চট্টগ্রাম নগরীর বন্দর থানার নিউমুরিং এলাকার বাসিন্দা মাজেদা বেগম। দুই ছেলে ও স্বামীকে নিয়ে একটি বহুতল ভবনের নিচতলায় থাকেন। চলতি মাসের শুরুতে অতিভারী বর্ষণ শুরু হলে বাসায় পানি উঠে এবং কয়েকদিন জলাবদ্ধ থাকে। এর মধ্যেই গত ১০ জুলাই বড় ছেলে সাইমুনের শরীরে জ্বর আসে। এর তিন দিন পর আক্রান্ত হন মাজেদা। প্রাথমিকভাবে স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেলেও এক সপ্তাহেও জ্বর না কমায় গত শুক্রবার তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষায় তাদের দুজনেরই ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। বর্তমানে তারা সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন।
একই অবস্থা নগরীর আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনির বাসিন্দা আকবর হোসাইনেরও। টানা বৃষ্টিতে আট দিন ধরে তাদের নিচতলার বাসায় পানি জমে ছিল। এরপর ৮ জুলাই তার শরীরে তীব্র জ¦র আসে। পরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। তিনিও এক সপ্তাহ ধরে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
শুধু মাজেদা, সাইমুন বা আকবর নন; চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি থেকে জন্ম নেওয়া এডিস মশায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। গতকাল রবিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সরেজমিনে ঘুরে অন্তত ২০ জন ডেঙ্গু রোগীর সঙ্গে কথা বলে এই চিত্র দেখা যায়। এদের মধ্যে আটজন চট্টগ্রাম শহরের, আটজন বিভিন্ন উপজেলার এবং বাকি চারজন পার্শ্ববর্তী কক্সবাজার জেলার বাসিন্দা। তবে চট্টগ্রাম শহরের আটজন বাসিন্দার মধ্যে পাঁচজনই বন্দর থানার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা, যা ওই এলাকায় এডিস মশার প্রকোপের ভয়াবহতার ইঙ্গিত দেয়।
জুলাইয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ : চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে চট্টগ্রামে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫৮ জনে। এর মধ্যে বছরের প্রথম পাঁচ মাসে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও বর্ষা শুরু হতেই বদলে যায় চিত্র। গত বছর পুরো জুন মাসে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১২২ জন, সেখানে এবার প্রথম ১৯ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ২৬০ জন। চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রামের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট ৮৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। এর মধ্যে চমেক হাসপাতালে আছেন ৩৭ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৭ জন।
অতি ঝুঁকিতে ৮ ওয়ার্ড : সম্প্রতি চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকার ৩৭০টি বাড়ি থেকে নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে ২৭টিতেই এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ডেঙ্গুর প্রধান বাহক ‘এডিস ইজিপ্টাই’। লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের তিনটি আন্তর্জাতিক সূচকেই চট্টগ্রামের ঝুঁকি এখন উচ্চমাত্রায় রয়েছে। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে এডিস মশার ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা বা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওয়ার্ডগুলো হলো উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা। বর্তমানে হাসপাতালেও এসব এলাকার রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
উপসর্গে আসছে ভিন্নতা, জ¦র হলেই পরীক্ষার তাগিদ: চিকিৎসকেরা বলছেন, বর্তমান ডেঙ্গুর ধরন আগের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। এবার রোগীদের মধ্যে উচ্চ জ¦র দেখা যাচ্ছে না, বরং শরীর ব্যথার পরিবর্তে অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি, তীব্র পেটব্যথা ও ডায়রিয়া বেশি দেখা যাচ্ছে। চমেক ও জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, এবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অনেক রোগীর মধ্যে শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি শক সিনড্রোমের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। এতে রোগীর রক্তচাপ দ্রুত কমে যায় এবং তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ডা. এ এস এম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, এবার রোগীর জ্বরের মাত্রা কম দেখা যাচ্ছে। শরীরে রেশও তেমন দেখা যাচ্ছে না। তবে বমি, পেটব্যথা, ডাইরিয়ার সঙ্গে লিভার ও কিডনিতেও সমস্যা দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগীর মাড়ি দিয়ে রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গও দেখা যাচ্ছে।
উপজেলায় সীতাকুন্ড-কর্ণফুলী বেশি ঝুঁকিতে : সিভিল সার্জনের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরীর বাইরে বিভিন্ন উপজেলাতেও ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনক। মোট আক্রান্ত ৫৫৮ জনের মধ্যে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ২২৭ জন এবং অন্যান্য জেলা থেকে আসা ১১২ জন রোগী রয়েছেন। উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সীতাকুন্ডের, যেখানে সর্বোচ্চ ৫৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এরপরেই রয়েছে কর্ণফুলী উপজেলা (২৬ জন), রাউজান (২২ জন), লোহাগাড়া (২০ জন), মিরসরাই (১৮ জন), পটিয়ায় ১৭, বাঁশখালীতে ১৫ ও আনোয়ারায় ১২ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মশক ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহী বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিন সকাল-বিকেল লার্ভিসাইড ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। বেশি আক্রান্ত এলাকায় বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ড. জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, চমেক হাসপাতালে ১০০ শয্যার নতুন ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া জেনারেল হাসপাতালেও ২০ শয্যার বিশেষ ডেঙ্গু ব্লক প্রস্তুত আছে।
সরকারি ভবন থেকেই শুরু হচ্ছে পরিচ্ছন্নতা অভিযান: ডেঙ্গু প্রতিরোধ এবং চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করতে আগামী ২৫ জুলাই সব সরকারি দপ্তর ও আবাসিক ভবনের ছাদে একযোগে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। এক সভায় তিনি জানান, অবহেলা বা গাফিলতি হলে সরকারি বাসা বরাদ্দ বাতিলসহ কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।