ঈদুল আজহার পর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচা চামড়ার বাজার ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ হাটে এবার দেখা গেছে অস্বাভাবিক স্থবিরতা। যেখানে ঈদ-পরবর্তী সময়ে ক্রেতা-বিক্রেতার সরব উপস্থিতিতে জমে ওঠার কথা ছিল বেচাকেনা, সেখানে এখন চোখে পড়ছে লবণমাখানো চামড়ার স্তূপ আর উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ অপেক্ষা। ট্যানারি মালিকদের প্রতিনিধি ও বড় পাইকারদের অনুপস্থিতিতে কার্যত থমকে গেছে চামড়া বাজারের লেনদেন।
সোমবার বিকেলে শম্ভুগঞ্জ চামড়ার হাট ঘুরে দেখা যায়, হাটের বিভিন্নস্থানে খোলা জায়গায় সংরক্ষণ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ গরু ও ছাগলের চামড়া। ক্রেতার আশায় ব্যবসায়ীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান করলেও উল্লেখযোগ্য কোনো কেনা-বেচা হচ্ছে না। সীমিতসংখ্যক আড়তদারের উপস্থিতিতে দরদামেও তৈরি হয়নি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কোরবানির ঈদের পর ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এই হাটে চামড়া নিয়ে আসেন। সাধারণত ঢাকার ট্যানারি মালিকরা এখান থেকে বড় পরিসরে চামড়া সংগ্রহ করেন। সাপ্তাহিক শনিবারের হাটের পাশাপাশি ঈদ উপলক্ষে মঙ্গলবার বিশেষ হাটও বসে। তবে ঈদের পর এখন পর্যন্ত কোনো ট্যানারি প্রতিনিধি চামড়া কিনতে আসেননি বলে জানিয়েছেন আড়তদাররা। এমনকি তারা কবে আসবেন, সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
সরকার চলতি বছর ঢাকার ভেতরে গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই মূল্য বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
হাটে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, হাজার হাজার চামড়া সংগ্রহ করে আনার পরও ক্রেতার দেখা না মেলায় তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। অনেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে ১০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে কাঁচা চামড়া কিনেছেন। এর সঙ্গে প্রতিটি চামড়ায় প্রায় ২০০ টাকার লবণ ও গড়ে ১০০ টাকার শ্রমব্যয় যুক্ত হয়েছে। ফলে বিক্রি না হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ী আফরোজ হোসেন বলেন, ঈদের দিন ময়মনসিংহ নগরীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেছি। শম্ভুগঞ্জ হাটে ভালো দামে বিক্রির আশা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন বড় ক্রেতারও দেখা পাইনি। চামড়া বিক্রি না হলে সব বিনিয়োগই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
মুক্তাগাছা থেকে আসা ব্যবসায়ী হোসেন মিয়া বলেন, চামড়া সংরক্ষণ করতে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। লবণ কিনেছি, শ্রমিক নিয়েছি। এখন বিক্রি না হলে কয়েক লাখ টাকার লোকসান গুনতে হবে।
স্থানীয় আড়তদার সাইদুল ইসলাম মনে করেন, এবারের পরিস্থিতি আগের বছরের তুলনায় বেশি সংকটপূর্ণ। তিনি বলেন, বাজারে চামড়ার অভাব নেই, কিন্তু ক্রেতার সংকট প্রকট। বড় ক্রেতারা না আসায় ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন।
ট্যানারি মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিনিধিদের হাটে না পাঠিয়ে বাজারে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে চামড়ার দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হাটের ইজারাদারের প্রতিনিধি মো. মোস্তফা কামাল বলেন, সরকার প্রতি বছর মূল্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে বাজারে তা অনেক সময় কার্যকর হয় না। চামড়া খাতকে সচল রাখতে সরকার, ট্যানারি মালিক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সংগ্রহকারীদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং সময়মতো ট্যানারি মালিকদের বাজারে সক্রিয় করা না গেলে প্রতি বছর একই ধরনের সংকট তৈরি হবে। গত বছরও অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ করা হয়েছে এবং লবণযুক্ত চামড়া ৩০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, আমরা চাই ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য পান এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেন নষ্ট না হয়। সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কেনার জন্য ক্রেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।