দেশকে অস্থিতিশীল করাই বিরোধী দলের উদ্দেশ্য

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ০৪:০০ এএম

করব কাজ, গড়ব দেশ এ প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপির রাজনীতি ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের জন্য। সরকার দেশের ২০ কোটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। গতকাল শনিবার কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালী এলাকায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক পাতলী খালের পুনঃখননকাজের উদ্বোধনকালে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

এ সময় বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘তাদের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়; তাদের উদ্দেশ্য একটাই, সেটি হচ্ছে দেশের মধ্যে অস্থিতিশীতা ও অশান্তি তৈরি করা, মানুষকে বিভ্রান্ত করা।’

বেলা ১১টার দিকে নিজ হাতে মাটি কেটে খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে দেশের জন্য কাজ করব এমন প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছিলাম। আজ সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথেই এগিয়ে যাচ্ছি। পাতলী খাল পুনঃখনন শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি কৃষি, সেচ ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।’ তিনি জানান, খালটি পুনঃখনন হলে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন এবং বছরে প্রায় ১২ হাজার টন কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সদ্য ঘোষিত জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় ৮ থেকে ১০ হাজার কৃষককে কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। এসব কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের আড়াই হাজার টাকা প্রণোদনা দেওয়া হবে।

নারী শিক্ষার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীর শিক্ষার পথ উন্মুক্ত করেছিলেন। আমরা সেই ধারাবাহিকতায় স্নাতক ও ডিগ্রি পর্যন্ত নারীর শিক্ষার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার উদ্যোগ নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, নারীর শিক্ষার প্রসারে উপবৃত্তি কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েরাও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়।

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘গ্রামের সাধারণ মানুষ যাতে সহজে স্বাস্থ্যসেবা পায়, সে জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বল্পমূল্যে ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।’ এ সময় তিনি জানান, হার্টের রিং এবং কিডনি ডায়ালাইসিসে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ ও ওষুধের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। যাতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমে আসে।

দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে বিরোধী দল প্রস্তাবিত বাজেটের বিরোধিতা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এবারের বাজেট দেওয়ার পর এখন পর্যন্ত কোনো পণ্যের দাম বাড়েনি। বরং ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘আপনাদের কাছে আমি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই যেই বাজেটে ট্যাক্স কমানো হয়, সেই বাজেটও বিরোধী দল মানে না। যেই বাজেটে মদের দাম বাড়ানো হয়, যেই বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়, সেই বাজেটও বিরোধী দলের পছন্দ নয়। তাহলে এবার বিরোধী দলের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছেন?’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দেশের মালিক কোনো রাজনৈতিক দল নয়, দেশের মালিক ২০ কোটি জনগণ। তাদের কল্যাণেই সরকারের সব পরিকল্পনা ও কর্মসূচি।’

তিনি বলেন, ‘জনগণের সমর্থনই আমাদের শক্তি। তাই যতক্ষণ আমাদের প্রাণ থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই দেশ এবং এই  দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাব।’

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল মাবুদ। এতে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল।

২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন : বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, এদিন দুপুরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাট সংরক্ষিত বনাঞ্চলে একটি গাছের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে তিনি এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

এ সময় তারেক রহমান বলেন, ‘বছরে অন্তত পাঁচ কোটি গাছ লাগানোর ইচ্ছা আছে। আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, আপনার সন্তান যেন সুন্দর একটা পৃথিবীতে বসবাস করতে পারে; সেটি মাথায় রেখে আজ থেকে প্রত্যেকেই দয়া করে যার যেখানে সম্ভব সবাই অন্তত একটি করে বৃক্ষরোপণ করবেন।’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দূষণমুক্ত নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি এ বৃক্ষরোপণ অভিযানকে সফল করতে পারি, তাহলে এতটুকু ধারণা করতে পারি যে, আগামী দিনে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঠিকভাবে বুকভরে পরিষ্কার শ্বাস নিতে পারবে। আসুন আমরা সবাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিশ্চয়তা দিই একটি পরিষ্কার একটি দূষণমুক্ত পরিবেশ গড়তে পারি, যেখানে আমাদের প্রজন্ম পরিষ্কার পরিবেশে বাস করবে।’

সরকারের ঘোষিত এ কর্মসূচি আগামী পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের পাশাপাশি বনভূমি সম্প্রসারণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে এ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সাফারি পার্কে সস্ত্রীক প্রধানমন্ত্রী : বিকেলের দিকে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক পরিদর্শন করেন। এ সময় তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। সেখানে পৌঁছে সাফারি পার্কের মূল ফটকের সামনে একটি নাগলিঙ্গম গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি সাফারি পার্কের স্মারক বইয়ে স্বাক্ষর করেন। একই সঙ্গে স্মারক বইয়ে স্বাক্ষর করেন ডা. জুবাইদা রহমানও।

ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম।

চালকের আসনে প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী ১২ ঘণ্টার সফরে কক্সবাজার এসেছিলেন। এই অল্প সময়ে নবগঠিত মাতামুহুরি উপজেলাসহ কক্সবাজার সদর, চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় সফর করেন। আর এ চার উপজেলার ১১টি প্রকল্পের উদ্বোধনী স্থলে যেতে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং গাড়ি চালান। এ সময় তার পাশের আসনে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। এ ছাড়া পেছনের আসনে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য হাসিনা আহমদ।

জুলাই শহীদ ওয়াসিমের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্র উপহার : জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় কক্সবাজার সফরের অংশ হিসেবে পেকুয়ায় তিনি শহীদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত করেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

কবর জিয়ারত শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান শহীদ ওয়াসিম আকরামের মা জ্যোৎস্না বেগমের হাতে ২০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র তুলে দেন। এ সময় শহীদ ওয়াসিমের পিতা শফিউল আলমসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যও উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।

পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন।

 বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের মুরাদপুর এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষে নিহত হন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ওয়াসিম শহীদ হন। তিনি কলেজ ছাত্রদলের সদস্য ছিলেন। ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম। ৫ সন্তানের মধ্যে ওয়াসিম ছিল দ্বিতীয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত