আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সবার রয়েছে প্রত্যাশা। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন কেমন বাজেট তারা চান। তাদের প্রত্যাশা শুনেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোজাহিদ হোসেন
শিক্ষা ও গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে
চারদিকে আলোচনা চলছে আগামী বাজেটের আকার নাকি ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা হতে যাচ্ছে। সংখ্যাটা শুনতেই কেমন যেন এক বিশাল ব্যাপার মনে হয়! এবার শিক্ষায় বরাদ্দ ১ লাখ কোটি ছাড়িয়েছে, যা ইতোপূর্বের যেকোনো বাজেটের চেয়ে বেশি। কিন্তু দেশের জিডিপি তো এখন ৬৮ লাখ কোটি টাকা! সেই তুলনায় শিক্ষায় বরাদ্দ মাত্র শতকরা ১.৫১ ভাগ আর স্বাস্থ্যে শতকরা ০.৬৬ ভাগ। দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তানও আমাদের চেয়ে জিডিপির বেশি শতাংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে খরচ করে। যা যথাক্রমে (শিক্ষা : নেপাল শতকরা ৪.০- ৪.৫, ভুটান শতকরা ৬.০-৭.০ ভাগ, পাকিস্তান শতকরা ১.৭-২.০ ভাগ) এবং
(স্বাস্থ্য : নেপাল শতকরা ১.৩-১.৬ ভাগ, ভুটান শতকরা ২.৫-৩.৫ ভাগ, পাকিস্তান শতকরা ১.০-১.২ ভাগ)। শুধু রাস্তাঘাট আর
বড় বড় মেগা প্রজেক্টের ভৌত অবকাঠামো
দিয়ে কি একটি দেশ দাঁড়াতে পারে? যদি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদই মেরুদ-হীন থেকে যায়?
আমার প্রত্যাশা
১. কাগজে কলমে টাকার অঙ্ক না দেখিয়ে, জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী বরাদ্দ
দিতে হবে।
২. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নামমাত্র বাজেট না দিয়ে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে, যাতে সেশনজট আর বেকারত্বের অভিশাপ থেকে তরুণরা মুক্তি পায়।
৩. সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা
চাপিয়ে এই বিশাল বাজেট ঘাটতি পূরণ করা বন্ধ করতে হবে।
আমরা এমন একটি বাজেট চাই, যা শুধু আমলাদের ফাইল ভারী করবে না, বরং সাধারণ শিক্ষার্থীর টেবিলে আর সাধারণ মানুষের পকেটে স্বস্তি এনে দেবে।
মুজাহিদ হোসাইন
শিক্ষার্থী, আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
বাজেট হোক শিক্ষা
দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের
নতুন দিগন্ত উন্মোচনের
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো খাতে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দেশের একজন সচেতন নাগরিক, একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রত্যাশা শিক্ষা খাতে গবেষণা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, আবাসন সংকট সমাধান ও শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবায় আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা, আইটি ও উদ্যোক্তা খাতে বাস্তবভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। দ্রব্যমূল্যের চাপ কমাতে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতে গ্রাম-শহরের বৈষম্য কমিয়ে সরকারি হাসপাতালের সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া উচ্চ-আয়ের ব্যক্তি, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ও বড় সম্পত্তির মালিকদের কার্যকরভাবে করজালের আওতায় আনতে হবে। ডিজিটাল করব্যবস্থা, তথ্য বিনিময় ও ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষার মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ করতে হবে। রাজধানীর অভিজাত এলাকার ধানমন্ডি, বনানী, বসুন্ধরা, গুলশান বারিধারার পাশাপাশি বিভাগীয় শহরগুলোতেও ডোর-টু-ডোর জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে আয় ও সম্পদের সঙ্গে কর প্রদানের সামঞ্জস্য যাচাই করা জরুরি। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কাঠামো যেন কর আদায়ে কোনো বাধা না হতে পারে সে বিষয় নিশ্চিত করা। এতে কর বৈষম্য কমবে, রাজস্ব আয় বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের চাপও হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি অনেকাংশেই কমে আসবে বলে মনে করি।
মোহাম্মদ নূর উদ্দিন
শিক্ষার্থী, ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
তারুণ্যের শক্তি দিতে পারে টেকসই ভবিষ্যৎ
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট নিয়ে দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রত্যাশা কেবল সংখ্যাভিত্তিক নয়, বরং গুণগত পরিবর্তনের। এত বড় বাজেটের একটি প্রধান অংশ শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বরাদ্দ হওয়া জরুরি। কারণ তারুণ্যের শক্তি দিতে পারে টেকসই ভবিষ্যৎ।
ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে মোট জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হোক। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবাসন ও পরিবহন সংকটের সমাধান এবং ডিজিটাল বিভাজন দূর করতে হবে।
বর্তমান তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কর্মসংস্থান। এমন একটি বাজেট চাই, যা কেবল পুঁজিঘন ব্যবসার বিকাশ ঘটাবে না, বরং যুবকদের উদ্যোক্তা হওয়া ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরাসরি প্রণোদনা দেবে। কারিগরি ও আইটি শিক্ষার আধুনিকায়নে বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক বাজারের উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারে।
সর্বোপরি, এই বিশাল বাজেট যেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাঁধে পরোক্ষ করের বোঝা না বাড়ায়। শিক্ষা উপকরণের দাম কমানো এবং একটি বৈষম্যহীন, দক্ষ ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিফলনই হোক এই বাজেটে।
ইসমাইল হোসাইন রাহাত
শিক্ষার্থী, আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
বাজেট হোক সর্বজনীন ও তরুণবান্ধব
একটি দেশের বাজেট হওয়া উচিত সর্বজনীন, উচ্চবিত্তের সুবিধা বাড়িয়ে গরিবের ওপর যেন বোঝা না হয়ে উঠে তা খেয়াল রাখতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই রাজস্ব বাড়াতে বিলাসবহুল পণ্যে কর বাড়ানো হোক, তবে মধ্যবিত্তের যাতায়াত ও জীবিকার মাধ্যম মোটরসাইকেলের ওপর বাড়তি করের বোঝা চাপানো ঠিক হবে না। শিক্ষা ও গবেষণাই পারে একটি দেশের মেরুদ- সোজা করতে; তাই আগামী বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এ ছাড়া লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ অত্যন্ত জরুরি। সর্বোপরি, দেশের বিশাল তরুণ জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে দেশজুড়ে আধুনিক কারিগরি শিক্ষার বিস্তার এবং কর্মসংস্থানের বাস্তবমুখী সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
মো. রুহুল আমিন
শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়