আর্সেনালকে কাঁদিয়ে ইউরোপ সেরার ডাবল পিএসজির

ইতিহাসের কী নির্মম পুনরাবৃত্তি! স্থান, কাল ও পাত্র ভিন্ন হলেও পেনাল্টি শুটআউটের সেই চিরন্তন বুকভাঙা দৃশ্যটি যেন ফিরে এলো ৩২ বছর পর। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালির রবার্তো ব্যাজ্জিও টাইব্রেকারে শট বারের ওপর দিয়ে আকাশে মারলে শিরোপা জিতেছিল ব্রাজিল। আর শনিবার রাতে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে ঠিক একই দৃশ্যের জন্ম দিলেন ব্রাজিলেরই বিশ্বকাপ দলের তারকা ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল মাগালাস। টাইব্রেকারের শেষ শটটি তিনি মারলেন আকাশে। আর তাতেই ল-ভ- হয়ে গেল আর্সেনালের প্রথম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের স্বপ্ন। আর্সেনালকে ৪-৩ ব্যবধানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপ সেরার মুকুট পরল প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। অন্যদিকে, ২২ বছর পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জেতা গানার্সদের ‘ডাবল’ জয়ের স্বপ্ন রূপ নিল এক নির্মম ট্র্যাজেডিতে।

নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের ১২০ মিনিটের রোমাঞ্চকর লড়াই শেষ হয়েছিল ১-১ সমতায়। ম্যাচের শুরুতেই বুদাপেস্টে উপস্থিত হাজার হাজার গানার্স ভক্তকে উল্লাসে মাতান জার্মান ফরোয়ার্ড কাই হাভার্টজ। মাত্র ৬ মিনিটের মাথায় পিএসজির রক্ষণভাগ চুরমার করে এক দুর্দান্ত গোল করে আর্সেনালকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। আগাম লিড পেয়ে প্রথমার্ধে মিকেল আর্তেতার শিষ্যরাই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।

তবে বিরতির পর খোলস ছেড়ে বের হয় লুইস এনরিকের পিএসজি। আক্রমণের ধার বাড়িয়ে তারা ফল পায় ৬৫ মিনিটে। আর্সেনাল ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান মস্কেরা নিজেদের ডি-বক্সে পিএসজির তারকা উইঙ্গার খিচা কাভারাৎস্কায়াকে ফাউল করলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। স্পট কিক থেকে নিখুঁত শটে গোল করে পিএসজিকে ১-১ সমতায় ফেরান ফরাসি ফরোয়ার্ড উসমান দেম্বেলে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে। সেখানে দুই দলের গোলরক্ষকই বেশ কিছু দুর্দান্ত সেভ করে স্কোরলাইন ধরে রাখেন।

পেনাল্টি শুটআউটে আর্সেনালের এবারিচি এজে তার নেওয়া শটটি পোস্টের বাইরে মারেন। তবে নুনো মেন্দেসের শট ঠেকিয়ে দিয়ে ডেভিড রায়া আর্সেনালকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন। টাইব্রেকারে যখন ৩-৩ সমতা, তখন লুকাস বেরালদো রায়াকে ভুল দিকে পাঠিয়ে পিএসজিকে এগিয়ে নেন।

এরপরই আসে সেই ভাগ্যনির্ধারক এবং হৃদয়বিদারক মুহূর্ত। আর্সেনালকে টিকিয়ে রাখার জন্য পঞ্চম শটটি নিতে এগিয়ে আসেন গ্যাব্রিয়েল মাগালাস। গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কিছুটা শ্লথ গতিতে দৌড়ে এসে শট নিলেন তিনি। কিন্তু বল ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে গেল আকাশে! ঠিক যেন ক্যালিফোর্নিয়ার রোজ বোলে রবার্তো ব্যাজ্জিওর সেই শটের প্রতিচ্ছবি।

বলটি আকাশে ভেসে যাওয়ার পরপরই গ্যাব্রিয়েল স্তব্ধ হয়ে আকাশের দিকে তাকালেন, দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন এবং ঘামে ভেজা আর্সেনালের জার্সিটি টেনে মাথার ওপর তুলে নিলেন। ঠিক কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেই বুকভাঙা কান্নার মুহূর্তে তাকে জড়িয়ে ধরলেন পিএসজি অধিনায়ক ও তার ব্রাজিলিয়ান জাতীয় দলের সতীর্থ মার্কিনহোস, যিনি একটু পরেই ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন। ম্যাচ শেষে আর্সেনালের ইংলিশ মিডফিল্ডার ডিক্লান রাইস অত্যন্ত হতাশ হয়ে বলেন, ‘এমনটা ঘটেই, এটাই ফুটবল। আর এটি ভীষণ নির্মম।’

আর্সেনাল শিবিরের কোনো ফুটবলারের যদি এই ফাইনালের ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া না লাগত, তবে সেই তালিকায় সবার আগে নাম আসত গ্যাব্রিয়েলের। কারণ, পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে আর্তেতার রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ ছিলেন তিনি। ফাইনালে নামার আগে খেলা ১৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচে তার রক্ষণভাগ গোল হজম করেছিল মাত্র ছয়টি। শুধু তাই নয়, ঐতিহাসিক ইপিএল জয়ে ৩৮টি ম্যাচের মধ্যে ১৯টি ম্যাচেই ক্লিন শিট রেখেছিলেন গ্যাব্রিয়েলরা। অথচ টাইব্রেকারের এই একটি মিসেই গানার্সদের ১৪০ বছরের ইতিহাসের অন্যতম সেরা একটি মৌসুম শেষ হলো চরম বেদনাদায়ক উপায়ে, আর পুরো মৌসুমের নায়ক গ্যাব্রিয়েল বনে গেলেন খলনায়ক।

তার প্রশংসায় ডেক্লান রাইস আরও বলেন, ‘গ্যাব্রিয়েলকে একজন মানুষ এবং একজন খেলোয়াড় হিসেবে বর্ণনা করার মতো শব্দ আমার জানা নেই।’

হৃদয়বিদারক এই হারের পর আর্সেনাল ম্যানেজার মিকেল আর্তেতাকে তার অনুভূতি জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘কষ্ট এবং গর্ব। আমি আমার খেলোয়াড় এবং স্টাফদের বলেছি, আমি যদি এক মিলিয়ন বারও তাদের ‘ধন্যবাদ’ জানাই, তবুও তা যথেষ্ট হবে না।’

শিষ্যদের সান্ত্বনা দিয়ে আর্তেতা বলেন, ‘তোমাদের এই কষ্টটা সহ্য করতে হবে, এটি হজম করতে হবে এবং একে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার জ্বালানি হিসেবে রূপান্তর করতে হবে।’ এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে আর্সেনালের রণকৌশল ও দল গঠনে বড় সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আরও বড় গন্তব্যে পৌঁছাতে চাই, তবে আমাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং খুব দ্রুত ও বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করতে হবে।’

পিএসজিএর কোচ লুইস এনরিকে বলেন, ‘আজ হয়তো দুই দলেরই জেতার যোগ্যতা ছিল। তবে পুরো মৌসুমজুড়ে আমরা যেভাবে খেলেছি, তাতে আমার মনে হয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়টা আমাদেরই প্রাপ্য ছিল। আমরা ভীষণ আনন্দিত এবং আগামী বছরও এই মঞ্চে দাপট ধরে রাখার চেষ্টা করব, কেন না তা সম্ভব নয়?’