মাত্র কয়েক বছরেই জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (জেন এআই) স্বাস্থ্যসেবা থেকে শিক্ষা, বিনোদন থেকে অর্থ খাত, এমনকি আইন-আদালতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। যদিও আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্ত বা রায়ে জেন এআই-এর ব্যবহার ন্যায়বিচারের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিচ্ছেন। এই প্রযুক্তি বিচারিক সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত হলে বিভ্রমমূলক (এআই হ্যালুসিনেশন) তথ্য থেকে সৃষ্ট ভুল ফলাফল, বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব প্রভৃতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে বেশ কিছু সংখ্যক বিচারক আদালতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এবং পরবর্তীকালে রায় লেখার কাজে এই নব্য প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। বিচারিক সিদ্ধান্তে এআইয়ের এ রকম অযাচিত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, স্পেন, জামাইকা, পাকিস্তান, ইতালিসহ বেশ কিছু দেশের উচ্চ আদালত বিচারক এবং আদালত স্টাফদের জন্য প্রযোজ্য এ বিষয়ক নির্দেশিকা, নীতি, নিয়ম বা প্র্যাকটিস ডিরেকশন ইতিমধ্যে জারি করেছে।
সাধারণভাবে এসব নির্দেশিকাগুলোতে বলা হয়েছে যে, বিচারকরা আদালতের নির্দিষ্ট কাজে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবেন। যেমন : দীর্ঘ আইনি নথির সারসংক্ষেপ তৈরি, মোকদ্দমার কাগজপত্র অনুবাদ, কথ্য সাক্ষ্য লিপিবদ্ধকরণ, আইনি নজির শনাক্তকরণ বা রায়ের পাঠযোগ্যতা বৃদ্ধির মতো প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পাদনের জন্য সহায়ক সরঞ্জাম হিসেবে এআই ব্যবহার করা যাবে। তবে মূল বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রায় লেখাসহ বিচারিক সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত কার্যাবলিতে কোনোভাবেই এআই প্রয়োগ করা যাবে না। এ ছাড়াও এআইয়ের সীমাবদ্ধতা, বিচারকদের জন্য সতর্কতা, পক্ষগুলো ও নথিপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা, বিচারকরা এআই ব্যবহার করলে, তার দায়িত্ব গ্রহণ প্রভৃতি বিষয়ে সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে দেওয়া এক বক্তৃতায় যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদাধিকারী বিচারপতি জিওফ্রে ভস এমন এক বিস্তৃত পরিসরের আইনি সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিগগিরই নিতে সক্ষম বা অচিরেই সেরকম সিদ্ধান্ত নিতে বিচারকদের ব্যাপকভাবে সাহায্য করতে পারবে। ভস বলেন, ‘পেনশন বা ভাতার পরিমাণ, কিংবা ব্যক্তিগত আঘাতজনিত ক্ষতিপূরণ এবং উপার্জন হ্রাসের হিসাবের মতো ব্যাপক যান্ত্রিক সিদ্ধান্তের জন্য এআই-এর ব্যবহার সম্ভবত অর্থ ও সময় বাঁচাবে।’ তবে সেই সঙ্গে তিনি বিচারিক সিদ্ধান্তে এআইয়ের এ ধরনের ব্যবহার মানবাধিকার লঙ্ঘন করবে কিনা, তা নিয়ে আলোচনারও আহ্বান জানান। পরবর্তী বছর পুনরায় একটি বক্তৃতায় এ প্রেক্ষাপটে মানুষের কোন অধিকারগুলো সুরক্ষিত থাকা উচিত, তা নিয়ে ভস আবারও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের আহ্বান জানান। তিনি আইনি ব্যবস্থা ও বিচারিক প্রক্রিয়াতে এআই প্রযুক্তি দায়িত্বের সঙ্গে, কার্যকর এবং নিরাপদভাবে ব্যবহার করার ওপর জোর দেন। যদিও যুক্তরাজ্যে এখন উল্লিখিত নির্দেশিকা দ্বারা বিচারিক সিদ্ধান্তে এআই ব্যবহার না করার জন্য বলা হয়েছে। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টের একটি আদালত বিমানযাত্রীদের অধিকার সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য ‘ফ্রাউকে’ নামের এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। ফ্রাউকে পূর্ববর্তী সময়ে নিষ্পত্তি হওয়া মামলা এবং রায় বিশ্লেষণ করে পূর্বনির্ধারিত খসড়া থেকে রায় তৈরি করে। বিচারকরা তারপর সেই খসড়া থেকে চূড়ান্ত রায় তৈরি করেন; যা রায়ের খসড়া তৈরিতে ব্যয়িত সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
তাইওয়ানে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো বা জালিয়াতির মামলায় আদালতকে রায় তৈরিতে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত যন্ত্রের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই এআই সিস্টেমটি ঘটনা, আইনি যুক্তি, তথ্যসূত্র এবং চূড়ান্ত রায় সংবলিত একটি সম্পূর্ণ খসড়া রায় তৈরি করতে সক্ষম। অতঃপর বিচারক সেই খসড়াটি পর্যালোচনা করেন এবং অনুমোদন সাপেক্ষে, কোনো পরিবর্তনসহ বা পরিমার্জন ছাড়াই এটিকে আনুষ্ঠানিক রায় হিসেবে জারি করতে পারেন।
আবার যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের আদালতে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বিচারকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার শুরু করেছেন। তারা এখন এমন একটি টুল পরীক্ষা করছেন, যা দ্রুত শত শত পৃষ্ঠার আইনি আবেদনপত্র সংক্ষিপ্ত করতে পারে এবং কোনো বিচারকের লেখার শৈলীর নমুনা ব্যবহার করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে, এমনকি প্রাথমিক রায়ের খসড়া তৈরি করতেও সাহায্য করতে পারে। আদালতের কর্মকর্তারা বলছেন এই পাইলট প্রোগ্রামের মাধ্যমে মৌলিক বিচারিক কাজে সহায়তা ও মামলার জট কমাতে এআই প্রযুক্তি দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। অপরদিকে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা সম্প্রতি প্রাথমিক রায় তৈরি করতে এআই টুল ব্যবহার করছেন এবং তাদের সিদ্ধান্ত যাচাই করার জন্য চ্যাটবটকে নির্দেশনা দেওয়ার সরকারি অনুমোদনও পেয়েছেন। এআই-এর মতো অ্যালগরিদমিক সিস্টেমের ফলাফল ভুল নাকি শুদ্ধ সেটি নির্ধারণের জন্য অবিরাম মানবিক তত্ত্বাবধান, নিরীক্ষা এবং সংশোধন প্রয়োজন। যার জন্য পুনরায় সময়, শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ অপরিহার্য। তা ছাড়া এআইয়ের পক্ষপাতদুষ্ট প্রশিক্ষণ ডেটা থেকে উদ্ভূত বিভ্রম বা ভুল, দাবিকৃত সুবিধাগুলোকে প্রশ্নের সম্মুখীন করতে পারে। এআইর মতো উদীয়মান প্রযুক্তি আদালত প্রশাসন পরিচালনা এবং করণিক কাজের চাপ কমাতে উপযুক্ত হতে পারে। কিন্তু মানব বিচারকদের প্রতিস্থাপন, এমনকি আপাতদৃষ্টিতে কম গুরুত্বপূর্ণ মামলাতেও, ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলোকে প্রচ-ভাবে ক্ষুণœ করবে। যে মূল্যবোধ রক্ষা করার জন্য বিচার ব্যবস্থা বিদ্যমান; সেসবের বিনিময়ে প্রশ্নবিদ্ধ সামঞ্জস্যতা, কার্যকরিতা বা দক্ষতার বিকাশ হওয়া নিশ্চয় উচিত নয়।
লেখক : এআই ব্যবহার বিষয়ক ডক্টরাল গবেষক গলওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, আয়ারল্যান্ড
m.sourav1@universityofgalway.ie