বাংলাদেশ অনন্য ভূপ্রকৃতির দেশ। নদী, হাওর, পাহাড়, বনভূমি এবং বিস্তীর্ণ সবুজ কৃষিজমির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই ভূখণ্ডের প্রকৃতি একসময় ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত, বৈচিত্র্যময় ও ভারসাম্যপূর্ণ। ঋতুবৈচিত্র্য, উর্বর মাটি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য বাংলাদেশের পরিবেশকে দিয়েছিল এক স্বতন্ত্র সৌন্দর্য ও জীবনীশক্তি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নের দ্রুতগামী চাকা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন, নদী দখল, বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক অভিঘাতে সেই প্রকৃতি আজ ক্রমে বিপন্ন হয়ে পড়ছে। রাজধানীর বাতাসে বিষাক্ত দূষণ, নদীগুলোতে শিল্পবর্জ্যরে কালো স্রোত, গ্রামাঞ্চলে খরা ও পানির সংকট, উপকূলে লবণাক্ততার বিস্তার এবং পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের ঝুঁকি সব মিলিয়ে পরিবেশগত সংকট এখন বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি কেবল একটি পরিবেশগত উদ্যোগ নয়, এটি হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ টিকে থাকার কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি সবুজ পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক জাতীয় আন্দোলন।
বিশ্বের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ সারিতে অবস্থান করছে।
ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রবণতার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এ দেশে অন্য অনেক দেশের তুলনায় আরও গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, অতিবৃষ্টি, নদীভাঙন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো দুর্যোগগুলো ক্রমেই ঘন ঘন ও তীব্র আকার ধারণ করছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার কৃষি উৎপাদনকে বিপর্যস্ত করছে এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট বাড়িয়ে তুলছে। অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি খরা ও পানির স্বল্পতা কৃষিনির্ভর মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে ফেলছে। নগরাঞ্চলে অতিরিক্ত কংক্রিট নির্মাণ, যানবাহনের ধোঁয়া এবং সবুজের অভাবে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে হিট আইল্যান্ড পরিস্থিতি তৈরি করছে, যা জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক জীবনে নতুন সংকট সৃষ্টি করছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় গাছ শুধু সৌন্দর্যের উপাদান নয়, এটি এক ধরনের জীবনরক্ষাকারী প্রাকৃতিক অবকাঠামো। ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করে, যা ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ কমায় এবং জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা অনেকাংশে প্রশমিত করে উপকূলের জনপদকে সুরক্ষা দেয়।
পাহাড়ি এলাকায় গাছের শিকড় মাটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে রাখে, ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং পাহাড়ের স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। গ্রামীণ অঞ্চলে বৃক্ষ মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণ, মাটির উর্বরতা বজায় রাখা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ঘাটতি কখনো ছিল না। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালিত হয়। কয়েক মাস পর বাস্তব পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রে হতাশাজনক হয়ে ওঠে। যেসব স্থানে চারা লাগানো হয়েছিল, সেসব জায়গার বহু গাছ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কোথাও নিয়মিত পরিচর্যার অভাবে চারা শুকিয়ে যায়, কোথাও স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রজাতি নির্বাচনের কারণে গাছ টিকে থাকতে পারে না, আবার কোথাও প্রশাসনিক অবহেলা ও তদারকির ঘাটতির কারণে পুরো উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে পড়ে। অনেক সময় বৃক্ষরোপণকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ পুনর্গঠনের কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং একটি আনুষ্ঠানিকতা বা প্রচারণামূলক কার্যক্রম হিসেবে দেখা হয়। ফলে গাছ লাগানোর পর তার সুরক্ষা, পানি সরবরাহ, বেড়া নির্মাণ, রোগবালাই প্রতিরোধ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষিত থেকে যায়। ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচিকে সফল করতে হলে, প্রথমে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক ও অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে একই ধরনের গাছ লাগালে চলবে না। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ ও লবণসহিষ্ণু প্রজাতি, পাহাড়ে মাটিধস প্রতিরোধী বৃক্ষ, গ্রামে ফলদ ও কাঠজাতীয় গাছ এবং শহরে ছায়াদানকারী ও বায়ুদূষণরোধী বৃক্ষরোপণ করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রজাতির গাছকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, কারণ বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতি অনেক সময় জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষভাবে ফলদ গাছের প্রসার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এই কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। বৃহৎ পরিসরের বৃক্ষরোপণ নার্সারি শিল্পকে নতুন গতি দিতে পারে। তৈরি হতে পারে উন্নত চারা উৎপাদন, ফলের বাগান, কাঠশিল্প, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন সব মিলিয়ে একটি বিস্তৃত সবুজ অর্থনীতি গড়ে ওঠার সুযোগ। এতে গ্রামীণ অঞ্চলে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বৃক্ষরোপণ, পরিচর্যা, ফল সংগ্রহ, কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরিবহন খাতে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি এখনো অনেকাংশে কৃষিনির্ভর। কিন্তু কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষির সঙ্গে সমন্বিত বৃক্ষভিত্তিক অর্থনীতি বা এগ্রোফরেস্ট্রি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কৃষিজমির পাশে ফলদ ও কাঠজাতীয় বৃক্ষরোপণ করলে কৃষকের আয় বৈচিত্র্যময় হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়বে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগ দিয়ে এত বড় কর্মসূচি সফল করা সম্ভব নয়। জনসম্পৃক্ততা ছাড়া এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, কৃষকসমাজ, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকারকে সমন্বিতভাবে এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রযুক্তি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ডিজিটাল মনিটরিং, জিপিএস ট্র্যাকিং, ড্রোন জরিপ এবং অনলাইন তথ্যভাণ্ডার তৈরি করলে প্রতিটি গাছের অবস্থান, বৃদ্ধি, পরিচর্যা ও টিকে থাকার হার নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ সম্ভব হবে। এতে প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং অনিয়ম ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে দুর্নীতি। তবে এই কর্মসূচির সামনে বড় পাঁচটি চ্যালেঞ্জ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। প্রথমত, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার অভাবের কারণে অঞ্চলভেদে উপযুক্ত প্রজাতি নির্বাচন না হলে বিপুলসংখ্যক গাছ অল্প সময়েই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা বাংলাদেশের অধিকাংশ বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের প্রধান সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা দিয়েছে, যেখানে গাছ লাগানোর পর পরিচর্যার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে। তৃতীয়ত, সীমিত জনসম্পৃক্ততার কারণে মানুষ অনেক সময় এই কর্মসূচিকে নিজেদের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে না, ফলে সামাজিক মালিকানাবোধ তৈরি হয় না। চতুর্থত, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্ব বণ্টনের অস্পষ্টতা প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। পঞ্চমত, জলবায়ুগত ঝুঁকি বাংলাদেশের বাস্তবতায় সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি, কারণ ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি ও লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিপুল সংখ্যক চারা ধ্বংস করে দিতে পারে। ফলে শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, গাছের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকা নিশ্চিত করাই হতে হবে এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
সীমিত সম্পদ, ঘনবসতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের অবিরাম চাপ সত্ত্বেও দেশের মানুষ বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে সাহস, শ্রম ও সম্মিলিত উদ্যোগের শক্তিতে। এখন সময় এসেছে পরিবেশ পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ার। ২৫ কোটি বৃক্ষ কেবল একটি সংখ্যাগত লক্ষ্য নয়, এটি হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, বাসযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ বাংলাদেশ নির্মাণের প্রতীক। পরিকল্পিত ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে তা দেশের পরিবেশ সুরক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি গাছ মানে শুধু একটি চারা নয় এটি নির্মল বাতাসের নিশ্চয়তা, শ্বাস-প্রশ্বাসের ভবিষ্যৎ, ছায়াময় আগামী, নিরাপদ ভূখণ্ড এবং একটি টেকসই ও সবুজ জাতির দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্নের প্রতীক।