সাবধান! ফলে রাসায়নিক

পাকা আম বাজারে আসতে শুরু করেছে। নিজে আম কিনেছি এবং খেয়েছি। কিন্তু প্রথমদিকে আমের প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যেত না। কারণ অপরিপক্ব আম কৃত্রিম উপায়ে পাকিয়ে বাজারজাত করা হয়েছে। আজকাল পাকা ফল গাছ থেকে পেড়ে বাজারজাত হয় না। কাঁচা ফলই রাসায়নিক যৌগ দিয়ে কৃত্রিম উপায়ে পাকিয়ে বাজারজাত করা হয়। এ কারণে ভোক্তাদের মধ্যে আম ও অন্যান্য ফল খাওয়া নিয়ে চরম আতঙ্ক থাকে। জানা যাচ্ছে, বাগান থেকে পাড়ার পর আমে ৫ বারেরও বেশি রাসায়নিক মেশানো হয়। অভিযোগ রয়েছে আম পাকার পর তা যেন পচে না যায়, এ জন্য নিয়মিত স্প্রে করা হচ্ছে ফরমালিন। রাতে আমের দোকান বন্ধ করার আগে ফরমালিন স্প্রে করা হয়। ভোরে ওই আমের রাসায়নিক পরীক্ষা করা হলেও, ফরমালিনের উপস্থিতি ধরা পড়ে না। তা ছাড়া ক্যালসিয়াম কার্বাইড মেশানো আম উচ্চ তাপমাত্রায় রাখা হলে, ক্যালসিয়াম সায়ানাইড তৈরি হতে পারে। পাকানো আম খাওয়ার পর, দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে মানুষ। আম বিক্রির এ মৌসুমে সংশয়ে ভুগতে হচ্ছে সবাইকে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পঞ্চাশ কেজি আম পাকাতে খাঁচায় ১০০ গ্রাম ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিতে হয়। আবার চকচকে করার জন্য আমে এক ধরনের কেমিক্যাল দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীরা আরও বলেছেন, জলীয়বাষ্পের সংস্পর্শে এসে ক্যালসিয়াম কার্বাইড অ্যাসিটাইলিন গ্যাস উৎপন্ন করে। এই গ্যাসের প্রভাবেই আম পাকে।

যতটুকু ক্যালসিয়াম কার্বাইডের জলীয় দ্রবণ আমে দেওয়া হোক না কেন, তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। চাষিরা দাবি করছেন, গাছপাকা আম পরিবহন করলে খরচে পোষাবে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে গাছপাকা আম নেওয়ার সময় তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বেশি। প্রাকৃতিক উপায়ে ফল পাকার পর বিক্রি করতে আড়তে পাঁচ থেকে সাত দিন রাখার প্রয়োজন। আর সব ফল একসঙ্গে পাকে না। এগুলো নিয়মিত বাছাই করতে খরচ বেশি পড়ে। যে কারণে তারা একসঙ্গে সব ফল পাকাতে রাসায়নিক প্রয়োগ করেন। নির্দিষ্ট সময়ের আগে আম পাকিয়ে, অধিক মুনাফা পাওয়ার জন্য কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এমন অপরাধ করছে।

বাগানের বিভিন্ন গাছে আম ধাপে ধাপে পাকে। কিন্তু তা পরিবহন ও ব্যবসার জন্য সুবিধাজনক নয়। ফলে একসঙ্গে প্রচুর পরিমাণ আম পাকাতে কেমিক্যাল প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের পরিবহন খরচ কমে। তা ছাড়া ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহারে ফলের রঙ হয় সুন্দর। ক্রেতাকে আকৃষ্ট করা যায় সহজে। কিন্তু একবারের জন্যও তাদের বোধে আসে না- যারা এই ফল খাচ্ছেন, তাদের পরিণতি কী হতে পারে! বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে আম যত রঙিন, সে আমে তত রাসায়নিক মেশানো হয়েছে এটা নিশ্চিত। তাই হালকা সবুজাভ আধাপাকা আম কেনা সবচেয়ে নিরাপদ। বোঁটা কালো ও শুকনা দেখলে, আম এবং কাঁঠাল কিনবেন না। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, উন্নত প্রসেসিং অ্যান্ড প্যাকেজিং প্ল্যান্ট স্থাপন করা গেলে, ২-৩ সপ্তাহ আম রাখা যাবে। সে ক্ষেত্রে ফরমালিন ব্যবহার প্রয়োজন হবে না। এ কাজে বেসরকারি উদ্যোক্তা বা সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। উন্নতমানের প্যাকেট করে আম বাজারজাত করা গেলে, নির্দিষ্ট সময়ের পর আম পাকবে। আলট্রাভায়োলেট রশ্মি দিয়ে আম জীবাণুমুক্ত করে প্যাকেটজাত করা যেতে পারে।

প্রাকৃতিক উপায়ে ফল পাকার পেছনে যে রাসায়নিক উপাদানটি মূল ভূমিকা পালন করে, তার নাম ইথাইলিন। গাছ বা ফলে উৎপাদিত ছোট আকৃতির একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক যৌগ ইথাইলিন। ফল যখন পরিপক্ব হয়, তখন ফলে ইথাইলিন উৎপাদনের পরিমাণ থাকে সর্বোচ্চ মাত্রায়। ইথাইলিন ফলের বিভিন্ন জিনকে উদ্দীপিত করার ফলে, তৈরি হয় নানা ধরনের প্রয়োজনীয় সংখ্যক এনজাইম। এমাইলেজ এবং পেকটিনেজ এই ধরনের দুই প্রকার গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম। কাঁচা ফলের ভেতর থাকে স্বাদবিহীন দীর্ঘ আকৃতির শর্করা, যাকে আমরা বলি ‘স্টার্চ’। এমাইলেজ স্টার্চকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে সুক্রোজ, ফ্রুকটোজের মতো ছোট আকৃতির যৌগে রূপান্তরিত করে। এই বিক্রিয়া ফলের গুণাবলি কমিয়ে ফলকে মিষ্টি ও রসালো করে তোলে। অন্যদিকে পেকটিনেজ ফলের শক্ত খোসা বা আবরণ পেকটিনকে ভেঙে তাকে নরম করে। অন্য আরেক ধরনের এনজাইম, ফলের সবুজ ক্লোরোফিলকে রাসায়নিক রূপান্তরের মাধ্যমে কেরোটিনয়েডের মতো রঙিন উপাদান সৃষ্টি করে বলে পাকা ফল লাল বা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। বিভিন্ন এনজাইমের রাসায়নিক কর্মকা-ের ফলে বিভিন্ন রঞ্জক পদার্থের সৃষ্টি হয় বলে পাকা ফল বিভিন্ন রঙের আকার নেয়। অন্য একটি এনজাইম থাকার ফলে অ্যাসিড ভেঙে, তার অমøত্বকে নিরপেক্ষ করে। যে কারণে কাঁচা টক ফল পাকলে আর টক থাকে না। ফলের বৃহদাকৃতির যৌগগুলো ভেঙে ছোট ছোট উদ্বায়ী যৌগে রূপান্তরিত হয় বলে আমরা ফলের সুগন্ধ পাই। বলার অপেক্ষা রাখে না, গাছপাকা ফল নিঃসন্দেহে সর্বোৎকৃষ্ট, নিরাপদ ও সুস্বাদু। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে প্রযুক্তির উন্নয়ন, ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, চাহিদা-সরবরাহের বৃদ্ধি, মানুষের লোভ-লালসা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অতিমাত্রায় অতিপ্রাকৃতিক করে তুলেছে।

ফল পাকানোর জন্য যে রাসায়নিক যৌগটি প্রত্যক্ষভাবে কাজ করে তার নাম অ্যাসিটাইলিন গ্যাস যা ইথাইলিনের মতো অনুরূপ একটি সমগোত্রীয় রাসায়নিক দ্রব্য। ক্যালসিয়াম কার্বাইড পানি বা জলীয়বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড এবং অ্যাসিটাইলিন গ্যাস উৎপন্ন করে। ফল পাকানোর ক্ষেত্রে অ্যাসিটাইলিনের ভূমিকা ঠিক ইথাইলিনের মতো। দেশে সাধারণত পানিতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড গুলিয়ে তাতে ফল ডুবিয়ে তুলে নিয়ে রেখে দিলে দুয়েক দিনের মধ্যে তা পেকে যায়। তবে এটি একটি বিপজ্জনক প্রক্রিয়া। এ ধরনের কাজে যেকোনো সময় আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এ ছাড়া আর্সেনিক ও ফসফরাসযুক্ত কার্বাইড ফলের আবরণ বা ফলের ভেতর ঢুকে গেলে, সমূহ বিপদ ঘটাতে পারে। অনেকে আবার কার্বাইড মিশ্রিত পানি স্প্রে করে ফলের ওপর ছিটিয়ে পাতা বা খড় দিয়ে ঢেকে রেখে অল্প সময়ে ফল পাকায়। এটাও বিপজ্জনক। তবে ক্যালসিয়াম কার্বাইডের নিরাপদ ব্যবহার সম্ভব। সাধারণত একটি প্যাকেটে কার্বাইড পুরে একটি বদ্ধ ঘরে জমিয়ে রাখা ফলের স্তূপের পাশে রেখে দিলে, ফল থেকে বেরিয়ে আসা জলীয়বা®প ক্যালসিয়াম কার্বাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যাসিটাইলিন উৎপন্ন করবে, যা ফল পাকাতে সাহায্য করবে। মনে রাখতে হবে, ক্যালসিয়াম কার্বাইড কোনোভাবেই মানুষ বা ফলের সং¯পর্শে আসতে পারবে না। ইথেফোনের জলীয় দ্রবণ বা ইথাইলিন গ্যাসের মাধ্যমে ফল পাকানো নিরাপদ বলে অভিহিত করা হয়। ইথ্রেল বা ইথেফোনের জলীয় দ্রবণ সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ইথাইলিন গ্যাস উৎপন্ন করে, যা ফল পাকাতে সাহায্য করে। এ পদ্ধতিতে ফল পাকালে বিপদের ঝুঁকি থাকে না। জানা যাচ্ছে, ইথেফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে ক্যানসার ও কিডনি নষ্টসহ মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। প্রকৃত সত্য হলো, ফল বা টমেটো পাকানোর জন্য মাত্রাতিরিক্ত ইথেফোনের প্রয়োজন হয় না। ভারতে ফল ও টমেটো পাকানোর জন্য ইথেফোন বা ইথ্রেল ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করেছে। কারণ ইথেফোন ও ইথ্রেল ক্যালসিয়াম কার্বাইডের মতো ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবে ইথেফোন ফল বা টমেটোতে না ছিটিয়ে, ভিন্নভাবে ওগুলোকে পাকানো যায়। কলা ও টমোটো পাকানোর জন্য ফাইজার, কাসির, হারভেস্ট, প্রমোট জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় বলে আমরা জানি। ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার না করে, প্রাকৃতিক উপায়ে পরিপক্ব কাঁচা ফল পাকানোর পদ্ধতি অতি পরিচিত। কয়েকটি ছোট ছিদ্রযুক্ত বাদামি রঙের কাগজের থলেতে ভরে মুখ বন্ধ করে খড় দিয়ে ঢেকে রেখে দিলে, দুয়েকদিনের মধ্যে ফল পেকে যায়। ফলের মধ্যে দুয়েকটি আপেল পুরে দিলে ফল পাকার কাজ ত্বরান্বিত হয়। আপেল সাধারণত বিপুল পরিমাণে ইথাইলিন গ্যাস উৎপন্ন করে, যা ফল পাকতে আবশ্যক হয়। 

ফল কেনা ও খাবারের ব্যাপারে নিরাপত্তা ও সাবধানতা অবলম্বনের জন্য কিছু করণীয় উল্লেখ করা হলো এক, খাওয়ার আগে খুব ভালো করে ফল পানিতে ধুয়ে নিন। চলমান পানির টেপের নিচে কয়েক মিনিটের জন্য ফল রেখে দিলে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ধৌত হয়ে পরিষ্কার হয়ে যাবে।

দুই, মৌসুমের আগে ফল কিনবেন না। মৌসুম শুরুর আগে বাজারে প্রাপ্ত ফল কৃত্রিম উপায়ে পাকানো হয়। তিন, বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় দেখালেও, ফল ভালো নাও হতে পারে। যেসব ফলের গায়ের রঙ সর্বত্রই একই রকম তা কৃত্রিম উপায়ে পাকানো হয়েছে বলে ধরে নিতে পারেন। যেমন কলার কাঁদির কিছু কলা কাঁচা, কিছু হলুদ হলে বুঝতে হবে তা কৃত্রিম উপায়ে পাকানো হয়নি। টমেটোর চামড়ার রঙ সর্বত্র সমানভাবে লাল এবং আম এবং পেপের রঙ কমলালেবুর মতো রঙ হলে বুঝতে হবে, এসব ফল কার্বাইড দিয়ে পাকানো হয়েছে। মনে রাখবেন, গাছ পাকা ফল বা প্রাকৃতিক উপায়ে পাকানো ফল সবসময় নিরাপদ।

লেখক : অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

drmuniruddin@gmail.com