মানুষ স্বভাবগতভাবেই আনন্দপ্রিয়। দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা, মানসিক চাপ ও জীবনের নানাবিধ দায়িত্বের মাঝে কিছুটা অবসর, আনন্দ ও খেলাধুলা মানুষের জন্য অপরিহার্য। সুস্থ শরীর, প্রফুল্ল মন এবং কর্মক্ষম জীবন গঠনে খেলাধুলা ও আনন্দের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন মুসলমানের জীবনে খেলাধুলা ও আনন্দের অবস্থান কী? ইসলাম কি এগুলোকে নিরুৎসাহিত করে, নাকি উৎসাহিত করে? যদি উৎসাহিত করে, তাহলে এর সীমারেখা কী? তাই ইসলামের দৃষ্টিতে খেলাধুলা ও আনন্দ-বিনোদনের প্রকৃত অবস্থান জানা জরুরি।
ভারসাম্যের ধর্ম ইসলাম : ইসলাম মানুষের জীবনকে একপেশে করে দেখতে চায় না। এটি এমন কোনো ধর্ম নয়, যা মানুষকে সারাক্ষণ ইবাদতে মগ্ন থাকার নির্দেশ দেয় এবং জীবনের অন্যান্য প্রয়োজনকে অস্বীকার করে। বরং ইসলাম মানুষের দেহ, মন, আত্মা, পরিবার, সমাজসহ সবকিছুর চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে জীবন পরিচালনার শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দ্বারা পরকালের আবাস অনুসন্ধান করো এবং দুনিয়ার অংশও ভুলে যেও না।’ (সুরা কাসাস ৭৭)
এই আয়াত আমাদের শেখায়, ইসলাম দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়। তাই বৈধ বিনোদন ও বিশ্রাম ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ নয়, বরং তা মানুষের স্বাভাবিক জীবনের একটি অংশ।
হালাল বিনোদনের দৃষ্টান্ত : রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতকারী। কিন্তু তার জীবন কেবল কঠোর সাধনায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সেখানে মানবিকতা, হাস্যরস, বিনোদন এবং পারিবারিক আনন্দেরও সুন্দর সমন্বয় ছিল।
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, এক সফরে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। প্রথমবার তিনি জয়ী হন। পরে কিছুদিন পর আরেকবার প্রতিযোগিতা হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) জয়ী হয়ে হাস্যরসের সঙ্গে বলেন, ‘এটি ওই জয়ের প্রতিদান।’ (আবু দাউদ)
একবার ঈদের দিনে কিছু আবিসিনীয় যুবক মসজিদে নববীর পাশে বর্শা খেলার প্রদর্শনী করছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু তা অনুমতি দিয়েছিলেন তাই নয়, বরং আয়েশা (রা.)-কে নিজের কাঁধের আড়াল থেকে তা দেখার সুযোগ দিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি) এসব ঘটনা প্রমাণ করে, ইসলাম আনন্দ ও বিনোদনের সম্পূর্ণ বিরোধী নয়, বরং তা সুশৃঙ্খল ও কল্যাণকর রূপে গ্রহণ করে।
খেলাধুলার গুরুত্ব : খেলাধুলা হলো শরীরচর্চা, আত্মবিশ্বাস, সাহসিকতা এবং সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধিরও একটি কার্যকর উপায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের তুলনায় আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।’ (সহিহ মুসলিম) এই শক্তি কেবল আত্মিক শক্তি নয়, বরং শারীরিক সক্ষমতাও এর অন্তর্ভুক্ত। সুস্থ শরীর ছাড়া ইবাদত, দাওয়াত, সমাজসেবা কিংবা জীবনের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা কঠিন। তাই ইসলাম এমন খেলাধুলাকে উৎসাহিত করে, যা মানুষকে কর্মক্ষম, সাহসী ও সুস্থ করে তোলে। এজন্যই ইসলাম তীরন্দাজি, ঘোড়সওয়ারি, সাঁতার, দৌড় ও শরীরচর্চা ইত্যাতি খেলার প্রতি উৎসাহিত করেছে।
খেলাধুলার বৈধতার শর্ত : ইসলাম খেলাধুলা ও বিনোদনের অনুমতি দিলেও তা কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্তের অধীন। প্রথম শর্ত হলো, ইবাদত ও দায়িত্বে বিঘœ না ঘটানো। যে খেলাধুলা মানুষকে নামাজ, রোজা, কোরআন তেলাওয়াত, পারিবারিক দায়িত্ব বা জীবিকার কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তা বৈধতার সীমা অতিক্রম করে। বর্তমানে অনেক মানুষ খেলা দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে, কিন্তু নামাজের জন্য পাঁচ মিনিট সময় বের করতে পারে না। এটি দ্বীনি উদাসীনতার লক্ষণ।
লেখক : শিক্ষক, মাদ্রাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ