দীর্ঘ সময় ঝিমিয়ে পড়া দেশের শেয়ারবাজার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠছে। বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে সূচকের সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে। গতকাল রবিবার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ১ হাজার ৫২৯ কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। যা ২০২৪ সালের ১১ আগস্টের পর সর্বোচ্চ লেনদেনের রেকর্ড। এর পেছনে গত সপ্তাহে সরকার পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানসহ তিন জন কমিশনার নিয়োগের বিষয়টি কাজ করছে বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা- নির্বাচনের সময় সরকার পুঁজিবাজার বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা যথাযথ বাস্তবায়ন হলে শেয়ারবাজার গতি ফিরে পাবে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকলে দেশের অর্থনীতিতে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠবে বলে মনে করেন বিশ্লেষক ও অংশীজনরা।
জানা গেছে, গত ৪ জুন বিএসইসির চেয়ারম্যান ও তিনজন কমিশনারও নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে, বিএসইসির কমিশনে চার সদস্য থাকলেও একজনের নিয়োগ এখনো হয়নি। চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসুদ খান। আর কমিশনার হিসেবে ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের এমডি নাফিজ-আল-তারিক, আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমান এবং আইনজীবী নাহিদ মাহতাব। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে তাদের নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই চার বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন।
এর আগে ওইদিন সকালে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং চার কমিশনার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
গতকাল রবিবার ছিল বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের পর প্রথম কার্যদিবস। এদিন লেনদেনের শুরু থেকে উল্লম্ফন হওয়ার পাশাপাশি মূল্যসূচকের বড় উত্থানের মধ্যদিয়ে লেনদেন কার্যক্রম শেষ হয়েছে। আলোচ্য সময়ে ডিএসইর এবং অপর শেয়ারবাজার, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) দাম বাড়ার তালিকায় বেশি প্রতিষ্ঠান নাম লেখানোর পাশাপাশি সব সূচকে পয়েন্ট যুক্ত হয়েছে। লেনদেনে ডিএসইতে ১ হাজার ৫২৯ কোটি টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন রেকর্ড তৈরি করেছে। যা ২০২৪ সালের ১১ আগস্টের পর সবচেয়ে বড় লেনদেন।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে নতুন ব্যক্তিদের আগমনকে বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে। যার প্রতিফলন গতকালের লেনদেনে ফুটে উঠেছে। তারা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখতে নতুন নেতৃত্ব শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে দ্রুত কিছু ভালো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ইশতেহারে পুঁজিবাজার সংস্কার ও উন্নয়ন শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধি করে একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারির আওতায় আনা হবে।’ এ লক্ষ্যে সরকার ‘পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটি গঠন করার পাশাপাশি বিগত ১৫ বছরে পুঁজিবাজারে সংঘটিত অনিয়ম তদন্তে একটি বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন করবে। বিএনপি শেয়ারবাজারে অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যস্থা গ্রহণ করবে।’ এছাড়া শেয়ারবাজারের স্বচ্ছতা আনয়ন; কারসাজি বন্ধকরণ; শক্তিশালী বন্ড ও ইক্যুইটি মার্কেট গঠন; করপোরেট বন্ড ও সুকুক ইস্যু করা; প্রবাসীদের জন্য ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে চালুকরণ; পুঁজিবাজারে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিকরণ; পুঁজিবাজারে প্রবেশাধিকার সহজলভ্যকরণ; ‘পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন এবং কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ে ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থা ও পুঁজিবাজার শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বর্তমান সরকার।
গতকালের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪১ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৫১৬ পয়েন্টে অবস্থান করছে। ডিএসইর শরিয়াহভিত্তিক ডিএসইএস সূচক ৬ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১১৫ পয়েন্টে এবং ডিএস৩০ সূচক ১৮ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৮৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। লেনদেন হওয়া অধিকাংশগ্রহণকারী কোম্পানির মধ্যে ১৮৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। দাম কমেছে ১৬০টির এবং অপরিবর্তিত আছে ৪৯টির। ডিএসইতে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫২৯ কোটি ৫ লাখ টাকা।
একই সময়ে সিএসইতে ৫৭ কোটি ২৩ লাখ ৮৩ হাজার টাকার শেয়ার ও ইউনিটের লেনদেন হয়েছে। অংশগ্রহণকারী কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে ১৩৩টির, কমেছে ৮০টির এবং ৩০টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৩১ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৩৯৯ পয়েন্টে, সিএসসিএক্স ৮৩ পয়েন্ট বেড়ে ৯ হাজার ৪৬৫ পয়েন্টে এবং সিএসআই সূচক ৬ পয়েন্ট বেড়ে ৯৪০ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
নতুন কমিশন গঠন ও বাজার পরিস্থিতির বিষয়ে ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংগত কারণেই সরকার নতুন কমিশন গঠন হয়েছে বলে মনে করি। কারণ একটি নির্বাচিত সরকার তার সংস্থা পরিচালনায় পছন্দের যোগ্য ব্যক্তিদের মনোনীত করবে, এটা স্বাভাবিক। তবে নতুন কমিশনের কাছে, বাজার সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা অনেক। আমি মনে করি যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তারা অত্যন্ত বিজ্ঞ এবং যে যার জায়গায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি চর্চা করা মানুষ। আশা করছি, পুঁজিবাজারকে কার্যকর ও সময় উপযোগী এবং গতিশীল বাজারে রূপদানে তারা ভূমিকা রাখবেন। বাজার সংশ্লিষ্টদের গুরুত্ব দিয়ে নতুন কমিশন পূর্বের রাজনৈতিক খবরদারি, দাদাগিরি ও অনিয়ম থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে দেশের অর্থনীতিকে একটি সুন্দর সুশৃঙ্খল পুঁজিবাজার উপহার দেবেন। যা অর্থনীতি ব্যাংক নির্ভরতা থেকে পুঁজিবাজার নির্ভর করে তুলবে।
স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুর ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের প্রত্যাশা হলোÑ একটি কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে ওঠা। আমি মনে করি, পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সবার একটাই প্রত্যাশা, দেশের শেয়ারবাজার পরিস্থিতি যাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও কারসাজিমুক্ত পুঁজি সংগ্রহের উৎস হিসেবে গড়ে ওঠে। বাজারের যে উত্থান লক্ষ করা যাচ্ছে, তা যেন অব্যাহত থাকে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা যাতে দূর হয়।
এদিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেছেন, নবনিযুক্ত কমিশন বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বিগত বছরগুলোতে পুঁজিবাজার প্রবৃদ্ধি ও আশাবাদের অনেক সময় অতিক্রম করেছে। একই সঙ্গে এমন কিছু চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করেছে, ভালো মানের কোম্পানিগুলোকে বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত করেছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমিয়েছে এবং বৃহত্তর অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের অবদানকে সীমিত করেছে। তিনি প্রত্যাশা করছেন, নতুন কমিশন বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন ও অংশীজনদের সহযোগিতায় পুঁজিবাজারের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।