ঈদ-পার্বণ ও পারিবারিক কিছু উপলক্ষ ছাড়া নানামুখী বাস্তবতায় বেশিরভাগ মানুষের জন্য একসঙ্গে আনন্দ-বিনোদনের সুযোগ কমই আসে। আবার অনেক সময় উপলক্ষ থাকলেও প্রয়োজনীয় ছুটি মেলে না। এতে আনন্দ ঠিক পুরোপুরি উপভোগ করা হয়ে ওঠে না। সেদিক থেকে এবারের ঈদুল আজহা অনেকের জন্য ছিল কিছুটা ভিন্ন। জরুরি সেবা ও গণমাধ্যমসহ কিছু ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশ পেশার মানুষ ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত ছুটি পেয়েছেন। তবে নানান কারণে সবার ঈদ নির্ঝঞ্ঝাট হয়নি। এই কারণগুলোর কয়েকটি উঠে এসেছে ছুটিতে পুলিশের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ সহায়তা চেয়ে আসা ১০ হাজার ৭৮টি ফোন কলে। দেশ রূপান্তরে মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯৯৯-এ সহায়তা চেয়ে যারা ফোন করেছেন, তাদের বেশিরভাগ প্রয়োজনীয় সাড়া পেয়ে সন্তুষ্ট। এ জন্য ছুটিতে পুলিশের জাতীয় জরুরি সেবার দায়িত্বে যারা ছিলেন এবং অন্য যারা নাগরিকদের প্রয়োজনে সহায়তা দিয়েছেন, তাদের সবাইকে আমরা ধন্যবাদ জানাই।
বিস্ময়কর একটি দিক হলো, ঈদের মতো আনন্দের এই মৌসুমে ৯৯৯-এ যেসব কল এসেছে, তার মধ্যে পুলিশের হিসাবে মারামারির ঘটনায় সহায়তা চেয়ে করা কল ছিল সর্বাধিক এক হাজার ৯৭৪টি। পুলিশ বলছে, প্রতি বছর ঈদের সময় মারামারির কিছু ফোন আসে। তবে এবার রেকর্ডসংখ্যক ফোন এসেছে। পারিবারিক সমস্যায়ও ৫৩০টি কল হয়েছে। জমির বিরোধ থেকে মারামারি তো আছেই। লক্ষণীয়, বিভিন্ন কারণে মারামারি বাড়ছে। কেন বাড়ছে? মানুষের মধ্যে কি অসহিষ্ণুতা বাড়ছে? পরিবারে ও সমাজে নিজেরাই আপস-রফার প্রক্রিয়া কি আর কাজে আসছে না? যদি তাই হয়, দীর্ঘমেয়াদে এটি ভালো লক্ষণ নয়। এক সময় পরিবার ও সমাজ ছিল সুখে-দুঃখে মানুষের মূল আস্থার জায়গা। আজকাল ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় একান্নবর্তী পরিবার কমছে। সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে ক্ষয় দেখা দিয়েছে। সামাজিক বন্ধন শিথিল হচ্ছে। আমরা মনে করি, পরিবার ও সমাজকেন্দ্রিক বেশিরভাগ ঘটনার শান্তিপূর্ণ প্রতিকার পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোতেই পাওয়া সম্ভব। শব্দদূষণের ঘটনায় ৩৬৬ কল হয়েছে। বিশেষ করে রাতে প্রতিবেশীর বা একই এলাকার মানুষের অসুবিধা হয়, এমন চড়া আওয়াজে মাইক বাজানো বা অন্য শব্দ তৈরি এড়াতে নাগরিক বিবেচনাবোধ যথেষ্ট হওয়া উচিত। স্থানীয় সামাজিক পদক্ষেপ এক্ষেত্রে যথেষ্ট হতে পারে। এটা ঠিক, প্রয়োজনে পুলিশের সহায়তা চাওয়া প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। মারামারি এড়ানো যায় কি না, নিজেরা পরিবারে ও সমাজে যেটা মীমাংসা করা সম্ভব, তা মেটাতে পুলিশ ডাকা দরকার কি না সেসব বিষয়ে সুবিবেচনাবোধ প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এতে পুলিশের জরুরি সেবার ওপর চাপ কমবে। এই চাপ কমানোটা বেশ দরকার, যাতে অন্যদের ৯৯৯-এ কল করতে অপেক্ষায় থাকতে না হয়। পুলিশ অতি জরুরি সমস্যার দিকে নজর দিতে পারে। এতে প্রকৃতই যাদের তাৎক্ষণিকভাবে দরকার, তারা যেন দ্রুত সেবা নিতে পারেন। যেমন নানান ছুতোয় মানুষ অন্যকে আটক রাখার ঘটনায় ৮৭১টি কল এসেছে। অসুস্থ মানুষের জন্য অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে এসেছে ৮০২ কল। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৬৬৩। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অগ্নিকা-সহ বিভিন্ন অভিযোগেও বহু নাগরিক ফোনে সহায়তা চেয়েছেন। কিছ ু ক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতেও হতে পারে। সব মিলিয়ে নাগরিকরা নিজেরা সচেতন, সতর্ক ও তৎপর হলে জরুরি সেবার মান আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯৯৯-এ কল করার পর সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে জরুরি সেবা দেওয়া হয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী বলছেন, কোনো অভিযোগে থানা পুলিশকে সরাসরি ফোন করলে তারা সেবা দিতে গড়িমসি করে। কিন্তু জাতীয় সেবায় ফোন করলে তাৎক্ষণিক সেবা পাওয়া যায়। তখন থানা পুলিশও তাৎক্ষণিকভাবে ছুটে আসে। এ ছাড়া ছোটখাটো বিষয়েও ৯৯৯-এ ফোন করলে প্রতিকার মিলছে, যা থানা পুলিশ থেকে সাধারণত পাওয়া যায় না। পুলিশ নিজেকে জনগণের বন্ধু দাবি করে থাকে। তাহলে ৯৯৯-এ ফোন করলে প্রতিকার মেলে আর সরাসরি থানা পুলিশ ও ফাঁড়িকে জানালে, কিংবা টহল পুলিশ ও চেকপোস্টের পুলিশকে বললে সেবা ‘সাধারণত পাওয়া যায় না’, জনমনে তৈরি হওয়া এমন ধারণা পুলিশের ভাবমূর্তির জন্য ভালো নয়। আমরা আশা করি, থানাসহ পুলিশ বাহিনীর সব পর্যায়ে সবাই নিয়মিত সেবার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হবেন। নাগরিকদের পক্ষ থেকে এটা মোটেই বেশি চাওয়া নয়।