পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দময় ছুটির রেশ কাটতে না কাটতে, রাজধানী মিরপুরের একটি নিস্তব্ধ ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহান বেগম নামের এক বৃদ্ধ মায়ের গলিত লাশ উদ্ধার হয়েছে। এই ঘটনা জাতির বিবেককে তীব্র ঝাঁকুনি যেমন দিয়েছে তেমনি সমাজকে দাঁড় করিয়েছে চরম সত্যের মুখোমুখি। গণমাধ্যমে যখন এই মর্মান্তিক খবরটি উঠে আসে, তখন শিউরে উঠেছে প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষের মন। জানা গেছে, দুর্ভাগা-নিঃসঙ্গ এই মায়ের সন্তানরা সমাজে উচ্চশিক্ষিত, প্রথম সারির চাকরিজীবী এবং প্রত্যেকে অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত। অথচ, সেই সন্তানদের জন্মদাত্রী মা নিজ ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে একাকী দিনের পর দিন ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত এবং নিঃসঙ্গ অবস্থায় ধুঁকে ধুঁকে মারা গেলেন। অবাক যে, সন্তানরা তার কোনো খবরই রাখেনি। লাশে পচন ধরার পর যখন প্রতিবেশীরা উৎকট গন্ধ পেল, তখন উদ্ধার হলো মরদেহ। এই হৃদয়বিদারক ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা? এটি কি কেবলই এক মৃত্যু? মনে হয়, তা নয়। আসলে, এটি আমাদের তথাকথিত আধুনিক শহুরে সমাজের নৈতিক মূল্যবোধের চরম দেউলিয়াত্ব এবং সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়ের এক জ্বলন্ত ও নির্মম চিত্র। এটি আমাদের সামাজিক জীবনে পারিবারিক বন্ধন ধসে পড়ার এক নির্মম প্রামাণ্য দলিল।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে সন্তানকে ‘মানুষ’ করার মূল মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে তথাকথিত ভালো রেজাল্ট, নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি এবং সরকারি বা বহুজাতিক কোম্পানির উচ্চ বেতনের চাকরি নিশ্চিত করা। কিন্তু মিরপুরের এই ঘটনা আমাদের আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কেবল ‘অর্থ উপার্জনের যন্ত্র’ তৈরি করছে ‘মানুষ’ নয়। আমাদের বাঙালি সমাজে বাবা-মাকে ‘বটবৃক্ষ’ মনে করা হয় যার ছায়ায় সন্তানরা বড় হয়ে ওঠে। নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাওয়ানো, নিজের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে সুশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে মা-বাবার ত্যাগ চিরন্তন। তাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সন্তানের যতœ, ভালোবাসা ও একটুখানি সাহচর্য পাওয়া বাবা-মায়ের অধিকার। কিন্তু আজ অনেক সন্তান, বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য ভুলে গিয়ে তাদের প্রতি চরম অবহেলা প্রদর্শন করছেন। বর্তমান প্রজন্মের একাংশ, শিক্ষার কাক্সিক্ষত লক্ষ্য থেকে দূরে সরে গিয়ে কেবল ‘ডিগ্রিধারী’ এবং ‘অর্থ উপার্জনের যন্ত্রে’ পরিণত হচ্ছেন। যে শিক্ষা একজন সন্তানকে জন্মদাত্রী মায়ের প্রতি ন্যূনতম দায়িত্ববোধ,
কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও মানবিকতা প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা শেখাতে পারে না, সেই উচ্চশিক্ষা আসলে কোনো শিক্ষা? নাকি শিক্ষার নামে তা বিরাট প্রহসন! এমন প্রশ্ন ওঠা কোনোভাবেই অস্বাভাবিক নয়। তাহলে কি সন্তানের উচ্চশিক্ষা, বাবা-মায়ের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে? পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় আমরা ভয়াবহ আত্মকেন্দ্রিক ও ভোগবাদী জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছি। এখানে ‘আমি, ক্যারিয়ার, স্ত্রী আর সন্তান’ এই বৃত্তের বাইরে আর কারও স্থান নেই। শৈশবে যে বাবা-মা সন্তানকে আঙুল ধরে গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে শিখিয়েছেন, সন্তানের সুখের জন্য নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন, সন্তানের দুঃখ-কষ্টে যাদের বুক ফেটে যেত সেই বাবা-মা-ই আজ বৃদ্ধ বয়সে সন্তানদের কাছে এক ‘অপ্রয়োজনীয় বোঝা’ হয়ে উঠছেন। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে যখন তাদের সবচেয়ে বেশি মানসিক ও শারীরিক সাহচর্যের প্রয়োজন, তখনই তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে নিঃসঙ্গতার অতল গহ্বরে। কেউ কেউ দায় এড়াতে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে এক চিলতে ঘরে রেখে আসছেন, কেউ আবার মিরপুরের এই দুঃখী মায়ের মতো ব্যস্ত শহরের কোনো এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের অন্ধকূপে বাবা-মাকে একাকী নিঃসঙ্গভাবে বন্দি করে রাখছেন। এই নিঃসঙ্গতা কি কেবল শারীরিক কষ্ট? অবশ্যই না বরং এটি একজন মানুষকে মানসিকভাবে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ তিল তিল করে মেরে ফেলার নামান্তর। কতটা বুকভাঙা আর্তনাদ নিয়ে, কতটা অভিমান বুকে চেপে মিরপুরের এই মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, তা ভাবলে যেকোনো বিবেকবান মানুষের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠার কথা।
মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে হয়তো এ দুর্ভাগা মা, দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এই ভেবে যে, সন্তানরা তাকে উদ্বার করবে। কিন্তু তারা কেউ আসেনি। পবিত্র ঈদুল আজহার দিনও, জন্মদাত্রী মায়ের খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি তারা। হায়রে সন্তান! মানুষের আচরিত প্রতিটি ধর্মেই পিতা-মাতার সেবা করাকে পরম ইবাদত ও সর্বোচ্চ নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের সামাজিক মূল্যবোধে এ ঐতিহ্য রয়েছে। প্রাচ্যের সমাজ ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল যৌথ পরিবারের টান, মায়া-মমতা আর ত্যাগের ওপর ভিত্তি করে। অবশ্য পশ্চিমা সংস্কৃতিতে পরিবারিক ঐতিহ্য আমাদের বিপরীত। বাংলাদেশে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ আধুনিকতার নামে, ‘প্রাইভেসির’ নামে সেই পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করছে। যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে পারিবারিক বন্ধনগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হচ্ছে। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, আজকের ঝলমলে যৌবন চিরস্থয়ী নয়। চিরন্তন সময়ের চাকা ঘুরে আজ যারা তরুণ বা মধ্যবয়সী, কাল তারা প্রবীণ হবেন। আজ যে সন্তান তার মা-বাবার খোঁজ নেন না, কাল তার নিজের সন্তানও যে তাকে কোনো একদিন বৃদ্ধাশ্রম বা নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটে একাকী ফেলে যাবেন না তার গ্যারান্টি কোথায়? পিতা-মাতার প্রতি আজকের অবহেলা, আগামী দিনে নিজেদের জীবনেও ফিরে আসতে পারে এই ধ্রুব সত্যটি সমাজ যেন ভুলতে বসেছে।
মিরপুরের এই নিমর্ম ও করুণ মৃত্যু কি কেবল একজন হতভাগ্য মায়ের প্রস্থান? অবশ্যই নয়। সম্ভবত এটি আমাদের সম্মিলিত সামাজিক বিবেকের মৃত্যু। এই ঘটনা পারিবারিক কাঠামোর বড় ধরনের ভাঙনের জাজ¦ল্যমান প্রতিচ্ছবি। এ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ কী? আমি মনে করি, পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্বশীল কর্তব্য নিশ্চিত করার জন্য শুধু নতুন আইন প্রণয়ন বা বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। কারণ আইন মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের মধ্যে আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করতে পারে না। দেশের বিদ্যমান আইনে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণের বিষয়টি স্বীকৃত হয়েছে। তবু বয়স্ক পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের অবহেলা, একাকিত্ব ও নিরাপত্তাহীনতা রয়েই গেছে। এর মূল কারণ আইনি দুর্বলতা নয় বরং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা এবং ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তার। এই বাস্তবতায় এখন প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন, আত্মশুদ্ধি এবং পারিবারিক শিক্ষার আমূল সংস্কার। সন্তানদের দায়িত্বশীল করে গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায়ও নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা জোরদার করা জরুরি। পারিবারিক জীবনে পারস্পরিক সম্মান ও সহমর্মিতার পরিবেশ সৃষ্টি এবং সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধার সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিত ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সরকারকে এমন জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যাতে সন্তানরা পিতা-মাতার সেবা ও সম্মানকে শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে।
মিরপুরের সেই মায়ের নিথর ও গলিত দেহটি, আজ সমাজের পচনশীল রূপটিকে ফুটিয়ে তুলছে। এই পচনরোধে এখনই আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর এই ব্যবস্থা কোনো আইন প্রয়োগ করেই সম্ভব হবে না। আইন একটি প্রয়োজনীয় সহায়ক উপায় হবে সত্য, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান নিহিত রয়েছে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা, পারিবারিক সংস্কার এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত প্রয়াসে। আজ অঙ্গীকার করার সময় এসেছে, আমরা আর কোনো মাকে এভাবে অবহেলা আর নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে মরতে দেব না। পৃথিবীর কোনো প্রান্তে, কোনো মায়ের শেষ জীবন যেন এমন নির্মম না হয়। আমরা যেন ভুলে না যাই মায়ের পায়ের নিচেই সন্তানের বেহেশত। আমাদের এটাও মনে রাখা দরকার ‘যে ঘরে মা-বাবার চোখে জল পড়ে, সে ঘরে কখনো পরম স্রষ্টার আশীর্বাদ বা সমৃদ্ধি আসে না।’ তাই আমরা আমাদের ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা সময় বের করে মা-বাবার পাশে দাঁড়াই। জাগতিক সমস্ত ব্যস্ততা, ক্যারিয়ার আর অর্থ উপার্জনের মোহ সাময়িকভাবে দূরে সরিয়ে শেকড়ে ফেরার চেষ্টা করি। ঘরে ফিরে মা-বাবার হাতটি ধরি, তাদের মুখে একটুখানি হাসি ফোটাতে উদ্যোগী হই। তা না হলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের শিক্ষা, জৌলুসপূর্ণ সভ্যতা চিরকালের জন্য এক বিবেকহীন শিক্ষা, পঙ্গু সভ্যতা এবং এক স্থায়ী কলঙ্ক হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
লেখক : উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
srkhan@du.ac.bd