অতি সম্প্রতি ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা আর মার্কিনিদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসবে না। এই বক্তব্যে শান্তিচুক্তি সত্ত্বেও বিভিন্ন অজুহাতে বন্দর আব্বাসসহ ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন হামলা এবং লেবাননে বারবার ইসরায়েলের হামলার কথা বলা হয়েছে। এই কথায় ইরান কতটুকু অনড় থাকবে অথবা ট্রাম্পের সহিষ্ণুতা এবং ‘কথা দিয়ে কথা রাখার’ বিষয়ে সততার ওপর তা অনেকখানি নির্ভর করবে। জানা যাচ্ছে, আবার আলোচনা শুরু হতে পারে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, বিশ্ব রাজনীতিতে একমেরুকেন্দ্রিক শক্তি হিসেবে ‘যুক্তরাষ্ট্র’ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পায়। সেই সময় থেকে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপের অভিযোগ জোরালো হতে থাকে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ কিংবা সামরিক শক্তি প্রয়োগের বৈধতা জাতিসংঘ ও তার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে তথাকথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কিংবা ‘আরব বসন্ত’র সমর্থনের নামে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েছে, প্রাণ হারিয়েছে অসংখ্য নিরীহ মানুষ। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বিশ^ব্যাপী বিতর্ক রয়েছে। ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা বহু মানুষের কাছে মানবিক সংকট মোকাবিলার পরিবর্তে সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শন ও পররাষ্ট্রনীতি এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ভেনেজুয়েলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন নীতির প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। আবার ডেনমার্কের স্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে অস্বস্তির জন্ম দেয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ঐতিহ্যগত সম্পর্কের মধ্যেও টানাপড়েনের আভাস দেখা যায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মার্কিন নীতির ধারাবাহিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুদ্ধের শুরুতে ইউক্রেনকে বিপুল সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও, পরবর্তীকালে সেই অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যায়। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ব্যয়ভার, রাজনৈতিক বিভাজন এবং কৌশলগত লাভ-ক্ষতি নিয়ে বিতর্ক বাড়তে থাকে। সমালোচকদের মতে, ইউক্রেনকে উৎসাহিত করে সংঘাতে সম্পৃক্ত করার পর সহায়তা সীমিত করার প্রবণতা অনেকটা ‘গাছে উঠিয়ে মই সরিয়ে নেওয়ার’ মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
এদিকে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবন বিভিন্ন বিতর্কে আবদ্ধ। জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে প্রকাশিত নথিপত্র ও পুরনো সম্পর্কের প্রসঙ্গ বারবার মার্কিন রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক চলমান, তবু জনমতের একটি অংশের কাছে বিষয়গুলোট্রাম্পের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অভিযুক্ত ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের মধ্য দিয়ে ‘রেজিম পরিবর্তন’-এর পুরনো ধারণা আবারও আলোচনায় আসে। ইরানের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্বের ওপর হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নতুন মাত্রা লাভ করে। কিন্তু প্রত্যাশার বিপরীতে ইরান দ্রুত নিজেদের পুনর্গঠিত করে এবং পাল্টা কৌশলগত অবস্থান নেয়। এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের প্রতিক্রিয়া। স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেনসহ ন্যাটোভুক্ত অনেক দেশ পরিস্থিতিকে মূলত ইসরায়েল-ইরান সংঘাত হিসেবে দেখেছে এবং সরাসরি জড়িয়ে পড়তে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। আধুনিক যুদ্ধে শুধু অস্ত্রশক্তি নয় কৌশল, সরবরাহব্যবস্থা ও আঞ্চলিক সমর্থন সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই বাস্তবতায় ইরানের পদক্ষেপ পশ্চিমা কৌশলবিদদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব নতুনভাবে সামনে আসে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি সরবরাহ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সেখানে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয় বাংলাদেশসহ বিশে^র অধিকাংশ দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে তার প্রভাব পড়ে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, বর্তমান বিশ্বে কোনো সংঘাত আর আঞ্চলিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উচ্চ ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক বিভাজন সাধারণ নাগরিকদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতার উদ্যোগ সামনে আসে। একাধিক কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও, মৌলিক মতপার্থক্যের কারণে স্থায়ী সমাধানের পথ সুগম হয়নি। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাইওয়ান প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের অবস্থান এখনো পরস্পরবিরোধী। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে এই বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে বিশ্বের দুই বৃহত্তম শক্তির সম্পর্ক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের কিছু বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য প্রসঙ্গে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক মন্তব্য অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে নীতিগত অস্থিরতার প্রতিফলন বলে মনে হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন, কিছু সামরিক পদক্ষেপ প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। এই স্বীকারোক্তি শুধু একটি কৌশলগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও সীমাবদ্ধতা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইতিহাস আমাদের শেখায়, কোনো শক্তিই চিরস্থায়ী নয়। রোমান, গ্রিক সাম্রাজ্য কিংবা বিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন পরাশক্তির উত্থান-পতনের ইতিহাস সেই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে। বিশ্বে নতুন শক্তির উত্থান ঘটছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতায় চীনের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্ব রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে পুরনো শক্তির প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে নতুন শক্তির উত্থান। এই বাস্তবতায় বলপ্রয়োগের রাজনীতি নয় বরং কূটনীতি, সংলাপ এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলাই হতে পারে টেকসই পথ। অন্যথায় সংঘাতের বিস্তার শুধু একটি দেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্য নতুন অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে উঠবে।
লেখক : ক্লাসিফাইড স্পেশালিস্ট আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ
khoshroz@yahoo.com