মাথাব্যথা ব্রেন টিউমারের প্রধান লক্ষণ

ডা. এম. এস. জহিরুল হক চৌধুরী

অধ্যাপক ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল

৮ জুন বিশ্ব ব্রেন টিউমার দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো A Closer Look.’ অর্থাৎ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন। মস্তিষ্কের কোনো অংশে অস্বাভাবিক পি- অথবা কোষের জমাট বাঁধাকে ব্রেন টিউমার বলা হয়। অস্বাভাবিক কোনো পিন্ড বা জমাটবদ্ধ কোষ (টিউমার) বেড়ে গেলে তা মস্তিষ্কের ওপর চাপ তৈরি করে, মস্তিষ্কের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। সঠিক চিকিৎসা না হলে এর ফলে রোগী মৃত্যুবরণ করতে পারে।

ধরন

প্রাইমারি ব্রেন টিউমার : যে ব্রেন টিউমার সরাসরি মস্তিষ্ক থেকে উৎপন্ন হয় তাকে প্রাইমারি ব্রেন টিউমার বলে। যেসব স্থানে টিউমার হতে পারে : মস্তিষ্কের কোষ মস্তিষ্কের আবরণী পর্দা (মেনিনজেস) স্নায়ুকোষ গ্রন্থি

সেকেন্ডারি ব্রেন টিউমার : যে ব্রেন টিউমার শরীরের অন্য স্থান থেকে উৎপন্ন হয়ে মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটে, তাকে সেকেন্ডারি ব্রেন টিউমার বলা হয়। যেসব ক্যানসার থেকে এ ধরনের ব্রেন টিউমার হয় তা হলোফুসফুসের ক্যানসার ব্রেস্ট ক্যানসার কিডনির ক্যানসারত্বকের ক্যানসার

ঝুঁকি

বয়স : যেকোনো ক্যানসার অথবা টিউমারের ঝুঁকি বয়সের সঙ্গে বাড়তে থাকে। বয়স ৫০-এর ওপরে হলে ব্রেন টিউমারের কোনো লক্ষণ দেখা মাত্রই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করতে হবে।

রাসায়নিক পদার্থ : কর্মস্থলে অথবা পরিবেশে রাসায়নিকের মাত্রা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি থাকা ব্রেন টিউমারের কারণ হিসেবে চিহ্নিত এবং ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

তেজস্ক্রিয়তা : তেজস্ক্রিয়তার ফলে ব্রেন টিউমারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। দেখা গেছে অন্যান্য ক্যানসারের জন্য যে রেডিয়েশন থেরাপি দেওয়া হয় তা থেকে ব্রেন টিউমারের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

জিনগত : কিছু ব্রেন টিউমারে রোগীর শরীরে জিনগত পরিবর্তন দেখা গেছে, যা থেকে বোঝা যায় যে পরিবারে কারও ব্রেন টিউমার থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।

লক্ষণ

ব্রেন টিউমারের লক্ষণ টিউমারের আকার ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। কিছু টিউমার সরাসরি মস্তিষ্কের ক্ষতি করে, আর কিছু মস্তিষ্কের ওপর চাপ তৈরি করে মস্তিষ্কের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। এ অবস্থায় বেশ কিছু লক্ষণ  দেখা যায়  

মাথাব্যথা ব্রেন টিউমারের প্রধান লক্ষণ। ব্রেন টিউমারজনিত মাথাব্যথার লক্ষণ : সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তীব্র মাথাব্যথা থাকে ঘুমের মধ্যে মাথাব্যথা শুরু হয় হাঁচি, কাশি ও ব্যায়ামের সময় মাথাব্যথা অনুভূত হয়।

এ ছাড়াও যে লক্ষণ দেখা যায়  

বমি হওয়া দৃষ্টি ঝাপসা বিভ্রান্তি খিঁচুনি শরীর বা মুখম-লের কোনো অংশে দুর্বলতা মানসিক ভারসাম্যহীনতা স্মৃতিশক্তি লোপ খাবার খাওয়া ও হাঁটায় সমস্যা হওয়া

রোগ নির্ণয়

ডাক্তার বিভিন্ন পরীক্ষা করে দেখেন যে রোগীর মস্তিষ্কের স্নায়ু ঠিকভাবে কাজ করছে কি না। এ ছাড়াও ডাক্তার অফথালমোস্কোপ ব্যবহার করে চোখ পরীক্ষা করেন। চোখ পরীক্ষার ক্ষেত্রে ডাক্তার দেখেন যে, চোখের স্নায়ুগুলো ফুলে গেছে কিনা। ব্রেন টিউমারের ফলে মাথার খুলির ভেতর চাপ বেড়ে গেলে চোখের স্নায়ুর ওপর চাপ ফেলে, যা এই পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়।

এর পাশাপাশি ডাক্তার আরও কিছু শারীরিক পরীক্ষা করে থাকেন। যেমন : মাংসপেশির দৃঢ়তা স্মৃতিশক্তি ভারসাম্য ও সমন্বয় গাণিতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা

এরপর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা করেন।

সিটি স্ক্যান, রক্ত পরীক্ষা, এমআরআই 

মাথার খুলির এক্স-রে, বায়োপসি

 চিকিৎসা

 ব্রেন টিউমারের চিকিৎসা নির্ভর করে টিউমারের আকৃতি, অবস্থান ও ধরনের ওপর।

নিউরোসার্জারির মাধ্যমে সম্পূর্ণ টিউমার, কিংবা টিউমারের কিছু অংশ অপসারণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই টিউমার মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং আকার বেড়ে যাওয়ার ফলে মাথার খুলির ওপর চাপ ফেলে। এ অবস্থায় আংশিক অপসারণের ফলে মারাত্মক ক্ষতি এড়ানো যায়। তবে কিছু টিউমার আছে, যা মস্তিষ্কের মধ্যে এমনভাবে বিস্তারিত হয়ে যায়, যার ফলে তা সার্জারির মাধ্যমে অপসারণ করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে টিউমারের ধরন ও আকারের ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য চিকিৎসা করা হয়। অনেক সময় সার্জারিতে সম্পূর্ণ টিউমার অপসারণ করা যায় না। তাই সার্জারির পরে বাকি অংশ অপসারণের অথবা ধ্বংস করার জন্য রেডিওথেরাপি ব্যবহার করা হয়।

ওষুধ ব্যবহার করে ব্রেন টিউমারের যে চিকিৎসা করা হয় তা কেমোথেরাপি নামে পরিচিত। এই ওষুধগুলো রক্তনালির মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে টিউমার কোষ ধ্বংস করতে সাহায্য করে।