তহবিলে ধস বেতনে উৎসব!

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ০৪:০৩ এএম

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেড বিভিন্ন সময় মুনাফা করার কথা বললেও তাদের বিপুল দেনার কথা উল্লেখ করে না। কার্যত লোকসানি এই প্রতিষ্ঠান ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি দেনা রেখে ৯৩৭ কোটি টাকার মুনাফা ঘোষণা করে। এদিকে আয় না বাড়লেও নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যেই হঠাৎ গত মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয় প্রায় ১৮৫ শতাংশ। এমনকি চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহীসহ কয়েকজন বড় কর্তার বেতন কয়েকগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে বছরে ১০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়বে সংস্থাটির। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার বিমানকে লাভজনক করতে না পারলেও প্রায় তিন হাজার ৬শ কোটি টাকার ফান্ড রেখে যায়। গত চার মাসে সেই ফান্ড ১২শ কোটিতে নেমেছে।

এদিকে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেকটা ‘ঢেলে সাজানো’ হয়েছে কর্তাদের চেয়ার। চুক্তি করা হয়েছে ১৪টি বোয়িং কেনার। নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রধান নির্বাহী ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বিমান সংস্থার ক্যাশ রিজার্ভ বা ফান্ড দুই-তৃতীয়াংশ কমে যাওয়া আতঙ্কের লক্ষণ। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা আইকাওর নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো সংকটে অন্তত ৬ মাসের পরিচালন ব্যয় ফান্ডে জমা থাকতে হয়। বর্তমান ফান্ডের যে অবস্থা তাতে বড় কোনো বৈশ্বিক সংকট এলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে বিমানের।

দিন দিন কমছে ফান্ড : বিমান সূত্র জানায়, একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সূত্র হলো আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং লোকসান কমানো, সেখানে বিমান হাঁটছে সম্পূর্ণ উল্টো পথে। একদিকে কমছে ফান্ডের পরিমাণ, অন্যদিকে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা। চার মাস আগে বিমানের নামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৩৬শ কোটি টাকার মতো ফান্ড ছিল। বর্তমানে সেটি ১২শ কোটি টাকায় নেমেছে। নতুন সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করে। চুক্তির সময় ৪শ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। পুরনো ট্যাক্সবাবদ খরচ হয়েছে প্রায় ৪শ কোটি টাকা। দাম বেড়ে যাওয়ায় চার মাসে ফুয়েলের জন্য খরচ হয়েছে ৩শ কোটি টাকার বেশি । বাকি অর্থ বেতনসহ আনুষঙ্গিক কাজে খরচ হয়’।

পে-স্কেল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে বেতন বৃদ্ধি : নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যেই হঠাৎ প্রায় সাড়ে তিন হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা প্রায় ১৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে বিমানের পরিচালনা পর্ষদ। পাশাপাশি খাদ্য ভর্তুকি দ্বিগুণ করাসহ অস্থায়ী কর্মীদের দৈনিক মজুরিও বাড়ানো হয়। তা ছাড়া পে-স্কেল সুবিধা যুক্ত হওয়ার কথাও রয়েছে। গত ২০ মে বলাকার বোর্ডরুমে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২ জুন বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন স্বাক্ষরিত একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়। সভায় ককপিট ক্রু ব্যতীত বিমান, বাংলাদেশ ফ্লাইট ক্যাটারিং সেন্টার (বিএফসিসি) ও বিমান পোলট্রি কমপ্লেক্সের (বিপিসি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতা পুনর্র্নির্ধারণের অনুমোদন দেওয়া হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত নবম জাতীয় বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনে সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়। তখন বেসামরিক কর্মচারীদের পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও বেতন কমিটির প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। তিনটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নের সুপারিশ তৈরির জন্য বিএনপি সরকার গত মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের সময় নবম পে-স্কেল আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ফলে নবম পে-স্কেলের সঙ্গে গত মাসে বর্ধিত বেতন-ভাতাও পাবেন বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

শীর্ষ কর্তাদের বেতন কাঠামো : বিমান আগের চেয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আর শীর্ষ কর্তাদের বেড়েছে কয়েকগুণ। এখানে এমডির বেতন অন্য যেকোনো সংস্থার চেয়ে বেশি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দায়িত্বে থাকা সাবেক এমডি ড. সাফিকুর রহমান প্রথম ছয় মাস আড়াই লাখ টাকা বেতন পান। তবে গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় চাকরিচ্যুত হওয়ার আগপর্যন্ত তিনি ৫ লাখ টাকা বেতন পেয়েছেন। বর্তমান এমডি সবমিলিয়ে ১৪ লাখ টাকা বেতন পাচ্ছেন। তার মধ্যে ট্যাক্সবাবদ চার লাখ টাকা বাদ দিয়ে পাচ্ছেন ১০ লাখ টাকা। উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন ১০ লাখ টাকার মধ্যে ২ লাখ টাকা ট্যাক্স বাবদ কাটা হচ্ছে। আগের চেয়ারম্যান সম্মানী বাবদ পেয়েছেন এক লাখ টাকা, বর্তমান চেয়ারম্যান পাচ্ছেন ১০ লাখ টাকার মতো।

ঊর্ধ্বতনদের বেতন নিয়ে ক্ষোভ : বিমানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিছু কর্মকর্তার সুযোগ-সুবিধা ও বেতন এক লাফেই বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। ধুঁকতে থাকা সংস্থাটির কয়েকজন বড় কর্মকর্তার পেছনে মোটা অংকের ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে খোদ বিমানের ভেতরেই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিমানের প্রশাসনের একাংশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন মহলের অনিয়ম, ফান্ড কমে যাওয়া, ‘হঠাৎ’ বেতন বৃদ্ধির ঘটনাও আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। দীর্ঘদিন ধরেই বিমান লাভের মুখ দেখছে না। অথচ খরচ বাড়ছেই।

অতিরিক্ত ব্যয় বাড়বে প্রায় শত কোটি : এমনিতেই বিমানের আয় কমে এসেছে। এরই মধ্যে বিমানের প্রধান আয়ের খাত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং হাতছাড়া হচ্ছে। এটি পরিচালনা করার কথা জাপানের একটি সংস্থার। এ খাত থেকে বিমানের বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতো। এই বিষয়ে বিমানের এক কর্মকর্তার মতে, কর্মীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ভাতা অপরিবর্তিত থাকার বিষয়টি বিবেচনায় ভাতা পুনর্র্নির্ধারণ যৌক্তিক হতে পারে। তবে একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সেবার মান উন্নয়ন ও আর্থিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় অতিরিক্ত ব্যয় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে বেতন বাবদ ৪২ কোটি টাকা খরচ হয় বিমানের। বেতন বৃদ্ধির ফলে মাসে ব্যয় বাড়বে ৮ কোটি টাকা, যা বছরে গিয়ে ঠেকবে শত কোটিতে। এর সঙ্গে নবম পে-স্কেলের সুবিধা যোগ হলে বিমানের খরচ আরও অনেক বেড়ে যাবে। 

১৪টি নতুন বোয়িং কেনার চুক্তি : ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিমান লোকসানি প্রতিষ্ঠান ছিল। মাঝে মাঝে বিমান মুনাফার কথা জানালেও তাদের বিপুল দেনার কথা উল্লেখ করে না। বিমানের বর্তমানে ২৪টি আন্তর্জাতিক রুট, ৮টি অভ্যন্তরীণ রুট রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক রুট চালু থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তা বন্ধ রয়েছে শর্ত পূরণ করতে না পারায়। জাপানের নারিতা রুট বন্ধ হয়ে গেছে। ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই বিমানকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয় যা সম্পূর্ণভাবে সরকারি মালিকানাধীন। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে ২১০ কোটি ডলারে তিনটি মডেলের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বিমান। উড়োজাহাজগুলো আসতে লেগেছে ১১ বছর। পরে বোয়িংয়ের কাছ থেকে আরও দুটি ড্রিমলাইনার কেনা হয়। এর বাইরে বোম্বার্ডিয়ার ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ আছে পাঁচটি। মাসখানেক আগে নতুন করে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করা হয়।

৬শ কোটি টাকার রাজস্ব হাতছাড়া : এক সময় বিমানের লাভজনক কার্গো পরিবহন রুট ছিল লন্ডন-ঢাকা। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিরা প্রতিবছর এ রুটে বিপুল পরিমাণ কার্গো পরিবহন করেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে সেই বাজার এখন বিদেশি এয়ারলাইনসের দখলে চলে গেছে। এ কারণে ৬শ কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সংস্থাটি। বিমানের নতুন পরিচালনা বোর্ড পুনর্গঠনের পর লন্ডন-ঢাকা রুটের কার্গো পরিবহন হাতছাড়ার তদন্ত শুরু হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা বোর্ডের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমানে পেশাদারিত্বের বিকল্প নেই। কিন্তু সব সরকারই বিমানের বড় পদে ‘নিজেদের’ লোক বসায়। কিন্তু কোনো সরকারের আমলেই বিমান উন্নতি করতে পারেনি। বড় পদগুলোয় অ্যাভিয়েশনের লোকজন না থাকলে কখনো উন্নতি হবে না। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অ্যাভিয়েশনের লোকজনই উড়োজাহাজ প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। বিমানকে রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে। বিমানের রুট কমে এসেছে। তাই উড়োজাহাজ বৃদ্ধির সঙ্গে রুটও বাড়াতে হবে। ফান্ডের টাকা বৃদ্ধি করতেই হবে। দীর্ঘদিন ধরেই বিমানের আয়ের তুলনায় খরচ বেশি। তাই আয় বাড়ানো ছাড়া বিকল্প পথ নেই।

তিনি আরও বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ুক তা চাই। তবে আয় না বাড়িয়ে বেতন বৃদ্ধি করা সমীচীন নয়। একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে বেতন ঠিক করতে হবে। বড় বড় পদে যাকে-তাকে এনে নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে সরকারকে। অন্যথায় আরও ৫০টি উড়োজাহাজ আনলেও বিমানের উন্নতি হবে না।

বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হয় বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা ও প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে। কিন্তু তাদের পাওয়া যায়নি। পরে টেলিফোন করলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সিইও কাইজার সোহেল আহমেদকে একাধিকবার ফোন দিলে তিনিও ফোন রিসিভ করেননি। সংস্থাটির মুখপাত্র ও মহাব্যবস্থাপক বুসরা ইসলামও ফোন রিসিভ করেননি। পরে এই প্রতিবেদক এসএমএস করলে বুসরা ইসলাম জবাব দেন ‘আমি অসুস্থ, বাসায়’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত