পুকুর-দিঘি-লেক

নির্বিচার ভরাট বন্ধ চাই

মানুষ অনেক এলাকা চেনে পুকুর, দিঘি ও লেকসহ বিভিন্ন জলাশয়ের পরিচিতিতে। অনেক পুকুর, দিঘির একটি নাম আছে। মানুষের মুখে এ নামগুলো শোনা যায়। দলিলপত্র আর সাইনবোর্ডেও নামগুলো দেখা যায়। নির্বিচারে ভরাটের শিকার হওয়ায় বহু জলাশয় বাস্তবে অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে। দেশ রূপান্তরে গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরীর আন্দরকিল্লায় রাজাপুকুর লেন নামে একটি এলাকা আছে। একসময় পুকুরটি ছিল। তার অস্তিত্ব এখন নেই। দেওয়ানজী পুকুর লেন বলে বিখ্যাত একটি জায়গার পুকুরটিও আর নেই। যদিও সেই লেনে বহুতল ভবন ও দোকানপাটসহ বহু কিছু হয়েছে। একইভাবে হারিয়ে গেছে কমলদহ দিঘি, মিছি পুকুর, মাইল্ল্যার দিঘিসহ অনেক জলাশয়। শুধু চট্টগ্রাম মহানগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে বিএস জরিপে ৪ হাজার ৫৯৭টি পুকুর-দিঘির অস্তিত্ব ছিল। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৫৯টি ভরাট হয়ে গেছে। এভাবে সারা দেশে গ্রাম, ছোট-বড় শহর, মহানগরগুলোয় পুকুর-দিঘি ভরাট হওয়ার খবর আসে।

দেশে ঠিক কতগুলো পুকুর-দিঘি কাগজে বা নামে আছে, এর মধ্যে ঠিক কতগুলোর অস্তিত্ব আছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সব মিলিয়ে ১২ লাখ ৮৮ হাজার ২২২টি বড় পুকুর-দিঘি থাকার কথা। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, ছোট-বড় ডোবা ও ব্যক্তিগত জলাশয়সহ এই সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি হতে পারে। অন্যদিকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন মোট পুকুর-দিঘির সংখ্যা ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩২৭টি। এর মধ্যে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৭৮টি পুকুর-দিঘি বর্তমানে মজে যাওয়া  জলাশয়, যা ব্যবহারের অনুপযোগী। ব্যক্তি-স্বার্থে এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কর্তৃপক্ষের অবহেলায় নির্বিচারে পুকুর-দিঘি ভরাট চলতে থাকায় সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিটি পুকুর-দিঘিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় পাখি, কীটপতঙ্গ ও জলজ প্রাণী থাকে। জলাশয় ভরাট হয়ে গেলে এগুলো একসময় হারিয়ে যায়। একই সঙ্গে হারায় জীববৈচিত্র্য। এতে বাস্তুসংস্থানিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে জনপদগুলো বসবাসের পরিবেশ হারাচ্ছ। পুকুর-দিঘিগুলো এলাকার মানুষ নৈমিত্তিক কাজে ব্যবহার করতেন। বসতেন পাড়ে। অনেকে সাঁতার শিখেছেন নিজের এলাকার পুকুর-দিঘিতে। এখন শিশুরা সাঁতার শেখার জায়গা পায় না। অনেক এলাকার ভাসমান মানুষ এবং আগুন লাগলে একমাত্র পানির উৎস ছিল এসব জলাশয়। ভরাট করায় এখন আগুন নেভাতে অনেক এলাকায় কাছাকাছি পানি পাওয়া যায় না। এতে জানমালের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ছে।     

পুকুর-জলাশয় এলাকার পরিবেশ শীতল রাখে। ভরাট হতে থাকা, সবুজের পরিমাণ কমে যাওয়া, উঁচু ভবন নির্মিত হতে থাকাসহ বিভিন্ন কারণে প্রায় সর্বত্র বাস্তবে রেকর্ডকৃত তাপমাত্রার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা অনুভূত হয়।

জলাশয় সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী পুকুর-দিঘি ভরাট নিষিদ্ধ। ভূমি রেকর্ডে কোনো জলাশয় থাকলে কোনোভাবেই ভরাট করা যায় না। মানুষ কি জানে এসব? মানার তাগিদ ক’জনের আছে? মানানোর উদ্যোগ কি আছে? এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) জলাশয় ভরাট বন্ধের নির্দেশনা আছে। চট্টগ্রামের ড্যাপে সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে, ১৫ কাঠা আয়তনের বড় পুকুর-জলাশয়ে কোনোভাবে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া যাবে না। বাস্তবে তা মানা হয় কি? যদি মানাই হতো, এতগুলো পুকুর-দিঘি ভরাট হলো কী করে? রাজধানীর গুলশান লেকসহ অনেক স্থানে জলাশয়ের পাড় ভরাট করে ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য প্লট বানিয়ে বরাদ্দ দেওয়ার উদাহরণ আছে। কারা বরাদ্দ দিলেন আর নিলেন এবং কীভাবে, এগুলো খতিয়ে দেখা দরকার।

নতুন শহর, শিল্প এলাকা ও সড়কের জন্য জলাশয়সহ হাজার হাজার একর জমি রাষ্ট্র অধিগ্রহণ করে। এখন মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশ বাঁচানোর জন্য ভরাট হওয়া ঠেকাতে প্রয়োজনে বড় পুকুর-দিঘিসহ জলাশয়গুলো নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করতে পারে।