বাবাঅপ্রকাশিত আবেগের নাম

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০২:১০ এএম

প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বাবা দিবস। এ বছর দিবসটি পালিত হবে ২১ জুন। বাবা, আমাদের জীবনে এক অপ্রকাশিত আবেগের নাম। গোটা জীবন চলে যায় কিন্তু বাবাকে জানানো হয় না তাকে কতটা ভালোবাসি। কঠোরতার মুখোশের আড়ালে থাকা কল্যাণচিন্তক কোমল হৃদয়ের বাবাকে চিনতে ও বুঝতে আমাদের দেরি হয়ে যায়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন বাবাকে নিয়ে তাদের না বলা কথা

না বলা ভালোবাসার নাম বাবা

বাবা আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। ছোটবেলায় যখন বাবার হাত ধরে বেড়ে ওঠার কথা ছিল, তখনই পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য তিনি প্রবাসে পাড়ি জমান। তার অনুপস্থিতিতেই কেটেছে আমার শৈশব, কৈশোর, পড়াশোনা এবং বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি ধাপ। দূরত্ব ছিল, কিন্তু তার ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ কখনো দূরে ছিল না।

বাবা আমার সব স্বপ্ন পূরণের নীরব কারিগর। তিনি আমার সব আবদার পূরণ করেন, প্রতিটি কাজে উৎসাহ দেন এবং ভেঙে পড়ার মুহূর্তে সাহস জোগান। একজন অভিভাবকের পাশাপাশি তিনি আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। অথচ তাকে কখনো বলা হয়নি ‘বাবা, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ না বললেও তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা সব অনুভূতিতে মিশে আছে। একজন বাবার গুরুত্ব শুধু পরিবারের উপার্জনকারী হিসেবে নয়; তিনি সন্তানের সাহস, ভরসা ও পথপ্রদর্শক। বাবা দূরে থাকলেও তার ভালোবাসা, ত্যাগ ও প্রেরণাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমার কাছে না বলা ভালোবাসার এক সুন্দর নাম বাবা!

স্নেহ, মায়া ও দায়িত্বের অতন্দ্র প্রহরী

জীবনের অনেক অনুভূতি সহজে প্রকাশ করা যায়, কিন্তু বাবাকে নিয়ে মনের গভীরে জমে থাকা কথাগুলো বলা হয়ে ওঠে না। আমরা মায়ের স্নেহের কথা সহজে বলি, কিন্তু বাবার নীরব ত্যাগ অনেক সময় অগোচরেই থেকে যায়। বাবা সেই মানুষ, যিনি সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নিজের স্বপ্ন, আরাম ও ইচ্ছাগুলো নিঃশব্দে বিসর্জন দেন। তার কঠোরতা আসলে ভালোবাসারই অন্য এক রূপ। সন্তানের সফলতার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে বাবার অসংখ্য নির্ঘুম রাত, শত দুশ্চিন্তা ও অক্লান্ত পরিশ্রম। বাবার মূল্য তখনই উপলব্ধি করতে পারি যখন বাবা নামের বটবৃক্ষের ছায়া আমাদের ওপর থেকে চলে যায়। লিখতে গিয়ে আজ মনে হচ্ছে, বাবাকে অনেক কথাই বলা হয়নি। বলা হয়নি ‘আব্বু, আপনার ত্যাগের জন্য আমি কৃতজ্ঞ, আপনার কষ্ট আমি বুঝি, আপনাকে অনেক বেশি ভালোবাসি।’ অথচ এই কথাগুলোই একজন বাবার জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বাবা একটি ছায়াঘন বৃক্ষের মতো, যার ছায়ায় সন্তান নিরাপদে বেড়ে ওঠে। আজ বাবাকে বলছি, ‘আব্বু, আপনি আছেন বলেই আমার পথচলা এতটা দৃঢ় ও সুন্দর হয়েছে। আব্বু আপনাকে অনেক ভালোবাসি।’

তোমার ত্যাগেই গড়া আমার আগামী

নীরব ভালোবাসার এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হলো বাবা। ছোটবেলা থেকে সব আবদার পূরণে প্রথম হ্যাঁ-সূচক শব্দটি আসে বাবার কাছ থেকেই। দায়িত্ব পালনের এক মহানায়ক তিনি। বাবারা নিজের জীবন উৎসর্গ করেন পরিবার ও সন্তানদের যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। বছরের পর বছর, সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে যান পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। কখনো কখনো সন্তান বা পরিবারের কেউ যখন বলে, ‘তুমি আগামীর জন্য কিছুই জমা করোনি’, তখন বাবার কাছ থেকে উত্তর আসে, ‘আমার সন্তানেরাই আমার আগামী, তারাই আমার সম্পদ।’ সন্তান হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! বাবা দিবসে পৃথিবীর সব বাবার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা।

তুমি আমার সামনে এগোনোর প্রেরণা

বাবা এমন একজন, যিনি পাশে থাকলে জীবনের সব খারাপ সময়ে অবিশ্বাসে ঘেরা এই পৃথিবীতে নির্ভয়ে সব বাধা পার করা যায়। প্রতিটি সন্তানের কাছেই বাবা একটা বটবৃক্ষের মতো কখনো শত আঘাতের প্রতিরোধক ঢাল, আবার কখনো তিনি একাধারে সন্তানের কাছে আলাদীনের চেরাগের দৈত্য। বাবা তার সন্তানের আবদার মেটাতে কখনো ক্লান্ত হন না। বাবাকে বাইরে থেকে অনেক শক্ত মনে হলেও, ভেতরে সন্তানের প্রতি তার ভালোবাসা যে কতটা স্নিগ্ধ তা কখনো মাপা যায় না। ভালো থাকুক দুনিয়ার সব বাবারা। আমি আমার বাবাকে বলতে চাই ‘পৃথিবীতে এখন আমার বাবা, মা দুটোই তুমি। অনেক ভালোবাসি তোমাকে বাবা। তুমি যেন সুস্থ থাকো, ভালো থাকো এই কামনা করি। আমার মুখের হাসিটা বেঁচে আছে তোমারই জন্য। আমার পৃথিবীটা আজও সুন্দর শুধু তোমার জন্য। বাবা, তুমি আমার সুপার হিরো, আমার সামনে এগোনোর প্রেরণা।’

বাবা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বন্ধু

বাবাকে নিয়ে কখনো কিছু বলা হয়ে ওঠে না। আমরা অনেক সময় বাবাকে ভালোবাসি, সম্মান করি, কিন্তু তা মুখে বলি না। হয়তো বাবার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা এমনই অনুভূতি আছে, প্রকাশ নেই। বাবা তাই অপ্রকাশিত আবেগের নাম। ছোটবেলা বাবার হাত ধরে হাঁটা, স্কুলে যাওয়া, আবদার পূরণ করা, কিংবা কোনো ভুল করলে শাসন করা এসব স্মৃতি আজও মনে পড়ে। তখন হয়তো বুঝিনি, কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে শিখেছি যে, বাবার প্রতিটি শাসনের আড়ালে ছিল গভীর ভালোবাসা। নিজের কষ্ট, ক্লান্তি আর অপূর্ণ ইচ্ছাগুলো লুকিয়ে রেখে তিনি সবসময় চেষ্টা করেছেন আমাদের ভালো রাখতে। জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বাবার পরামর্শ আমাকে সাহস জুগিয়েছে। যখন কোনো কাজে ব্যর্থ হয়েছি, তখন বাবার কথাগুলোই নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে আমাকে। পরিবারের জন্য তার নিরন্তর পরিশ্রমের মূল্য অসীম। বাবা দিবসে শুধু একটি কথাই বলতে চাই ‘বাবা, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তোমার ত্যাগ, ভালোবাসা, আর ছায়ার জন্য আমি সবসময় কৃতজ্ঞ। তুমি ভালো থেকো, সুস্থ থেকো। তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসি।’

গ্রন্থনা : মো. জাহিদ হাসান, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত