মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার উলাইল ইউনিয়নে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির নতুন ভাতাভোগীদের মধ্যে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অনেকের দাবি, নতুন তালিকায় নাম থাকলেও এখনো কোনো ভাতা পাননি। আবার কেউ কেউ ১২ মাসের বরাদ্দ ৩ কিস্তিতে ৭ হাজার ৮০০ টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও বছর শেষে পায়নি। ভুক্তভোগীরা টাকা পাওয়ার আশায় বিভিন্ন দপ্তরে তদবির করেও বিফল হয়ে ফিরে যাচ্ছে। এছাড়া ভাতার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে জনপ্রতিনিধির নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীদের সরকার নির্ধারিত হারে প্রতি মাসে ভাতা প্রদান করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা করে তিন মাস অন্তর ভাতা পরিশোধের কথা। অর্থাৎ ১২ মাসে একজন ভাতাভোগীর মোট পাওনা ৭ হাজার ৮০০ টাকা। তবে অর্থবছর শেষ হলেও উলাইল ইউনিয়নের নতুন অন্তর্ভুক্ত বিধবা ভাতাভোগীদের মধ্যে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়নের নতুন ১৭ জন বিধবা ভাতাভোগীর মধ্যে অধিকাংশই এখনো সম্পূর্ণ ভাতা পাননি। তাদের মধ্যে কয়েকজনের নামে তালিকায় অন্তর্ভুক্তি থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো টাকাই তাদের হিসাবে জমা হয়নি।
একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ভাতার কার্ড পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। তবে টাকা দেওয়ার পরও তারা এখনো কোনো ভাতা পাননি। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
মুক্তানগর গ্রামের রাজিয়া বেগম বলেন, আবেদন করার পর থেকে এক বছর বিভিন্ন জায়গায়সহ বেশ কয়েকবার উপজেলায় ও ব্যাংকে যাওয়া হয়েছে। অনেকেই টাকা পেলেও আমি এখনো কোন টাকা পাইনি। এই অভাবের সময় যদি আমার ভাতার টাকা ঠিকমতো পাই অনন্ত সংসারে কিছুটা হলেও উপকার হয়।
চাড়িপাড়া গ্রামের বাকপ্রতিবন্ধী চায়না বেগম বলেন, স্বামী মারা যাবার পর থেকে বিভিন্ন বাসায় কাজ করে জিবিকা নির্বাহ করছে। খুবই কষ্টে দিন পার হয়। তিনি স্থানীয় রওশনারার কাছে ১৫০০ টাকা দিয়েছিল এই ভাতার কার্ড পাবার জন্য। কিন্তু নতুন তালিকায় তার নাম থাকলেও এখনো তিনি ভাতার কোন টাকা পাননি।
৮ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম বলেন, অনেক আগেইতো ভাতার জন্য আবেদন করেছি। অনেকেই নাকি ভাতার টাকা পেয়েছে। কই আমিতো এখনো পাইনি। তবে আমাদের মেম্বারকে নিয়ে কয়েকবারতো গেছি ওনাদের অফিসে শুধু বলছে টাকা মোবাইলে চলে যাবে। কিন্তু এখনোতো কোন টাকা পাইনি।
দড়িকায়ড়া গ্রামের আসমা বলেন, তার শাশুড়ি সখিনা বেগমের বয়স্ক ভাতার ৩৯০০ টাকা পেয়েছে। কিন্তু দেয়ার কথাতো ৭৮০০ টাকা। বিষয়টি স্থানীয় মেম্বারকে বলা হয়েছে। তিনি জানিয়েছে পরবর্তীতে আবারো টাকা আসবে।
আমডালা গ্রামের রোকেয়া বেগম বলেন, স্বামী মারা যাবার পর থেকে বিভিন্ন বাসায় কাজ করে দুই ছেলে নিয়ে কোন রকম করে জীবন পার করছি। ভাতার আবেদন অনেকই আগেই করেছি। ওখানে বড় ছেলের মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। বেশ কিছুদিন আগে ৩৯০০ টাকা এসেছে। টাকাগুলো ছেলেরাই খরচ করে ফেলেছে। কিন্তু তার পর আর কোন টাকা আসেনি। ঠিকমতো টাকাগুলো পেলে অনন্ত ওষুদের খরচ চালাতে পারতাম।
দড়িকয়ড়ার আব্দুল হামিদ বলেন আসি ঠিকমতো চোখে দেখি না। তাই তিনি প্রায় দুই বছর আগে প্রতিবন্ধির একটি ভাতার আবেদন করেছে। ভাতা পাবার জন্য তার থাকা অল্প একটু ৬ শতাংশ জমি সনকরালি দিয়ে স্থানীয় মহিলা মেম্বার রিনা আক্তারের কাছে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। টাকা দেবার পর থেকে উপজেলার হান্নান ও মেম্বার রিনার কাছে অনেক বার গিয়েছি এবং তারা বলেছে আমার প্রতিবন্ধি ভাতা হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো আমি কোন ভাতার টাকা পাইনি। হয়তো টাকা পেলে দুধ, ডিম, ওষুধপাতি এগুলো কিনে খেতে পারতাম।
একই গ্রামের ওজিফা বেগমের কাছ থেকেও প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য ওই রিনা মেম্বার ৫ হাজার টাকা নিয়েছে ভাতা কার্ড করে দিবে বলে। টাকা ছাড়া নাকি কোন কার্ড হয়না তাই মেম্বারকে টাকা দেওয়া হয়েছে। আবেদন করার পর থেকে অনেক বার টেপড়া সমবায় অফিসে গিয়েছি এবং ব্যাংক এশিয়াতেও এ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের ভাতা এখনো আসেনি। আদও আমরা ভাতার টাকা পাবো কিনা জানি না। টাকা নিয়েও আমাদের ভাতার কার্ডের টাকা দিচ্ছে না।
অভিযুক্ত উলাইল ইউনিয়নের ৪, ৫, ৬ ওয়ার্ডের মহিলা মেম্বার রিনা বেগম প্রতিবন্ধী কার্ডের টাকা নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, প্রতিবন্ধী কার্ড করে দেবার কথা বলে কারো কাছ থেকে কোন টাকা নেওয়া হয়নি। তবে আপনি যাদের কথা বললেন সাদের সাথে কথা বলে দেখতে হবে।
উলাইল ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা কারিগরি প্রশিক্ষক আব্দুল হান্নান বলেন, তিনি চলতি বছরের জুন মাসের ১৫ তারিখে এলপিআরএ গিয়েছেন। এখনো যদিও তার দায়িত্ব কাওকে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। তবে তার ইউনিয়নের তালিকার সবাকেই সরকারি ভাতা দিয়ে দেওয়ার কথা। টাকা কম পেয়েছে বা পায়নি এ রকম কেউ তার কাছে আসেনি। যদি ভাতাভোগীদের কেউ টাকা না পেয়ে থাকে তবে তাড়াতাড়িই টাকা পেয়ে যাবে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জয় কৃষ্ণ সরকার বলেন, তিনি কয়েক দিন হলো এ দপ্তরে যোগদান করেছে। তবে নতুন ভাতাভোগীরাতো শতভাগ টাকা পেয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তারা কেন টাকা পায়নি তা হয়তো ডকুমেন্ট দেখে চলতে পারবো। যদি অফিসের কেউ এ রকম অনিয়মের সাথে যুক্ত থাকে তার বিরুদ্ধে দাপ্তরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনিষা রানী কর্মকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, তিনি এখনো ভাতা সংক্রান্ত মৌখিক বা লিখিত অভিযোগ পায়নি। যদি কোন ভাতাভোগীর এমন অভিযোগ আসে আমি অবশ্যই তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। আপনার জানানো এ বিষয়ে খতিয়ে দেখে সুস্পষ্ট প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরোও বলেন, সরকারি সহায়তাগুলো এখন সব অনলাইনে বা মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে যার যার এ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যায়। মোবাইল ব্যাংকিং এর টাকা গুলি যদি ব্যত্যয় হয় তাহলে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার মাধ্যমে খতিয়ে দেখে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অগ্রণী ব্যাংকে বিচারাধীন মামলার মনিটরিংবিষয়ক সভা
সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসি-এসইএল-এর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর