কোনো প্রতিকূলতাই থামাতে পারেনি যার স্বপ্ন

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২ একরের ছোট্ট ক্যাম্পাস থেকে শুরু হয়েছিল এক তরুণের স্বপ্নযাত্রা। চারপাশে ছিল অনিশ্চয়তা, অভাব, উপহাস আর সীমাহীন সংগ্রাম। কিন্তু সেই প্রতিকূলতাকেই শক্তিতে রূপান্তর করে আজ যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফুল ফান্ডেড পিএইচডির অফার পেয়েছেন আবুজায়েদ মাছুম। তার এই অর্জন এখন হাজারো সংগ্রামী শিক্ষার্থীর জন্য অনুপ্রেরণার নাম। রসায়নে স্নাতক সম্পন্ন করা মাছুমের পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই তার বাবা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পরিবারের একমাত্র সন্তান হিসেবে সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। অর্থনৈতিক সংকট এতটাই তীব্র ছিল যে, একসময় পড়াশোনা ছেড়ে গার্মেন্টসে চাকরি নেওয়ার কথাও ভাবতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু তিনি হার মানেননি।

সংসার চালাতে দিনের পর দিন টিউশনি করেছেন। সপ্তাহে সাত দিনই সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ব্যস্ত থেকেছেন শিক্ষার্থীদের পড়াতে। এরপর ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরে আবার রাত ২-৩টা পর্যন্ত গবেষণাপত্র পড়েছেন, নতুন বিষয় শিখেছেন এবং নিজেকে প্রস্তুত করেছেন ভবিষ্যতের জন্য। নিজের পড়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো রুটিন ছিল না। যখনই সময় পেয়েছেন, তখনই রসায়নের বিভিন্ন বিষয় বুঝে পড়ার চেষ্টা করেছেন। সবসময় মুখস্থ করার চেয়ে বিষয়গুলো গভীরভাবে বোঝার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নে তার সিজিপিএ ছিল ৩.২৪। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে এমফিল সম্পন্ন করেন মাছুম। মাস্টার্স শেষ করার পর বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হন তিনি। গবেষণার প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি হয় মূলত বুয়েটে পড়ার সময়। তার আগের বিচরণক্ষেত্র Physical Chemistry  হলেও নিজের আগ্রহের জায়গা ছিল Organic Chemistry| । এই ফিল্ডেই গবেষণার সুযোগ পান বুয়েটে। এই প্রাপ্তিই তার গবেষণার প্রতি ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়। একাডেমিক ফলাফলের দিক থেকে তার ব্যাচেলর পর্যায়ের সিজিপিএ ছিল ৩.২৪, মাস্টার্সে ৩.৭৩ এবং এমফিলে ৩.৬৭। এমফিলের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে। বিদেশে পিএইচডির জন্য আবেদন প্রক্রিয়াটাও ছিল অত্যন্ত কঠিন। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই তিন মাসে প্রায় ৫০০ জন অধ্যাপককে ইমেইল করেন মাছুম। অসংখ্য ই-মেইলের বিপরীতে এসেছে নীরবতা, প্রত্যাখ্যান আর দীর্ঘ অপেক্ষা। তবে প্রতিবার ব্যর্থ হওয়ার পরও তিনি আবার হার না মেনে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য অধ্যাপককে ইমেইল করেছেন।

পিএইচডির জন্য আবেদন ও প্রফেসরদের ইমেইল করার ক্ষেত্রে সময় নির্বাচনকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন আবুজায়েদ মাছুম। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় Fall Session-এ বেশি সংখ্যক পিএইচডি শিক্ষার্থী নেয়। Spring Session-এও ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তবে আসনসংখ্যা ও গবেষণার সুযোগ অপেক্ষাকৃত কম থাকে। এ কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী Fall Semester-কে কেন্দ্র করেই নিজেদের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

সাধারণত Fall Semester  শুরু হয় আগস্টে, তবে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয় আগের বছরের অক্টোবর মাস থেকে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যেই অধিকাংশ প্রফেসর শিক্ষার্থী নির্বাচন সম্পন্ন করেন। তাই এই সময়টিকেই আবেদনকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়।

অবশেষে তার সেই প্রচেষ্টার ফল আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টন, এনজেআইটি, পোর্টল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব ভারমন্ট থেকে ফুল ফান্ডেড পিএইচডির অফার পান তিনি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মাত্র একটি গবেষণা প্রবন্ধ ও ৪২টি সাইটেশন নিয়েই এই অর্জন সম্ভব করেছেন মাছুম। খুব ‘পারফেক্ট’ একাডেমিক প্রোফাইল না

থাকলেও তিনি প্রমাণ করেছেন, সাফল্যের জন্য শুধু সিজিপিএ নয়, প্রয়োজন ধৈর্য, গবেষণার মানসিকতা এবং নিজের ওপর অটুট বিশ্বাস। সবকিছু ঠিক থাকলে খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসে পিএইচডি যাত্রা শুরু করবেন আবুজায়েদ মাছুম। তার গল্প শুধু একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার গল্প। এটি সেসব তরুণদের জন্য এক শক্তিশালী বার্তা, যারা নিজেদের ‘সাধারণ’ ভেবে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিয়েছে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ষষ্ঠ সেমিস্টার, সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়