চট্টগ্রাম নগর ও জেলার কোনো না কোনো জায়গায় প্রায় প্রতিদিনই ঝটিকা মিছিল বের করছে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ। আগের তুলনায় তাদের মিছিলের আকারও বড় হচ্ছে। পুলিশ এদের দমাতে পারছে না। প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ সংগঠনের এসব কর্মসূচি জনমনে ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের পাশে অনন্যা আবাসিক এলাকায় মিছিল করেছে ছাত্রলীগ। মিছিলে নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শাখার এক সহসভাপতি। এর আগে গত সোমবার সকালে নগরের জিইসি মোড় এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ওমরগণি এম ই এস কলেজ শাখার শতাধিক নেতাকর্মী ঝটিকা মিছিল করেন। ওই মিছিলের একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বিপরীতে সানমার টাওয়ার ওয়ান ভবনের সামনের সড়ক থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি জিইসি মোড় অভিমুখে অগ্রসর হয়।
পুলিশ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এসব মিছিলের ছবি দেখে ধরপাকড়ও অব্যাহত রেখেছে। সোমবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা করে মঙ্গলবার আদালতের আদেশে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া মিছিলের পূর্বাপর ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চট্টগ্রামে হঠাৎ রাজপথে শক্তি দেখাতে তৎপর হয়ে উঠেছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। ঝটিকা মিছিলের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে। এর আগে এক দেড় থেকে দুই মিনিটের ঝটিকা মিছিল হতো। এখন মিছিলের আকার বাড়াতে পুলিশের চিন্তাও বেড়েছে।
এদিকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পুলিশের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট থানার ওসির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘নিষিদ্ধ সংগঠনকে আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। মাঠপর্যায়ে পুলিশকে “সার্বক্ষণিক এলার্ট” থাকার বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে নিষিদ্ধ সংগঠন কিছু করতে না পারে।’
নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল কেন দমানো যাচ্ছে না এমন প্রশ্নের উত্তরে সিএমপির এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘অতীতে বলপ্রয়োগ করেও জামায়াত-শিবিরের ঝটিকা মিছিল যেমন দমন করা যায়নি, তেমনি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মিছিলও দমানো যাচ্ছে না।’ সিএমপির আরেক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের অনেকেই আদালত অঙ্গনে হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু”, “শেখ হাসিনা আসবে বাংলাদেশ হাসবে” ইত্যাদি সেøাগান দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে পুলিশের করার কী করার আছে।’
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ হঠাৎ কেন উজ্জীবিত এমন প্রশ্নের জবাবে আত্মগোপনে থাকা মহানগর আওয়ামী লীগের মাঝারি-পর্যায়ের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার যতই দমন পীড়ন চালাক। ছাত্রলীগ দমে যাবে না।’ জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর প্রথম সারির অনেক নেতা আত্মগোপন চলে যান। অনেকেই পাড়ি জমান বিদেশে। এরপর থেকে স্থবির হয়ে পড়ে সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচি। তবে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর মধ্যে নতুন কৌশলের আভাস মিলছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গেল অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ের দিকে মাঠে শক্তি প্রদর্শন শুরু করে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো। শুরুর দিকে ঝটিকা মিছিল হলেও এখন দিন দিন নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। প্রকাশ্যে তারা এসব কর্মসূচি চালাচ্ছে। যা নিয়ে জনমনে ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। মিছিলের আগাম তথ্য পেতে মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দারা ব্যর্থ হচ্ছেন কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে সিএমপির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করেননি।
আত্মগোপনে থাকা নগর ছাত্রলীগ নেতাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া ঝটিকা মিছিলের ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আগের তুলনায় ছাত্রলীগের মিছিলে নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। জানা গেছে, বিভিন্ন কৌশলে এবং টাকার বিনিময়ে মাঠে শক্তি দেখানোর জন্য ছাত্রলীগ এই ঝটিকা মিছিলগুলোর আয়োজন করছে। স্থানীয় লোকজন যাতে তাদের না চিনতে পারেন এবং সহজে মিছিল করে চলে যেতে পারেন, সেজন্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে লোকজনকে নগরে আনা হচ্ছে। আর মিছিলের টাকা ও নির্দেশ বিদেশে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা হোয়াটসঅ্যাপে দিচ্ছেন।