একুশ শতকে যে দক্ষতাগুলো প্রয়োজন

বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা কেবল পুঁথিগত জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণদের জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, তরুণদের সংখ্যা ৪ কোটির বেশি। যদি কর্মদক্ষতা, প্রযুক্তিজ্ঞান, কমিউনিকেশন স্কিল না থাকে, তবে তারা জাতীয় সম্পদ না হয়ে সমাজের বোঝায় পরিণত হবে।

একবিংশ শতাব্দীর এ সময়ে যেসব দক্ষতা তরুণদের এগিয়ে রাখবে তা নিয়ে লিখেছেন নাহিদুল ইসলাম নেতৃত্ব একুশ শতকে শিক্ষার একটি অপরিহার্য দিক হলো নেতৃত্ব। নেতৃত্বের গুণাবলির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকে ক্রিটিক্যাল থিংকিং এবং সমস্যা সমাধানের মতো আরও বেশ কিছু দক্ষতা। নেতৃত্বের গুণাবলি একজন শিক্ষার্থীকে অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষা, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা এবং বিভিন্নভাবে সক্রিয় শিক্ষায় জড়িত হওয়ার সুযোগ প্রদান করে এবং এই দক্ষতাগুলো বিকাশে সহায়তা করে।

নিজেকে উপস্থাপনের দক্ষতা

পাবলিক স্পিকিং বা জনসাধারণের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করতে না পারলে নিজের সুপ্ত প্রতিভা ও দক্ষতা কখনই প্রকাশিত হবে না। আপনি শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী অথবা চাকরিজীবী হন, পাবলিক স্পিকিং বা নিজেকে উপস্থাপন আপনার জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্যও পাবলিক স্পিকিংয়ের বিকল্প নেই। পাবলিক স্পিকিং নিজের মধ্যে নেতৃত্বের চর্চা বিকশিত করতে সহায়তা করে।

দলের সঙ্গে কাজ করতে পারার দক্ষতা

দলগত কাজের দক্ষতা কেবল একসঙ্গে কাজ করা নয়, বরং প্রযুক্তি, যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করা।  দলগত কাজ যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একে অপরের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। যেমন একজন হয়তো যোগাযোগে ভালো, অন্যজন হয়তো সুন্দর করে কথা বলতে পারে, আবার কেউ হয়তো অন্যপক্ষকে বোঝানোর ক্ষমতা রাখেন। এভাবে সবাই মিলে সহজেই সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানো যায়। দলগত কাজের মাধ্যমে নতুন সৃজনশীলতার সঙ্গে পরিচিতি, বিভিন্ন ধরনের ওয়ার্কশপ আয়োজন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। সবাই মিলে কাজ করলে নতুন কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা

বিপুল সম্ভাবনা আর পদে পদে আশঙ্কার বার্তা নিয়ে একুশ শতকের আবির্ভাব। একুশ শতক সংকট ও সম্ভাবনার, শ্রম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার, সহিষ্ণু ও ভ্রাতৃত্বে¡র এবং সুষম কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের শতক। এ শতকের পরিবর্তিত পরিবেশ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। যেকোনো নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্রে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে উদ্ভাবনের প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে।

পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন

পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে দ্রুততর উপায় হচ্ছে পেশা সংক্রান্ত সেমিনার, কর্মশালা ও বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ। এ ছাড়াও পেশা সংক্রান্ত দেশি-বিদেশি বই, পত্রপত্রিকা, জার্নাল, ম্যাগাজিন এবং গবেষণাপত্র পড়ার মাধ্যমে আপনি প্রয়োজনীয় দক্ষতার উন্নয়ন করতে পারবেন। সততা, নিষ্ঠা, অধ্যবসায়, পরিশ্রম, সময়ানুবর্তিতা প্রভৃতি যেকোনো পেশাগত দক্ষতার উন্নতিতে বড় ভূমিকা রাখে। স্বেচ্ছাসেবার শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা

একুশ শতকের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামাজিক পরিষেবার ভূমিকা অপরিসীম। দেশের যেকোনো সংকটকালীন মুহূর্তে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার জন্য মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে। সামাজিক পরিষেবার দক্ষতা অর্জন তরুণদের আত্মত্যাগ, দায়িত্ববোধ, যোগাযোগ দক্ষতা, ধৈর্য ও সহনশীলতা, সহানুভূতি ও মূল্যবোধকে জাগিয়ে তোলে। সামাজিক পরিষেবায় তরুণদের অংশগ্রহণ একদিকে যেমন তাদের দায়িত্বশীলতা ফুটিয়ে তোলে, অন্যদিকে সুপ্ত সৃজনশীল ভাবনা প্রকাশ হয়।

লেখার দক্ষতা অর্জন

কথা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি লেখাও ব্যক্তির পেশাদারিত্বের প্রতিচ্ছবি। শুধু কথা নয়, লিখিত ভাষায় সঠিকভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেকে আরও শক্তিশালী করে। তরুণ শিক্ষার্থীদের লেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। লেখার জন্য বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। এসব প্ল্যাটফরমে তরুণদের অনলাইন কোর্স বা ওয়ার্কশপের মাধ্যমে ই-মেইল, রিপোর্ট, কলাম, ফিচার, নোট লেখা শেখানো হয়।

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা

বর্তমান বিশ্ব খুব বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়ছে। এসব প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রয়োগ সম্পর্কে তরুণরা না জানলে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাধার সম্মুখীন হতে হবে। একবিংশ শতাব্দীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের জ্ঞান বাড়ানো জরুরি। কম্পিউটার ব্যবহারে দক্ষতা যেমন, এমএস ওয়ার্ড, এক্সেল, পাওয়ারপয়েন্ট, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতাগুলো অর্জন অত্যন্ত জরুরি।

উল্লিখিত দক্ষতাগুলোর বাইরে তরুণরা ভাষাগত দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার দক্ষতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়েও নিজেকে উন্নত করতে পারে। আমাদের তরুণদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তাদের বর্তমান প্রস্তুতির ওপর। আর সেই প্রস্তুতি কেবল পরীক্ষায় পাসের জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবনে দক্ষ হওয়াও অত্যন্ত জরুরি। তাই তরুণদের পাশাপাশি আমাদের অভিভাবক, শিক্ষক, সমাজ ও সরকার সবার সম্মিলিত উদ্যোগে দেশের তরুণ সমাজকে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ, কর্মমুখী ও আত্মনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে।

লেখক : ফিচার ও কলাম লেখক