এক কাপ চা ৫ টাকা হলে একটা চামড়া ১০ টাকা হয় কীভাবে

উত্তরবঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার বাজার দিনাজপুর শহরের রামনগরে অবস্থিত। একসময় এই বাজারে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলার চামড়া আসত। তবে এখন এই বাজারের হাঁকডাক নেই। চামড়ার দাম দিনে দিনে পড়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছরে এই বাজারে বাইরের ব্যবসায়ী তো দূরের কথা, আসছেন না পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারীর চামড়া ব্যবসায়ীরাও। বিগত দিনে কোরবানির সময়ে যেখানে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ চামড়া বেচাকেনা হতো, সেখানে এ বছরে হয়েছে মাত্র ২০ হাজারের মতো। তাও একেবারে কম দামে। বিক্রেতাদের অভিযোগ, সিন্ডিকেট করে নানা অজুহাতে কম দাম দিয়ে চামড়া কিনছেন ব্যবসায়ীরা। এতে বিপাকে পড়েছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। অনেকেই ক্ষোভে চামড়া ড্রেনে এবং রাস্তার পাশে ফেলে গেছেন।

আমাদের দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, চলতি বছর জেলার অন্য ১৩টি উপজেলার চামড়া আসেনি এই বাজারে। জেলা শহরের যৎসামান্য চামড়াই এসেছে। এ কারণে কয়েকজন ব্যবসায়ী নিজেদের ইচ্ছামতো দাম হাঁকিয়ে চামড়া ক্রয় করেছেন। চামড়া বিক্রেতাদের অভিযোগ, সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ২০ টাকা থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। আর ছাগলের চামড়া প্রথম দিনে ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও পরে ছাগলের চামড়া কেউই ক্রয় করেনি।

গ্রাম থেকে চামড়া সংগ্রহ করে নিয়ে আসা আরমান আলী বলেন, ‘সরকার তো সব ধরনের চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সঠিক দাম দিচ্ছে না। ২২ হাজার টাকার একটি ছাগলের চামড়া তারা নিতেই চাচ্ছেন না।’

হোসেন আলী নামের একজন বলেন, ‘এবারে চামড়ার কোনো দাম নেই। আমি ৬৫ হাজার টাকা দামের একটি গরুর চামড়া বিক্রি করলাম মাত্র ৫০ টাকায়। একটি ছাগলের চামড়া বিক্রি করলাম মাত্র ১০ টাকায়। চামড়াগুলো ১৫০ টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে এনেছি। আমার তো গাড়ির ভাড়াই উঠবে না। এখানে সব ব্যবসায়ী একত্রিত হয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো দাম করছেন। আর আমাদের বাধ্য হয়েই কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে।’

হুমায়ুন হোসেন নামের একজন বলেন, ‘একটি ছাগলের চামড়ার দাম বলতেছে ১০ থেকে ২০ টাকা। এখানে সরকারের তদারকির প্রয়োজন ছিল। এক কাপ চায়ের দাম যদি ৫ টাকা হয় তাহলে একটা চামড়ার দাম কীভাবে ১০ টাকা হয়। বাজারে এক জোড়া জুতা দুই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে কিন্তু একটি গরুর চামড়ার দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এই দেশে কোনো আইন নেই। আমি মনে করি এর জন্য দায়ী সরকার। সরকারের উচিত এই বিষয়ে তদারকি করা।’

মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী সোহান হোসেন বলেন, ‘গ্রাম থেকে আটটি চামড়া নিয়ে এসেছি। ব্যবসায়ীরা এই আটটির দাম বলছে ৪০০ টাকা, আবার কেউ বলছে ৫০০ টাকা, সবশেষে প্রতিটি চামড়া ১০০ টাকা করে দিতে চেয়েছে। চামড়ার বাজারের এমন অবস্থা হলে আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হব। দিনাজপুরে বর্তমানে একটি মাত্র চামড়ার আড়ত রয়েছে। এখন যদি ভালো দাম না পাই তাহলে এখানেই চামড়া ফেলে দিয়ে চলে যাব।’

আরেক মৌসুমি ব্যবসায়ী হারুন অর রশিদ বলেন, চামড়ার বাজারের অবস্থা একদম ভালো না। ৬০০ টাকা দরে আমি ১৩টি চামড়া কিনে এনেছি। কিন্তু ব্যবসায়ীরা একেকটা চামড়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বলছে। আমার এখানে ১ লাখ ৫০ টাকার একটি গরুর চামড়া রয়েছে, ব্যবসায়ী যার দাম বলতেছে ২০০ টাকা।’

এ বিষয়ে চামড়া ব্যবসায়ী ইস্কান্দার আলী বলেন, ‘চামড়ার বাজারে সরকারের নজরদারির প্রয়োজন আছে। বর্তমান বাজারে চামড়া প্রস্তুতকরণ দ্রব্য যেমন বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল, লবণ ও চামড়ার পরিবহন খরচ সবকিছুই অনেক বেশি। আমরা অনেক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে রয়েছি। এ ছাড়া সরকার এসব চামড়ার মূল্য নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে কিন্তু আমরা চামড়া বিক্রি করতে গেলে এর সঠিক সেই মূল্য পাচ্ছি না।’

চামড়া ব্যবসায়ী আরিফ বলেন, আমরা চামড়া কিনতেছি কিন্তু এখানে অনেক চামড়া কেনার পর দেখা যাচ্ছে যে, ওই চামড়া লাম্পি রোগে আক্রান্ত কোনো গরুর। পরে আমরা যখন এই চামড়াগুলো ঢাকায় নিয়ে যাই তখন এই চামড়া কেউ কিনতে চায় না। যেখানে সাধারণ চামড়ার দাম ৮০০ টাকা তখন এই লাম্পি আক্রান্ত চামড়ার দাম হয় ১০০ টাকা। এ ছাড়া আমরা চামড়ার টাকা ঠিকমতো পাচ্ছি না। আমাদের বলা হয়, এক মাস পরে চামড়ার টাকা দেবে। কিন্তু আমরা এক বছরেও টাকা পাই না। আমি এখনো গত বছরের চামড়ার টাকা পাইনি। কিন্তু তারপরও টাকা ধার করে চামড়া কিনছি।’

হাকিমপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, দিনাজপুরের হিলি মুন্সিপাড়ার চামড়াপট্টি ঘুরে দেখা যায়, মৌসুমি ব্যাপারীরা গ্রামে ঘুরে ঘুরে প্রতি পিস গরুর চামড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে কিনলেও বিক্রি করতে হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। আবার কিছু চামড়া ১০০ টাকা দরেও বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার কিছু চামড়া ব্যবসায়ীরা নিতেই চাইছে না। এ ছাড়া কেউ একটা ছাগলের চামড়া ৫ টাকা বলছে, আবার কেউ নিতেও চাইছে না। কেনা দামের চেয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করতে হওয়ায় লাভ তো দূরে থাকল আসল টাকা উঠানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ব্যাপারীরা।

তবে, হিলির চামড়াপট্টির ক্রেতা স্বপন মুন্সি বলেন, ‘আমরা সরকার নির্ধারিত দামেই  চামড়া কিনছি। এখন পরবর্তী সময়ে লবণ দেওয়ার পর কি হবে না হবে বলা যাচ্ছে না। সরকার যেভাবে বলছে, সেই হিসেবে দাম পেলে তো লাভ হওয়ার কথা। যদি সেই হিসেবে দাম না পাওয়া যায় তাহলে তো লোকসান গুনতে হবে তো আমাদের।’

কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, গত শুক্রবার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বাজার ও সড়কের পাশে সারি সারি করে রাখা কোরবানির পশুর চামড়া দেখা যায়। কোথাও কোথাও চামড়ায় লবণ না দেওয়ায় রোদ ও গরমে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। নাঙ্গলকোট উপজেলার গোমকোট বাজারের মৌসুমি ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন বলেন, গ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে একেকটা গরুর চামড়া ১০০ থেকে ১৫০ টাকা দরে কিনেছেন তারা। লাভের আশায় বাজারে আনলেও কোনো বড় ক্রেতার দেখা পাননি। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এই কানে ধরলাম, বেঁচে থাকলে আর কোনো দিন চামড়ার ব্যবসা করব না। এই শিল্পটাই ধ্বংস হয়ে গেছে।’

একই বাজারের আরেক ব্যবসায়ী বাবলু বলেন, গ্রাম ঘুরে কষ্ট করে ৮২টি চামড়া চামড়া সংগ্রহ করে বাজারে এনেছি। এখন যে দাম বলা হচ্ছে, তাতে বড় লোকসান হবে। চামড়াগুলো নষ্ট হওয়ার পথে। কী করব বুঝতে পারছি না।

অন্যদিকে লাকসাম উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের ব্যবসায়ী আবদুল মান্নান বলেন, ‘সরকার টেলিভিশনে দাম ঠিক করে দেয়, কিন্তু বাস্তবে কেউ তা মানে না। আমরা পুঁজি খাটিয়ে এখন বিপদে পড়েছি।’ এদিন দুপুর সোয়া ১২টা পর্যন্ত বিভিন্ন বাজারে কয়েকশ ব্যবসায়ী বিক্রি না হওয়া চামড়া নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। দীর্ঘ সময়েও কোনো পাইকার না আসায় অনেকে হতাশ হয়ে চামড়া ফেলে চলে যান বলেও জানা গেছে।