সব গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। প্রান্তিক মানুষ থেকে শুরু করে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারিসহ সব ধরনের শিল্প, শিক্ষাসহ প্রায় সর্বত্র বিদ্যুতের সব ধরনের ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই দাম বৃদ্ধি প্রযোজ্য হচ্ছে। দাম বৃদ্ধির জন্য সরকার যে সময়টি বেছে নিয়েছে, তা লক্ষণীয়। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেট দেওয়ার কথা। ঠিক তার সপ্তাহখানেক আগে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, এই দাম বৃদ্ধির ফলে সরকারের অতিরিক্ত আয় হবে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তাতে বিদ্যুতে ৫৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি কমে ৪১ হাজার কোটিতে দাঁড়াবে। দেশ রূপান্তরে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর এখন গ্যাসের দামও বাড়াতে চায় সরকার। পেট্রোবাংলা এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত খরচ বিবেচনায় নিয়ে গ্যাসের দাম বাড়াতে সরকারকে সুপারিশ করেছে। কিছুদিন আগে জ্বালানি তেলের দামও বেড়েছে। সব মিলিয়ে আমরা কিছুটা উদ্বিগ্ন।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছিলেন, আগামী দুই বছর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে না। জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম এরই মধ্যে বেড়েছে। গ্যাসের দাম যেকোনো সময় বাড়বে, এমন আশঙ্কা আছে। মন্ত্রীর এমন ঘোষণার ৩/৪ মাসের মধ্যেই দাম বৃদ্ধি নৈতিকভাবে কতটা সঠিক? এভাবে একটির পর একটি সেবার দাম সবার জন্য বাড়ানো হতে থাকলে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে যে বাড়তি চাপ পড়বে, তা কি সরকারের বিবেচনায় আছে? গড়ে সবক্ষেত্রে দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের জন্য অন্য কী বিকল্প হতে পারে?
আমরা মনে করি, অন্য বিকল্প আছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা সম্ভবত আমলে নেয়নি। দেশে বিদ্যুতের গ্রাহকের বড় অংশ প্রান্তিক মানুষ, যাদের জন্য এই সেবাটি ‘লাইফলাইন’ হিসেবে বিবেচিত হয়। শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী এমন সংযোগ প্রায় ১ কোটি ৭৯ লাখ। এর মধ্যে গ্রামেই আছে ১ কোটি ৬১ লাখের বেশি লাইফলাইন সংযোগ। ভর্তুকিমূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে এই পরিবারগুলোর শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ অব্যাহত রাখা দরকার। অথচ তাদেরও এখন বাড়তি বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে। এটা মোটেই ঠিক হয়নি। কারণ, বিদ্যুতে ভর্তুকির বড় সুফল পান সচ্ছল ও ধনী মানুষরা। তাদের ভর্তুকি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে বহু পণ্য ও সেবার উৎপাদন খরচ বাড়বে। বিক্রির ব্যয়ও বাড়বে। এতে বর্তমানে চড়া মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে জনজীবনে আর্থিক চাপ কম আসে, তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
সরকারের জন্য ভর্তুকি কমানোর কী উপায় আছে? আমরা মনে করি, সরকারকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেল উৎপাদন ও সংগ্রহের খরচ কমাতে হবে। বিদ্যুতে সরকারের ব্যয় বেশি হওয়ার বড় কারণ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চড়া ভাড়া (ক্যাপাসিটি চার্জ)। কারা এর সুবিধাভোগী, তা দেখা দরকার। দৃশ্যত দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হলেও সরকারকে এখনই দ্রুত ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি কমাতে হবে।
আর্থিক সামর্থ্য ও গ্রাম-শহর নির্বিশেষে গ্রাহকদের আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো পিক ও অফ-পিক সবসময়, ক্ষেত্রভেদে প্রয়োজনের সময়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া। কৃষি-শিল্পে উৎপাদন সচল রাখতে এর কোনো বিকল্প নেই।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা, জাতীয় সংসদে ও সংসদের বাইরের বিরোধী দলগুলো বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আমরা আশা করি, সবার গঠনমূলক ও বাস্তবমুখী পরামর্শ সরকার আমলে নেবে। আমাদের চাওয়া, মানুষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে স্বস্তি পাক।