চট্টগ্রামে চার বছরের শিশু ধর্ষণ ১৫ দিনে চার্জশিট দিল পুলিশ

চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকায় চার বছরের শিশুকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় দায়ের করা মামলার ১৫ দিনের মাথায় আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৬ এ ওই চার্জশিট জমা দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগরের বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (নিরস্ত্র) তানভীর আহমেদ।

বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান। আদালতের প্রসিকিউশন শাখার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী রবিবার চার্জশিট বিচারিক আদালত শিশু সহিংসতা প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনালে চলে যাবে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা জানান, তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ, মেডিকেল রিপোর্ট ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এসবের ভিত্তিতে মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করে গতকাল আদালতে দাখিল করা হয়েছে।

গত ২১ মে বাকলিয়া থানার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের নুর হোসেন চেয়ারম্যানঘাটা এলাকার আবু জাফর রোডের একটি গুদাম কক্ষে চার বছরের এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত মনির হোসেনকে (৩০) গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালতে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। চার্জশিটে একমাত্র আসামি করা হয়েছে মনির হোসেনকে। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার জাহাপুর ইউনিয়নের বাখরাবাদ এলাকায়। মামলায় মোট সাক্ষী করা হয়েছে ১৫ জনকে। চার্জশিটে আসামির বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০) সংশোধন (২০২৬) এর ৯ (১) ধারার অপরাধ সংঘঠনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

চার্জশিটে বলা হয়, আদালতে ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আসামি মনির হোসেন বলেন, ‘২১ মে বিকেল ৩টা। আমি ডেকোরেশনের কাপড়চোপড় একাই ধোয়ামোছা করছিলাম। এরমধ্যে ছোট বয়সের একটা মেয়ে আসে। বয়স হবে ৪। মেয়েটি একটি বিড়াল ধরতে ডেকোরেটরের এলাকায় ঢুকে যায়। মেয়েটি একটি বিড়াল নিয়ে খেলতে ছিল। আমি মেয়েটিকে দোকান থেকে বের হয়ে যেতে বলি। তখন আমাকে শয়তান প্ররোচনা দেয়। আমি মেয়েটার ওপর যৌন নিপীড়ন চালাই। মেয়েটি চিৎকার করলে ছেড়ে দিই। মেয়েটি চলে গেলে আমি পুনরায় কাপড় ধোয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ৫/৬ মিনিট পর এক নারীসহ ১০/১২জন লোক এসে আমাকে চার্জ করে। এ সময় এলাকার আরও লেকজন এসে আমাকে মারধর করে। পরে পুলিশ এসে আমাকে উদ্ধার করে।

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, মামলার বাদী শিশুটির বাবা পেশায় একজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক। স্ত্রীসহ তার সংসারে দুই মেয়ে এক ছেলে। স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বাদী থাকেন নগরের বাকলিয়া থানার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের নুর হোসেন চেয়ারম্যানঘাটা আবু জাফর রোডস্থ রুপা কলোনিতে। বাদীর স্ত্রী পেশায় একজন গার্মেন্টসকর্মী। ঘটনার দিন বাদী ও তার স্ত্রী কর্মস্থলে চলে যান। সন্তানদের রেখে যান বাদীর শাশুড়ির কাছে। ঘটনার আগের দিন একটি অটোরিকশা কিনতে শাওন নামে এক বন্ধুর সঙ্গে ঢাকা চলে যান বাদী। বাদী যেখানে বসবাস করেন সেই কলোনির প্রবেশ গেটের বাইরে দুটি কক্ষ রয়েছে। ওই দুটি কক্ষ আবদুর রহিম বিল্ডিংয়ের নিচে ‘ভাই ভাই ডেকোরেশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের গোডাউন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ওই গোডাউনের প্রথম কক্ষটি মামলার ঘটনাস্থল।

ভিকটিম শিশুর নানি জানান, তার কাছে তিন সন্তানকে রেখে কর্মস্থলে চলে যান তার মেয়ে অর্থাৎ শিশুটির মা। বেলা দুইটার দিকে টিসিবির পণ্য আনতে বাসা থেকে বের হন তিনি। এ সময় বাসায় ছিলেন তার স্বামী (শিশুটির নানা)। বেলা সোয়া তিনটার দিকে বাসায় এসে তিনি দেখতে পান তার নাতনি বাসার সামনে যন্ত্রণায় কাঁদছে আর মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। জানতে চাইলে বলে, ‘আমার গলা ও মুখ চেপে ধরে এক লোক ব্যথা দিয়েছে।’ লোকটি সে চিনে কিনা জানতে চাইলে হ্যাঁসূচক উত্তর দিয়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে ডেকোরেশন গুদামের কর্মচারী মনিরকে শনাক্ত করে।

বিষয়টি জানাজানি হলে মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ খবর পেয়ে পুলিশ অভিযুক্ত মনির হোসেনকে ঘটনাস্থলে গিয়ে আটক করে। শিশুটিকে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর ঘটে যায় লঙ্কাকান্ড। ধর্ষণের শিকার হয়ে শিশুর মৃত্যু হয়েছেএ রকম খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। মনিরকে থানায় নিতে গিয়ে দীর্ঘ সাত ঘণ্টা অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয় পুলিশকে। কাঁদানে গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, ফাঁকা গুলি ছুড়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি পুলিশ। এ সময় দুজন সাংবাদিকও গুলিবিদ্ধ হয়। আহত হন অনেকে। পরে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে কৌশলে মনিরকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাতেই মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী শিশুর বাবা।