মনে হচ্ছিল আমি শেষ মার্ক কুকুরেয়া

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৯ এএম

স্প্যানিশ ফুটবলে একের পর এক সাফল্য ছুঁয়ে ফেলা মার্ক কুকুরেয়ার পথচলাটা কোনো সাধারণ গল্প নয়। এফসি বার্সেলোনার একাডেমিতে বেড়ে উঠেও মূল দলে জায়গা না পেয়ে একসময় নাম লেখাতে হয়েছিল ছোট ছোট ক্লাবে। কঠোর পরিশ্রম, শারীরিক দক্ষতা আর মানসিক শক্তিতে তিনি ছিলেন অনন্য। তবে কেবল প্রতিভা দিয়ে কি সব হয়? অনেক সময় ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিতে প্রয়োজন পড়ে একটি সঠিক সিদ্ধান্তের।

২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী হোয়ান কাপদেভিলার সঙ্গে ‘লা এস্ত্রেয়া কে নোস উনে’ ভিডিও পডকাস্টে কথা বলার সময় কুকুরেয়া তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই সন্ধিক্ষণের গল্প শোনান। ২০২১ সালের কথা। স্প্যানিশ ক্লাব খেতাফেতে খেলছিলেন কুকুরেয়া। পারফরম্যান্স খারাপ ছিল না, কিন্তু নিজের উন্নতি নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না তিনি। কুকুরেয়া বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছিল আমি এক জায়গায় থমকে গেছি। লা লিগায় প্রথম কয়েক বছর তরুণ হিসেবে বেশ ভালো শক্তি নিয়ে খেলেছিলাম। কিন্তু একসময় যখন আর ‘উদীয়মান প্রতিভা’ বলা হচ্ছিল না, তখন এজেন্টের সঙ্গে আলোচনায় বসি।’

সেই বৈঠকেই এজেন্টরা তাকে দুটি স্পষ্ট পথ দেখিয়ে দেন। হয় উইংয়ে খেলে গড়পড়তা একজন খেলোয়াড় হয়ে থাকা, না হয় পছন্দের পজিশন লেফট-ব্যাকে ফিরে গিয়ে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন হওয়ার চেষ্টা করা।

সেই পথ ধরেই আসে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল ব্রাইটনে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব। মাদ্রিদে পরিবার নিয়ে বেশ গুছিয়ে বসেছিলেন কুকুরেয়া। তাই শুরুতে ব্রাইটনে যাওয়ার তেমন কোনো ইচ্ছে তার ছিল না। কুকুরেয়ার ভাষায়, ‘মাদ্রিদে খুব আরামে ছিলাম। নিয়মিত মূল একাদশে খেলছিলাম। তাই প্রিমিয়ার লিগের এমন এক দলে যাওয়ার কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিলাম না, যাদের লক্ষ্য খেতাফের মতোই পয়েন্ট টেবিলের তলানি থেকে বাঁচা।’

তবে তার দীর্ঘদিনের এজেন্ট অ্যালেইক্স পিকের ওপর গভীর আস্থা ছিল কুকুরেয়ার। অ্যালেইক্সই তাকে বুঝিয়ে রাজি করান। কুকুরেয়া বলেন, “অ্যালেইক্স আমাকে বলেছিল, ‘ব্রাইটন খুব সুন্দর ফুটবল খেলে, তুমি ওখানে দারুণ মানিয়ে যাবে।’ আমি দলটিকে তেমন চিনতামই না, কিন্তু ওর ওপর আমার প্রচণ্ড ভরসা ছিল। তাই বললাম, ‘ঠিক আছে, চলো যাওয়া যাক’।”

ব্রাইটনে শুরুটা মোটেও স্বপ্নের মতো হয়নি কুকুরেয়ার। প্রথম ম্যাচেই নেমেছিলেন তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে, ‘প্রথম ম্যাচটা আমার জন্য একদম ভয়াবহ ছিল’, স্মৃতির পাতা উল্টে বলেন কুকুরেয়া। ‘আমাকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হলো, আর দল জিতে গেল! ভেবে দেখুন, কতটা ভেঙে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল আমি শেষ।’

তবে আসল টার্নিং পয়েন্ট আসে পরের ম্যাচে, লেস্টার সিটির বিরুদ্ধে। কুকুরেয়া ভেবেছিলেন বাজে অভিষেকের পর কোচ তাকে বেঞ্চেই বসিয়ে রাখবেন। কিন্তু কোচ তার ওপর বিশ্বাস রেখে আবার একাদশে নামান। সেই ম্যাচে অসাধারণ পারফর্ম করে সবাইকে চমকে দেন কুকুরেয়া।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় ওই ম্যাচটাই ছিল আমার ক্যারিয়ারের আসল মোড়।’এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ব্রাইটন থেকে চেলসিতে নাম লেখান কুকুরেয়া। চেলসির হয়ে ২০২৫ সালে জেতেন ক্লাব বিশ্বকাপ। আর স্পেন জাতীয় দলের হয়ে ইউরোপা লিগ, নেশনস লিগ, ইউরো থেকে শুরু করে মূল বিশ্বকাপ সব জেতা হয়ে গেছে তার।

২০২৪ সালে হোসে গায়া চোটে পড়লে কোচ খোসে লুসি দে লা ফুয়েন্তে জাতীয় দলে ডাক দেন কুকুরেয়াকে। টোকিও অলিম্পিকে দে লা ফুয়েন্তের অধীনে রৌপ্য জয়ী কুকুরেয়া কোচের ট্যাকটিকস খুব ভালো করেই জানতেন।

সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে স্পেনের মূল জাতীয় দলে কুকুরেয়ার যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে চেলসি ও স্পেন জাতীয় দল মাতানো এই ডিফেন্ডারকে নুনো মেন্দেসের পাশাপাশি বর্তমান বিশ্বের সেরা লেফট-ব্যাক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। খেতাফের সেই একটা সিদ্ধান্ত ও এজেন্টের পরামর্শ না মেনে নিলে হয়তো এই কুকুরেয়াকে কখনোই দেখতে পেত না ফুটবল বিশ্ব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত