েন্টে ছবি তুলবো না তাই কি হয়।

আর জমিদার বাড়ির সামনে বিভিন্ন শতাধিক দোকান বসেছে। শিশুদের কেন্দ্র করে বিভিন্ন ষ্টল। ফুচকা, চটপটি ও গরমের জন্য লোকাল ডাব, সরবতের বিভিন্ন দোকান। আর বিভিন্ন কোমল পানীয়, আইসক্রিম এর স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকান।

খলিলাবাদ গ্রামের পাখি মিয়া বলেন, এসব অস্থায়ী দোকান এই ঈদের ছুটিতে ২ থেকে ৩ লাখ টাকার বেচা কেনা হয়েছে। 

এ প্রসঙ্গে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বালিয়াটি প্রসাদ জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান নিয়াজ মাখদুম বলেন, ঈদুল আযহা  উপলক্ষে সবার আগমনে আমরা খুবই আনন্দিত। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের দর্শনার্থীরা এখানে এসে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারছে। এতে যেমন পর্যটন খাতের উন্নতি হচ্ছে, তেমনি স্থানীয় ব্যবসা এবং কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এ মৌসুমে ঈদের পরের দিন থেকে শনিবার পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। তবে আগামী কয়েকদিন মিলে প্রায় ৫ লাখ টাকা টিকিট বিক্রি করতে পারব।

বালিয়াটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মীর সোহেল আহমেদ চৌধুরী বলেন, সারা বছরই পর্যটকদের ভিড় লক্ষ করা যায় এ জমিদার বাড়িতে। কিন্তু দুই ঈদ, পহেলা বৈশাখ, ১৬ ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চসহ বিভিন্ন দিবসে বহুগুণে বেড়ে যায় পর্যটকদের। তাছাড়া ঢাকার অত্যন্ত নিকটে, যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল থাকায় দিন দিন দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।

সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম বলেন, একদিকে যেখানে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে, অন্যদিকে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য উন্নত পরিষেবা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। জমিদার বাড়ি পরিদর্শনের জন্য আরও উন্নত সুযোগ-সুবিধা প্রণন করার পরিকল্পনা রয়েছে, আমাদের স্থানীয় সাংসদ ও বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার। তিনি খুব দ্রুত যাতে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা আরও উন্নত হয় এবং এই ঐতিহাসিক স্থানটির সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় সে ব্যাপারে কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন।