বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করেছে আর্জেন্টিনা। তবে মাঠের ফুটবল শেষ হলেও ম্যাচটিকে ঘিরে বিতর্ক ও জল্পনার অন্ত নেই। মেগা ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনা দলের ওপর নাকি অদৃশ্য কোনো বাহ্যিক চাপ বা হুমকি দেওয়া হয়েছিল এমন সব ষড়যন্ত্রের তত্ত্বে উত্তাল ফুটবলবিশ্ব। এমনকি সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর ‘ফকল্যান্ডস আর আর্জেন্টেনিয়ান’ লেখা বিতর্কিত ব্যানার ও জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের দায়ে দল শাস্তির মুখে পড়তে পারে বলেই নাকি খেলোয়াড়রা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এমন নানা গুজব ছড়ায়।
অবশেষে এই সমস্ত গুজবে পানি ঢাললেন আর্জেন্টিনার কোচিং স্টাফের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও সাবেক তারকা ডিফেন্ডার রবের্তো ‘রাতোন’ আয়ালা। বিশ্বকাপ ফাইনাল ঘিরে তৈরি হওয়া ষড়যন্ত্রের গল্প নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আয়ালা বলেন, ‘এসব এমন কিছু কথা যা আমরা শুনি আর ভাবি ‘মানুষ কীভাবে এসব অদ্ভুত কথা বলতে পারে? কারণ বাস্তবে এর ছিটেফোঁটাও ঘটেনি। কোনো বাহ্যিক চাপ বা হুমকি ছিল না।’ তিনি ফুটবলীয় বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে যোগ করেন, ‘একটি দল মাঠে নেমেছিল এবং তারা আমাদের চেয়ে স্পষ্টত ভালো ফুটবল খেলে বিজয়ী হয়েছে। ব্যস, এতটুকুই। এর বাইরে আর কোনো কারণ বা বাহানা খোঁজার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের কেবল ফুটবল নিয়ে কথা বলা উচিত, যা ৯০ মিনিটে মাঠের ঘাসে ঘটেছে। বাকি বাইরের কথাগুলো কোনো কাজে আসে না।’
ট্রফি নেওয়ার সময় ‘পিঠ ঘুরিয়ে’ দাঁড়ানোর বিতর্ক
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সেদিন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে স্প্যানিশ দল যখন বিশ্বজয়ের ট্রফি উঁচিয়ে ধরছিল, তখন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফদের সেদিকে পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। স্প্যানিশ মিডিয়া একে ‘অসম্মান’ এবং ‘ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ’ বলে চিহ্নিত করে। সেই বিতর্কের জবাব দিয়ে আয়ালা বলেন, ‘এখানে কোনো বিদ্বেষ বা অসম্মান দেখানোর মানসিকতা ছিল না। খেলা শেষের পর গ্যালারির এক প্রান্তে আমাদের ফুটবলারদের পরিবারের সদস্যরা কিছু সমস্যার মুখে পড়েছিলেন। আমরা স্রেফ দেখতে গিয়েছিলাম তারা ঠিক আছেন কি না। পাশাপাশি, হাজার হাজার মাইল দূর থেকে যে আর্জেন্টিনার ভক্তরা আমাদের সমর্থন জানাতে এসেছিলেন, তাদের ধন্যবাদ জানাতে আমরা ওই দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পিঠ স্প্যানিশ দলের দিকে থাকলেও, আমাদের সামনেই স্টেডিয়ামের বিশাল স্ক্রিন ছিল এবং আমরা প্রত্যেকেই সেখান থেকে স্পেনের ট্রফি উদযাপনের মুহূর্তটি দেখেছি। তাই এটাকে অহংকার বা বিদ্বেষ মনে করার কোনো কারণ নেই।’
আর্জেন্টিনা দলের প্রতি আন্তর্জাতিক স্তরে এক ধরনের নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি করা হচ্ছে দাবি করে সাবেক এই তারকা ডিফেন্ডার বলেন, ‘আমি জানি না কেন ইদানীং আমাদের জাতীয় দলকে নিয়ে এত নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়। আমরা মাঠের ফুটবলে আবেগ দিয়ে খেলি, আমাদের দেশের মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য খেলি। অথচ সবকিছুকে কীভাবে নেতিবাচক করা যায়, সেই চেষ্টা চলে।’ একই সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমের ভুল ব্যাখ্যার কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আজকাল তথাকথিত ‘স্ট্রিমার’দের যুগ এসেছে, যারা লিপ-রিডিং করে কিংবা খেলোয়াড়দের ছোটখাটো অঙ্গভঙ্গির মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে সস্তা খবর তৈরি করে। এসব বন্ধ হওয়া উচিত।”
নিজের ক্যারিয়ারে স্পেনের মাটিতে দীর্ঘ ও সফল সময় কাটানো আইয়ালা স্প্যানিশ ফুটবলের প্রতি নিজের ভালোবাসা গোপন করেননি। দুটি লা লিগা, উয়েফা কাপ ও ইউরোপিয়ান সুপার কাপ বিজয়ী এই তারকা বলেন, ‘স্পেন টুর্নামেন্ট জুড়ে অসাধারণ ফুটবল খেলেছে এবং তারা বিশ্বকাপ জয়ের সম্পূর্ণ যোগ্য। তারা যে সুন্দর স্টাইলের ফুটবল উপহার দিয়েছে, তা বিশ্বের যেকোনো ফুটবলপ্রেমীর মন জয় করবে। আমি স্পেনকে ভালোবাসি, আমার নিজের দুই সন্তানও স্পেনে জন্ম নিয়েছে। কোচ লিওনেল স্কালোনিও স্পেনে থাকেন। তাই এই দেশের সঙ্গে আমাদের আত্মিক টান রয়েছে।’
সবশেষে আয়ালা স্প্যানিশ সমর্থকদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘ভুলত্রুটি মানুষেরই হয়, তবে তা স্বীকার করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই আসল খেলা। স্পেনকে বিশ্বকাপের জন্য অনেক অভিনন্দন! ফুটবল আমাদের গর্বিত করে, আবার ভুল থেকে শেখায়। আমরা এই হার থেকে শিখব এবং ভবিষ্যতে আরও উন্নত হয়ে ফিরে আসব।’
বিশ্বকাপের ফাইনাল বাঁশি বাজার পর মাঠের মধ্যে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে হাতাহাতি ও বিশৃঙ্খলার পরিবেশ তৈরি হয়। সেই সময় স্প্যানিশ তারকা ফুটবলার ডানি ওলমোকে ধাক্কা দিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন আয়ালা। এসি মিলান ও ভ্যালেন্সিয়ার সাবেক এই তারকা সেই ভুল স্বীকার করে খোলামেলা অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। আয়ালা জানান, ‘যা হয়েছে তার জন্য আমি সত্যিই অনুতপ্ত। আমি যে পদে দায়িত্ব পালন করছি, সেখান থেকে মাথা গরম করে এমন আচরণ করা একেবারেই অনুচিত ছিল। তবে এটি কোনো ঘুষি বা বড় ধরনের মারপিট ছিল না, স্রেফ একটি ধাক্কা ছিল যা কিছু স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম অতিরঞ্জিত করে দেখাচ্ছে। একটি মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আমার ভেতরের আবেগ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু নিজের আবেগকে এভাবে প্রকাশ করা ভুল ছিল।’