ডিজিটাল যুগে রাজনীতি শুধু সংসদ ভবন, সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতা কিংবা টিভি টকশোতে সীমাবদ্ধ নেই। এখন রাজনৈতিক মতামত তৈরি হয় মিম, ট্রল, হ্যাশট্যাগ, কমেন্ট সেকশনের ঝগড়া এমনকি ভাইরাল রিলের ভেতরেও। মিডিয়া ও কমিউনিকেশন স্টাডিজে এই বাস্তবতাকে বলা হয় ‘নেটওয়ার্কড পাবলিক স্ফিয়ার’ যেখানে নাগরিক নিছক দর্শক নয়; সে একই সঙ্গে কনটেন্ট নির্মাতা, মতামত-প্রচারক এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণকারী। ফলে রাজনৈতিক প্রতিরোধ সবসময় সেøাগান হয়ে আসে না; কখনো সেটি আসে ব্যঙ্গাত্মক মিম, কখনো ট্রল পেইজ আবার কখনো ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে ডিজিটাল রসিকতা হয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এগুলো একই সঙ্গে রাজনৈতিক আবেগ উৎপাদনের কারখানা। এক সময় রাজনৈতিক দলগুলো জনসভা করে সমর্থক জোগাড় করত। এখন ভাইরাল পোস্ট রাতারাতি জনমত তৈরি করতে পারে। এই বাস্তবতায় ‘মিম’ নিছক হাস্যরস নয়, এটি রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন ভাষা। কারণ মিম এমন এক মাধ্যম, যা একই সঙ্গে দ্রুত, সংক্ষিপ্ত, আবেগপ্রবণ এবং অ্যালগরিদমিকভাবে কার্যকর। রাষ্ট্র যেখানে প্রেস ব্রিফিং তৈরি করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নেয়, সেখানে একটি ভালো মিম মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডে ক্ষমতার ভাবমূর্তি ভেঙে দিতে পারে।
সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরগাছা’র সঙ্গে তুলনা করেন। মন্তব্যটি প্রকাশ্যে আসার পরই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সংগঠনটির ফলোয়ার বাড়তে থাকে অস্বাভাবিক গতিতে। বাস্তব রাজনৈতিক দলের চেয়ে দ্রুত ভাইরাল হয়ে ওঠে, একটি ব্যঙ্গাত্মক ডিজিটাল সংগঠন। রাজনৈতিক ক্ষমতা যে শব্দ দিয়ে অপমান করতে চেয়েছিল, তরুণরা সেই শব্দকে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিণত করেছে। নিজেদের তারা পরিচয় দেয় ‘ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও অলস’ দল হিসেবে। সদস্য হওয়ার শর্তও কম চমকপ্রদ নয় বেকার হতে হবে, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকতে হবে এবং পেশাদারিভাবে অভিযোগ করার দক্ষতা থাকতে হবে। শুনতে কৌতুক মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল প্রজন্মের গভীর হতাশা। চাকরি নেই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, সামাজিক নিরাপত্তা দুর্বল। কিন্তু অনলাইনে সক্রিয় থাকতে হবে সবসময়। কারণ ডিজিটাল যুগে অফলাইন হয়ে যাওয়া মানে কেবল ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা নয়; সামাজিক দৃশ্যমানতা হারিয়ে ফেলা। এক সময় শিল্পযুগে শ্রমিকরা কারখানার সাইরেনে বন্দি ছিল, এখন তরুণরা বন্দি নোটিফিকেশনের শব্দে। এই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র পেছনে রয়েছেন অভিজিৎ দিপ নামের এক তরুণ, যিনি সাংবাদিকতা পড়েছেন এবং পরে রাজনৈতিক ডিজিটাল প্রচারণায় কাজ করেছেন। তার ভাষায়, এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন আসলে ভারতীয় তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা বেকারত্ব, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ। অর্থাৎ এটি নিছক ‘মজা’ নয়; বরং ডিজিটাল রাজনৈতিক অসন্তোষের সাংস্কৃতিক রূপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এখানে হাস্যরস ও রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রায়ই একই টেমপ্লেটের মধ্যে সহাবস্থান করে। ফলে একটি কৌতুক কখন রাজনৈতিক বক্তব্যে পরিণত হয়, তা অনেক সময় রাষ্ট্রও বুঝে উঠতে পারে না। সোশ্যাল মিডিয়া স্টাডিজে ‘পার্টিসিপেটরি কালচার’ নামে একটি ধারণা আছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যবহারকারীরা এখন শুধু তথ্য গ্রহণ করে না; তারা সেটিকে সম্পাদনা, রিমিক্স এবং ব্যঙ্গ করে এবং পুনরায় ছড়িয়ে দেয়। ফলে সংবাদ আর চূড়ান্ত সত্য থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক কাঁচামাল। দক্ষিণ এশিয়ার তরুণরা এখন খবর পড়ে কম, খবরকে মিম বানায় বেশি। একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা শেষ হওয়ার আগেই তার ট্রল ভার্সন তৈরি হয়ে যায়। অর্থাৎ রাজনৈতিক যোগাযোগ এখন আর একমুখী নয়; বরং নাগরিকরা সেটিকে পুনর্র্নির্মাণ করছে। ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ বোদ্রিয়ার বলেছিলেন, ‘উত্তর-আধুনিক সমাজে বাস্তবতার চেয়ে প্রতীকের শক্তি বেশি।’ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
এখানে ‘আরশোলা’ কেবল একটি পোকা নয়; এটি টিকে থাকার রাজনৈতিক রূপক। তেলাপোকা অন্ধকারে বাঁচে, চাপ দিলে লুকায়, আবার সুযোগ পেলে বের হয়ে আসে। দক্ষিণ এশিয়ার বহু তরুণ নিজেদের জীবনের সঙ্গেই এই উপমার মিল খুঁজে পাচ্ছে। কারণ এই অঞ্চলের তরুণদের বড় অংশই আজ অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত, রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক এবং সামাজিকভাবে হতাশ। কিন্তু ডিজিটাল জগতে তারা দৃশ্যমান। অ্যালগরিদমই এখন তাদের বেঁচে থাকার সর্বশেষ নাগরিকত্ব। ভারত সরকার বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে- এর পেছনে কোনো বিদেশি নেটওয়ার্ক বা সংগঠিত ডিজিটাল প্রভাব কাজ করছে কিনা। রাষ্ট্র এখন বুঝতে শিখেছে, ডিজিটাল ব্যঙ্গ কখনো কখনো বাস্তব রাজনৈতিক অস্থিরতার পূর্বাভাস হতে পারে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আগেও দেখা গেছে, আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ কোনো অনলাইন ইস্যু মুহূর্তেই বড় ধরনের জনঅসন্তোষের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ডিজিটাল যুগে তাই বিপ্লব সবসময় ম্যানিফেস্টো দিয়ে শুরু হয় না; কখনো শুরু হয় একটি ট্রল পোস্ট দিয়ে। রিচার্ড ডকিন্স তার ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইয়ে ‘মিম’ ধারণাটিকে ‘সাংস্কৃতিক জিন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। জিন যেমন বংশগত বৈশিষ্ট্য বহন করে, তেমনি মিম বহন করে সংস্কৃতিগত আচরণ ও ধারণা। ডিজিটাল যুগে সেই তত্ত্ব আরও বাস্তব হয়ে উঠেছে। এখন একটি মিম কেবল হাসির খোরাক নয়; এটি রাজনৈতিক হতাশা, সামাজিক ক্ষোভ এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের বাহক।
আগে সংবাদপত্রে কার্টুন ক্ষমতাকে অস্বস্তিতে ফেলত, এখন সেই ভূমিকা নিয়েছে মিম। পার্থক্য হলো, আগে কার্টুনিস্ট ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন। এখন পুরো জনগোষ্ঠীই সম্ভাব্য মিম নির্মাতা। ফলে ক্ষমতা জানে না, কাকে চুপ করাবে। যেসব সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, সেখানে মিম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ মিম এমন এক ভাষা, যা একই সঙ্গে বিনোদন ও প্রতিবাদ বহন করতে পারে। কিন্তু এই মিম সংস্কৃতিরও একটি অন্ধকার দিক আছে। গবেষক সারা মনামী হোসেন দেখিয়েছেন, অনেক সময় মিম ট্রলে পরিণত হয় এবং সেটি ভার্চুয়াল আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের যুদ্ধক্ষেত্রে রূপ নেয়। অর্থাৎ ডিজিটাল পাবলিক স্ফিয়ার কেবল মুক্ত মতের জায়গা নয়; এটি একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংঘাতেরও ক্ষেত্র। যখন মূলধারার গণমাধ্যম থেকে ব্যঙ্গ, ক্যারিকেচার ও রাজনৈতিক কার্টুন প্রায় নির্বাসিত, তখন শূন্যস্থান পূরণ করছে ইন্টারনেট মিম। প্রকৃতি যেমন শূন্যস্থান পছন্দ করে না, তেমনি সমাজও ব্যঙ্গহীন রাজনীতি দীর্ঘদিন সহ্য করতে পারে না। ফলে মানুষ এখন মিমেই সেই আনন্দ, বিদ্রুপ ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ খুঁজে নিচ্ছে, যা ডিজিটাল রাজনীতির বড় বাস্তবতা। রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হলো, মানুষ এখন আর কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা শোনে না, বরং সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে মিমে রূপান্তর করে ফেলে। ফলে ক্ষমতার ভাষা আর একমুখী থাকে না। আগে রাষ্ট্র বক্তব্য দিত, জনগণ শুনত; এখন রাষ্ট্র বক্তব্য দেয়, জনগণ সেটিকে এডিট করে, সাউন্ড বসায়, ক্যাপশন লাগায় এবং শেষ পর্যন্ত সেটিকে ব্যঙ্গাত্মক সাংস্কৃতিক পণ্যে পরিণত করে। এই কারণেই বর্তমানে রাজনৈতিক ক্ষমতা কেবল বিরোধী দলকে ভয় পায় না; ভয় পায় স্ক্রিনশট, টেমপ্লেট, ‘শেয়ার’ বাটনকে। কারণ ডিজিটাল দুনিয়ায় কোনো বক্তব্যের আসল মালিক শেষ পর্যন্ত বক্তা নয়, বরং অ্যালগরিদম। সামাজিক মাধ্যমে মিম সংস্কৃতির বিস্তার আসলে এক ধরনের ‘ডিজিটাল কার্নিভাল’ তৈরি করেছে। রুশ চিন্তাবিদ মিখাইল বাখতিন বলেছিলেন, কার্নিভালের সময়ে সমাজের প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামো সাময়িকভাবে উল্টে যায়; রাজা হয়ে যায় হাসির পাত্র আর সাধারণ মানুষ পায় ব্যঙ্গ করার স্বাধীনতা। ফেসবুক-টিকটক সংস্কৃতিও অনেকটা তেমন। এখানে মন্ত্রী, বিচারপতি, সেলিব্রিটি সবাই মিমের উপাদান হতে পারেন। ফলে ডিজিটাল জনপরিসর এক ধরনের সাংস্কৃতিক সমতা তৈরি করছে, যেখানে ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিক একই ট্রল টেমপ্লেটের ভেতরে আটকা পড়ে। গণতন্ত্রের এমন নির্মম সমতা সম্ভবত সংসদও কোনো দিন দিতে পারেনি। ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ হয়তো কয়েক সপ্তাহ পর হারিয়ে যাবে, হয়তো যাবে না। কিন্তু সেটি টিকে থাকুক বা না থাকুক এই ঘটনা এ সময়ের একটি বড় সত্যকে সামনে এনেছে। দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ সমাজ এখন আর নিছক রাজনৈতিক দর্শক নয়। তারা ক্ষোভকে মিম, হতাশাকে ব্যঙ্গ, আর ব্যঙ্গকে রাজনৈতিক প্রতীকে রূপ দেয়। ফলে ভবিষ্যতের রাজনীতি বুঝতে চাইলে, কেবল সংসদে বিতর্ক শুনলেই হবে না; নজর রাখতে হবে নতুন প্রজন্মের মিম সংস্কৃতিতেও।
ডিজিটাল পুঁজিবাদের এই যুগে মানুষের মনোযোগই সবচেয়ে বড় পণ্য। ফলে মিম শুধু রাজনৈতিক প্রতিরোধ নয়, একই সঙ্গে ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’রও অংশ। যে মিম বেশি হাসায়, বেশি ক্ষ্যাপায়, সেটিই বেশি ছড়ায়। অ্যালগরিদমের কাছে আদর্শ নাগরিক হলো সেই ব্যক্তি, যে সারাক্ষণ স্ক্রল করে, রিঅ্যাক্ট দেয় এবং বিতর্কে জড়ায়। ফলে রাজনৈতিক ক্ষোভ এখন প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতির জ¦ালানিতে পরিণত হয়েছে। বিদ্রুপের জায়গাটা এখানেই, তরুণরা রাষ্ট্রকে ট্রল করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত অ্যালগরিদমকেও খাওয়াচ্ছে। অর্থাৎ ডিজিটাল যুগে প্রতিবাদও অনেক সময় প্ল্যাটফর্মের ব্যবসায়িক মডেলের অংশ হয়ে যায়। একসময় রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল, সংগঠিত রাজনৈতিক মিছিল। এখন সেই ভয় সরে এসে জায়গা নিয়েছে ‘ভাইরালিটি’তে। কারণ মিছিল নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু ভাইরাল কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। একটি মিম সীমান্ত, দল, এমনকি ভাষাও পুরোপুরি মানে না। সেটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শহর থেকে শহর, দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে যেতে পারে। এই কারণেই আজকের রাষ্ট্রগুলো ক্রমে ‘ডিজিটাল সেনসিটিভ’ হয়ে উঠছে। তারা জানে, একটি ভাইরাল ব্যঙ্গ কখন জনরোষে রূপ নেবে, আর কখন সেটি রাজনৈতিক বৈধতার সংকট তৈরি করবে তা আগে থেকে বলা কঠিন। এখন ক্ষমতার করিডরে শুধু গোয়েন্দা সংস্থাই কাজ করে না; কাজ করে সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টিমও। কারণ এই যুগে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা অনেক সময় নির্ভর করে একটি মিমের কমেন্ট সেকশনের ওপর।