গ্রেটরা যেভাবে গ্রেট হন

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৬ এএম

ফুটবল কি শুধুই একটি বিনোদনমূলক খেলা? যেকোনো ফুটবল সমঝদার এই প্রশ্নের উত্তরে সম্মতিসূচক উত্তর দেবেন না। ফুটবলের গেম প্ল্যান কোনো যুদ্ধ পরিকল্পনার চেয়ে কম নয়। ফুটবল জীবনকে জয় করতে শেখায়, জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে শেখায়। পেলে ম্যারাডোনা ক্রুইফদের মতো গ্রেটরা শুধু ফুটবল মাঠেই জয়ী হননি বরং মাঠের ক্রীড়াকৌশলকে রণকৌশলে পরিণত করে জয়ী হয়েছেন জীবনযুদ্ধে। তারা হয়ে উঠেছেন গ্রেট। ফুটবলের অলটাইম গ্রেট পেলের গ্রেট হয়ে ওঠার রসায়ন নিয়ে লিখেছেন ফয়জুল ইসলাম

যে নাম তার পছন্দের ছিল না

ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবল খেলোয়াড় পেলে যে নামটি নিয়ে ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে আছেন সেটি কিন্তু ছিল তার অপছন্দের নাম। বাবা-মা তার নাম রেখেছিলেন এডসন আরেন্তেস দো নাসিমেন্তো। বন্ধুরা আদর করে ডাকত ‘ডিকো’। তাহলে তার নাম ‘পেলে’ হলো কীভাবে? ডিকোর পছন্দের খেলোয়াড় ছিলেন চাস্কো দ্য সাও লরেন্সোর গোলরক্ষক বিলে। কিন্তু তিনি ‘বিলে’ বলতে গিয়ে উচ্চারণ করেন ‘পেলে’। সেই থেকে বন্ধুরা তাকে খেপাতো ‘পেলে’ বলে। তিনি যতই মানা করেন না কেন, বন্ধুরা খেপাতে ছাড়ত না। ধীরে ধীরে এই নামটিই তার পরিচয় হয়ে দাঁড়াল। ইতিহাস সৃষ্টি হলো এই নামে।

জন্ম তার বস্তিতে

১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর ব্রাজিলের ত্রেস কোরাকোয়েস শহরের এক সাধারণ বস্তিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন পেলে। বস্তির আর দশটা পরিবারের মতোই তাদের পরিবারটিও ছিল ‘দিন আনে দিন খায়’ দরিদ্র পরিবার। ছিলেন পরিবারের প্রথম সন্তান। পরিবারের অভাব অনটন দেখে ছোটবেলাতেই চায়ের দোকানের কর্মচারী হিসেবে কাজ নেন। কিন্তু ছোট্ট একটি ছেলের বেতন আর কতই-বা। পরিবারের চাহিদার তুলনায় এটি যথেষ্ট না হওয়ায় বাড়তি আয়ের আশায় কাজের ফাঁকে ফাঁকে রেলস্টেশন ঝাড়– দিতেন। অন্যের জুতা পরিষ্কার করতেও পিছপা হননি। কে জানত এই চায়ের দোকানের কর্মচারী, রেলস্টেশনের ঝাড়–দার, অন্যের জুতা পরিষ্কার করা ছেলেটিই কালজয়ী খেলোয়াড় হয়ে দুনিয়ার তাবড় তাবড় ক্ষমতাবানদের সম্ভ্রম আদায় করে নেবেন?

মোজার ভেতরে কাগজ ভরে বানাতেন ফুটবল

বাবার কাছেই ফুটবলের হাতেখড়ি। বাবা জোয়াও রামোস দো নাসিমেন্তো ছিলেন পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড়। চোটের কারণে তার ক্যারিয়ারের দুঃখজনক সমাপ্তি ঘটে। তার হাতেই পেলের ফুটবলের হাতেখড়ি। বাবার কাছ থেকে পরামর্শ পেলেও খেলতেন অন্যদের সঙ্গে। অনুশীলন করার জন্য তার ছিল না নিজস্ব কোনো ফুটবল। মোজার ভেতরে খবরের কাগজ ভরে ফুটবল বানিয়ে খেলতে হতো তাদের। তখন ব্রাজিলে ইনডোর ফুটবল জনপ্রিয় ছিল। ফুটবলে খেলার জন্য ইনডোর ফুটবল খেলতে বাধ্য হতেন। চার দেয়ালের মধ্যের এই ফুটবল ভালো লাগত না। তবু সত্যিকারের ফুটবলে খেলার লোভই তাকে ইনডোর ফুটবল খেলতে উৎসাহিত করেছিল। তবে আখেরে কাজে দিয়েছিল এই ইনডোর ফুটবলের অভিজ্ঞতা।  ঘাসের থেকে শক্ত মেঝের মাঠে বল অনেক দ্রুত গতিতে ছোটে। সে বল নিয়ন্ত্রণের জন্য খেলোয়াড়দেরও হতে হয় ক্ষিপ্র গতিসম্পন্ন। অঙ্গ চালনায় গতিসম্পন্ন হলেই হয় না, চিন্তাভাবনায় ও সিদ্ধান্ত নেওয়ায়ও হতে হয় ক্ষিপ্র। ইনডোর ফুটবল খেলতে খেলতে পেলে দ্রুত চিন্তাভাবনা ও অঙ্গ চালনার প্রশিক্ষণ পান। শেখেন নির্ভয় হওয়ার। পেলে পরবর্তী সময়ে বলেছেন, ‘এর ফলে আমি শিখেছিলাম যা-ই সামনে আসুক না কেন, তাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

স্যান্টোস জীবন

দারিদ্র্যের কারণে যে ইনডোর ফুটবল খেলতে বাধ্য হয়েছিলেন সেটিই তাকে মহাতারকার হওয়ার পথ দেখিয়েছিল। ইনডোর ফুটবলে পেলের দারুণ দক্ষতা নজরে আসে ওয়ালডেমার ডি ব্রিটোর। ব্রিটো পেলেকে গলি থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসেন স্যান্টোস ক্লাবে এবং অন্তর্ভুক্ত করেন স্যান্টোসের ‘বি’ টিমে। সে সময় পেলের বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর। নিজের সহজাত প্রতিভা দেখিয়ে এক বছরের মধ্যেই স্যান্টোসের মূল দলে জায়গা করে নেন পেলে। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সেবার ব্রাজিলের পেশাদার ফুটবল লিগে স্যান্টোসের হয়ে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার অর্জন করেন।

ব্রাজিলের পেলে

ব্রাজিলের হয়ে পেলের আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। সে ম্যাচে ব্রাজিল আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলের ব্যবধানে হেরে গেলেও পেলে করেন বিশ্বরেকর্ড। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হিসেবে নতুন রেকর্ড তৈরি করেন তিনি। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে পেলের অভিষেক ঘটে। এখানেও তিনি করেন বিশ্বরেকর্ড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ডটি তার ঝোলায় যায়। এভাবে একে একে ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ১৯৭০ এর মোট চার চারটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেন পেলে। এর মধ্যে তিনবার (১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে) বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করেন। এখন পর্যন্ত এই কৃতিত্বের একমাত্র দাবিদার পেলেই।

যাকে পরিসংখ্যানে মাপা যায় না

পেলের গ্রেটনেসকে পরিসংখ্যানে পরিমাপ করা যায় না। তবে তার যে কৃতিত্ব রয়েছে তার অনেকগুলোই এখনো অক্ষত রয়েছে। ক্যারিয়ারের ১৩৬৩ ম্যাচে পেলে গোল করেছেন ১২৮১টি। ১৯৬৯ সালের নভেম্বরে ভাস্কো-দা-গামা ক্লাবের বিপক্ষে ব্রাজিলিয়ান লিগের এক ম্যাচে যেদিন করলেন তার হাজারতম গোল, সেদিন পুরো ব্রাজিল মেতে উঠেছিল উৎসবে। কোনো একক খেলোয়াড়ের গোল করার এটিই ছিল বিশ্বরেকর্ড। পেলের জীবন যেন এক রূপকথা। অবিশ্বাস্য সব ঘটনায় মোড়া। আজকের কোনো খেলোয়াড় কি সারা জীবন একটি ক্লাবে খেলার কথা ভাবতে পারেন? পেলে সারা জীবন একটি ক্লাবেই খেলেছেন। কোনো ব্যক্তিকে কি জাতীয় সম্পদ হিসেবে কোনো দেশ ঘোষণা করেছে? ব্রাজিলের সরকার পেলেকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেছিল এবং এই সম্পদ যেন রপ্তানি না করা হয় সে জন্য আইনও তৈরি করেছিল। পেলেকে দেখার জন্য গৃহযুদ্ধ বন্ধ করেছিল নাইজেরিয়া। ফুটবলে পায়ে পেলের নৈপুণ্য এমনসব ঘটনার জন্ম দিয়েছিল যাকে পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা চলে না।

ফুটবল তারকাদের উক্তিতে পেলে

ফুটবলে কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে তর্কবিতর্ক চলতেই থাকে। মেসি শ্রেষ্ঠ নাকি রোনালদো শ্রেষ্ঠ এই তর্কের সমাধান কখনো হওয়ার নয়। তবে মেসি বা রোনালদো নিজেদের কখনো পেলে-ম্যারাদোনা-নাজারিও রোনালদোর সমকক্ষ হিসেবে নিজেকে জাহির করেননি। কারণ তারা ভালোভাবেই জানেন, সময় বদলে গেলে বদলে যায় হিসাব। সে কারণে পরিসংখ্যান দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের বিচার হয় না। তবে মাঠের খেলোয়াড়দের মূল্যায়ন সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ব্রাজিলের ’৭০ বিশ্বকাপজয়ী টোস্টা বলেছেন, রোনালদো আর মেসি একত্র করলে যে প্লেয়ারটা পাওয়া যাবে সেটা পেলে। আরেক গ্রেট প্লেয়ার ইয়োহান ক্রুইফ বলেছেন, পেলেই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি যুক্তির গ-ি পেরিয়ে গেছেন। এমনকি আলফ্রেদো দি স্তেফানোও বলেছেন, মেসি রোনালদো থেকে পেলে বেটার। সবচেয়ে বড় প্রশংসাটি করেছেন ব্রাজিলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার ১৯৭৮ বিশ্বকাপজয়ী কোচ মেনোত্তি। তিনি বলেছেন, যদি ম্যারাডোনা, মেসি, স্টেফানো আর ক্রুইফকে একত্র করা হয় তাহলে হয়তো পেলেকে পাওয়া যাবে।

খেলার মাঠে যারা ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী তাদের কাছ থেকে এমন সমীহ আদায় করা সহজ কথা নয়। কীভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন পেলে?

পেলে ম্যাজিক

চারটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ আর তার তিনটিই জয় করা মুখের কথা নয়। তার জন্য কমপক্ষে ষোল বছর শারীরিকভাবে সক্ষম ও নৈপুণ্য প্রদর্শনের উপযোগী থাকতে হবে।

অসম্ভবকে সম্ভব করার এই পেলে ম্যাজিকটি কী তা নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। ক্রীড়া বিশ্লেষক, মনোবিজ্ঞানী আর মানবচরিত্র বিশ্লেষকরা যা বলেছেন তা একসঙ্গে করলে কয়েকটি মহাগ্রন্থ হয়ে যাবে। তবে সে সবের সারকথাটি বলেছেন স্বয়ং পেলে। তিনি বলেছেন, সবকিছুই অনুশীলনের অধীন। সফলতা কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। এটা হলো কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায়, ক্রমাগত শিখতে থাকা, ত্যাগ এবং নিজের কাজকে ভালোবাসার সমন্বয়ের প্রাপ্ত ফলাফল।

পেলের এই জীবনাদর্শকে অনুসরণ করে যেকোনো সাধারণ ব্যক্তিও হয়ে উঠতে পারে স্ব স্ব ক্ষেত্রে সফলতার দৃষ্টান্ত, পেলের মতো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত