জার্মানি-কুরাসাও ম্যাচে আজ বিশ্বের চোখ

চার বছর পর যে বিশ্বকাপ আসে, তা বড়ই অদ্ভুত। এই মঞ্চে কেউ কাঁদে, আবার কেউ হাসে। তাই তো একে বলা হয়, দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। তিন দিন আগেই তিন দেশে শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। বেশ কটি ম্যাচ ইতিমধ্যে দর্শকরা উপভোগ করেছেন। এই রিপোর্ট যখন পাঠকের হাতে, ততক্ষণে ব্রাজিল ও মরক্কোর ম্যাচও শেষ। তবে সমর্থকদের নজর থাকবে ই-গ্রুপে চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি ও কুরাসাওয়ের ম্যাচের দিকেও, যা হিউস্টনে শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায়। অন্যদিকে বোস্টনে গ্রুপ ‘সি’-তে মুখোমুখি হবে হাইতি ও স্কটল্যান্ড, ভ্যানকুবারে গ্রুপ ‘ডি’-তে লড়বে অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্ক এবং ডালাসে গ্রুপ ‘এফ’-এ অনুষ্ঠিত হবে নেদারল্যান্ডস ও জাপানের আকর্ষণীয় দ্বৈরথ। নকআউট পর্বের পথে এগিয়ে যেতে প্রথম ম্যাচ থেকেই ইতিবাচক ফল পাওয়ার লক্ষ্য থাকবে চার দলেরই।

তবে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে জার্মানি ও কুরাসাওয়ের মধ্যকার ম্যাচে। দুই দলের মধ্যে শক্তির ব্যবধান বেশ বড়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সফল দল জার্মানি গত দুই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার হতাশা কাটিয়ে এবার নতুন করে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। একসময় পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি আলাদা ছিল। দেশ দুটি আলাদাভাবেই বিশ্বকাপে অংশ নিত। ১৯৭৪ সালের গ্রুপ পর্বে পশ্চিমকে ১-০ গোলে হারিয়েছিল পূর্ব জার্মানি। যদিও শেষ পর্যন্ত পশ্চিম জার্মানিই চ্যাম্পিয়ন হয়।

দুই জার্মানি একীভূত হয়েই এখন বিশ্বকাপে খেলে থাকে। এবারের আসরে কোচ জুলিয়ান নাগেলসমানের অধীনে তরুণ ও অভিজ্ঞ ফুটবলারের সমন্বয়ে গড়া জার্মানি দলটি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেই প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে পছন্দ করে। জামাল মুসিয়ালা, কাই হাভার্টজ ও যোশুয়া কিমিখদের ওপর ভরসা করেই মাঠে নামবে জার্মানরা। অন্যদিকে কুরাসাওয়ের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক উপলক্ষ। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে আসা ক্যারিবীয় দেশটি নিজেদের সামর্থ্যরে সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিতে চাইবে। অভিজ্ঞ কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের অধীনে দলটি বাছাইপর্বে দারুণ লড়াই করেছে। অধিনায়ক লিয়ান্দ্রো বাকুনা ও তাহিথ চংয়ের নেতৃত্বে তারা জার্মানদের বিপক্ষে চমক দেখানোর আশা করছে। তবে বাস্তবতা বলছে, ম্যাচটিতে স্পষ্ট ফেভারিট জার্মানি।

গ্রুপ ‘সি’-তে হাইতি ও স্কটল্যান্ডের ম্যাচটি দুই দলের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই গ্রুপে রয়েছে শক্তিশালী ব্রাজিল ও মরক্কো। ফলে শেষ ষোলোতে ওঠার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে এই ম্যাচে পয়েন্ট হারানোর সুযোগ নেই। ১৯৭৪ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলা হাইতি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে চায়। ডাকেন্স নাজঁ ও ফ্রান্টজদি পিয়েরোর মতো খেলোয়াড়রা স্কটিশ রক্ষণকে পরীক্ষায় ফেলতে পারেন। অন্যদিকে ১৯৯৮ সালের পর বিশ্বকাপে ফেরা স্কটল্যান্ড দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার নতুন ইতিহাস গড়তে চায়। স্টিভ ক্লার্কের দলটি সংগঠিত ফুটবল এবং শক্তিশালী মিডফিল্ডের জন্য পরিচিত। স্কট ম্যাকটমিনে ও জন ম্যাকগিনের অভিজ্ঞতা স্কটল্যান্ডকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দেবে। ম্যাচটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও অভিজ্ঞতার বিচারে কিছুটা এগিয়ে স্কটিশরা। বোস্টনে ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায়।

গ্রুপ ‘ডি’-তে অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের লড়াইও হতে যাচ্ছে বেশ উপভোগ্য। টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অস্ট্রেলিয়া গত কয়েক বছরে নিজেদের একটি কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শক্ত রক্ষণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল এবং দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক তাদের প্রধান অস্ত্র। গোলরক্ষক ম্যাথিউ রায়ান এবং তরুণ প্রতিভা নেস্টরি ইরানকুন্দার দিকে নজর থাকবে সমর্থকদের। তবে তুরস্কও দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বকাপ মঞ্চে ফিরে এসেছে দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে। কোচ ভিনচেঞ্জো মন্টেলার অধীনে দলটি আক্রমণভাগে বেশ ধারালো। আর্দা গুলার, হাকান চালহানওগ্লু এবং কেনান ইয়িলদিজদের নিয়ে গড়া আক্রমণভাগ যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য হুমকি হতে পারে। অতীতের দুই দেখায় তুরস্কই জয় পেয়েছিল, যা তাদের বাড়তি মানসিক শক্তি জোগাবে। ভ্যানকুবারে বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টায় শুরু হবে ম্যাচটি।

দিনের অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচটি হতে পারে ডালাসে রাত ২টায়। গ্রুপ ‘এফ’-এ যেখানে লড়বে নেদারল্যান্ডস ও জাপান। ইউরোপের শক্তিশালী দল নেদারল্যান্ডস বিশ্বকাপের শিরোপা না জিতলেও বরাবরই বড় টুর্নামেন্টে অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হয়। রোনাল্ড কোম্যানের দলে ভার্জিল ফন ডাইক, ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং ও মেমফিস ডিপের মতো তারকার উপস্থিতি ডাচদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। অন্যদিকে জাপান গত এক দশকে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। দ্রুতগতির ফুটবল, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং কার্যকর কাউন্টার অ্যাটাক তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাকেফুসা কুবোর সৃজনশীলতা ও আক্রমণভাগের গতি ডাচদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। যদিও অতীত পরিসংখ্যানে নেদারল্যান্ডস এগিয়ে, তবু জাপানকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের এই চার ম্যাচেই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সমীকরণ। জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস কাগজে-কলমে স্পষ্ট ফেভারিট হলেও হাইতি, কুরাসাও, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপান নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণে মরিয়া থাকবে। বিশ্বকাপের মঞ্চে চমকের ইতিহাস নতুন নয়, তাই ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষায় থাকবেন আরেকটি রোমাঞ্চকর দিনের।