যেভাবে খুঁজবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত চাকরি

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০২:১৯ এএম

বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারীর মধ্যে মাত্র প্রায় ৪০ জন প্রাতিষ্ঠানিক চাকরিতে আছে। প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ মানুষ গ্র্যাজুয়েশন পাস করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। ১০৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২২৭৫। প্রায় ৮৪% স্নাতক পাস করা শিক্ষার্থী চাকরি খুঁজতে ইন্টারনেট বা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করেন। লেবার ফোর্স সার্ভে (LFS) অনুযায়ী প্রায় ৯৫% মানুষ প্রাইভেট ও ৫% মানুষ সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত।

আমরা চাকরি খোঁজার ক্ষেত্রে হরদম যেখানে সেখানে যথেচ্ছ ট্রাই করি। দেখুন, অনেকের ভিড়ে আপনাকে চাকরি পেতে হলে এভাবে করলে হবে না। নির্দিষ্ট পথে ও পদ্ধতিতে এগোতে হবে। আপনাকে প্রথমেই বুঝতে হবে, আপনার যোগ্যতা ও সীমাবদ্ধতা। যদি তা না বুঝে চাকরি খোঁজা শুরু করেন, তাহলে খুঁজতে খুঁজতে একপর্যায়ে হতাশ হয়ে পড়বেন আর ভাগ্য বা অন্যকে দোষারোপ করবেন। আপনার ক্যারিয়ার বড় চাকরি বা বড় প্রতিষ্ঠান দিয়েও শুরু হতে পারে, আবার ছোট চাকরি বা ছোট প্রতিষ্ঠান দিয়েও শুরু হতে পারে। ছোট দিয়ে শুরু করলেও হতাশার কিছু নেই। কারণ আপনি যদি আপনার জায়গায় ভালো করেন তাহলে একদিন বড় প্রতিষ্ঠানেও বড় পজিশনে চাকরি পাবেন। তাই শুরুতে আকাশকুসুম স্বপ্নবিলাসী না হয়ে বাস্তবতা বুঝে চাকরি খোঁজা শুরু করুন।

বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে আমরা বেশিরভাগই প্রথমেই টার্গেট করি বহুজাতিক কোম্পানি ও জায়ান্ট কোম্পানির বা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নবম গ্রেডের বা ব্যাংকের অফিসার পদে। বলেন তো, তাহলে কেমন করে সবার চাকরি হবে যেখানে লাখ লাখ বেকার গ্র্যাজুয়েট ঘুরছে চাকরির আশায়? আপনি যদি সরকারি চাকরিই করতে চান তাহলে ২-৩ বছর সরকারি চাকরি বা ব্যাংকে ট্রাই করুন। এর মধ্যে আপনার কাঙ্ক্ষিত চাকরি হলে ভালো, না হলে আর দেরি না করে বেসরকারি চাকরিতে ট্রাই করুন। তবে মনে রাখবেন, বেসরকারি চাকরিতে সদ্য ফ্রেশ গ্র্যাজুয়েট অথবা সমকাজের অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

আপনাকে মাথায় রাখতে হবে, আপনি কোথা থেকে কোন বিষয়ে কী রেজাল্ট নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। সে অনুযায়ী ইন্ডাস্ট্রি ও জব সিলেক্ট করুন। মনে রাখবেন, সাধারণত বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা গ্র্যাজুয়েশন করেছেন তারা চাকরিদাতাদের পছন্দের তালিকায় এগিয়ে থাকেন। এরপর যারা মার্কেট ডিমান্ডিং সাবজেক্ট নিয়ে পড়েছেন তারা আরও এগিয়ে থাকেন। এরপর এ গ্রেডের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাদের গ্র্যাজুয়েশন মার্কেট ডিমান্ডিং সাবজেক্ট নিয়ে, তারা এগিয়ে থাকেন। বহুজাতিক কোম্পানি ও জায়ান্ট কোম্পানিগুলো এদেরকেই অগ্রাধিকার দেন চাকরির ক্ষেত্রে।

নিজেকে প্রস্তুত করুন

আপ-টু-ডেট সিভি (CV) ও রেজ্যুমে : আপনার দক্ষতা ও অর্জনগুলো হাইলাইট করে একটি পেশাদার সিভি তৈরি করুন। মনে রাখবেন, একটি ভালো রেজ্যুমে আপনার ইন্টারভিউ পাওয়ার সম্ভাবনা ৫০% বাড়িয়ে দেয়। সিভিতে আপনার পছন্দের জবের সঙ্গে মানানসই আপনার যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বিবরণ পারলে সংখ্যাতত্ত্বে তুলে ধরুন।

অনলাইন প্রোফাইল : খরহশবফওহ প্রোফাইলটি সুন্দরভাবে সাজান। পেশাদার ছবি ব্যবহার করুন এবং আপনার অর্জিত অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বিবরণ দিন। লিংকডইনে স্টার প্রোফাইল তৈরি করে পছন্দের চাকরি অনুযায়ী জব এজেন্ট নির্ধারণ করুন।

দক্ষতা বৃদ্ধি : আপনি যে ধরনের চাকরি চাচ্ছেন, সেই পজিশনের জন্য বর্তমানে কোন কোন দক্ষতার চাহিদা আছে তা জানুন এবং প্রয়োজনে অনলাইন কোর্স (যেমন : Coursera, Udemy) করুন। বিভিন্ন পেশাদার সিম্ফোজিয়াম, সেমিনার ও প্রশিক্ষণে অংশ নিন।

সঠিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করুন

জব পোর্টাল : বাংলাদেশে Bdjobs, Chakri.com, Prothom Alo Jobs, Niyog.com, Bikroy.com (Jobs), atB Jobs  বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে LinkedIn Jobs  এবং Indeed  নিয়মিত চেক করুন। সরকারি চাকরি খোঁজার জন্য All Jobs (Teletalk), Bd Govt Job, chakriroffer.com  প্রভৃতি সাইটে নিজের প্রোফাইল তৈরি করে নিয়মিত এই সাইটগুলোতে চোখ রাখুন।

কোম্পানি ওয়েবসাইট : আপনার পছন্দের কোম্পানির নিজস্ব ওয়েবসাইটের ‘Career’ সেকশনে নজর রাখুন। তাদের প্রতিষ্ঠানের ক্যারিয়ার মেইলে আপনার জব

অ্যাপ্লিকেশনসহ সিভি পাঠিয়ে রাখুন এমনকি জব ওপেন না থাকলেও।

এইচআর বিভাগ : বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এইচআর বিভাগের প্রধানের কাছে বা বিভাগে আপনার সিভি ইমেইল করে আপনি কি জাতীয় ফাংশনে কাজ করতে চান জানিয়ে রাখুন।

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান : বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ক্যারিয়ার পেজে সাইন আপ করে প্রোফাইল আপডেট করে রাখুন। তাহলে ওখানে কোনো জব ওপেন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনি ইমেইলে নোটিফিকেশন পাবেন।

লিংকডইন ও সোশ্যাল মিডিয়া : এখানে আপনার স্টার প্রোফাইল তৈরি করে আপনার পছন্দের চাকরির সঙ্গে ম্যাচ করে এমন #jobAlert  সেট করুন, যাতে ওই জাতীয় কোনো জব বিজ্ঞপ্তি আসার সঙ্গে সঙ্গে আপনি জানতে পারেন। লিংকডইনে এইচআর বা সিনিয়র পদে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করে তাদের ইনবক্সে আপনার যোগ্যতা অনুযায়ী যেজব করতে চান তা জানান। ফেসবুকের বিভিন্ন প্রফেশনাল গ্রুপ এবং লিংকডইনের হ্যাশট্যাগ #Hiring  অনুসরণ করুন।

পারসোনাল নেটওয়ার্কিং : সাবেক সহকর্মী, প্রফেশনাল বন্ধু ও বড় ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানিয়ে রাখুন আপনি কোন সেক্টরে কোন ফাংশনে চাকরি খুঁজছেন।

ইভেন্ট ও সেমিনার : জব ফেয়ার বা ক্যারিয়ার বিষয়ক সেমিনারে অংশ নিন। নিজের প্রফেশনাল নেটওয়ার্ক তৈরি করুন। কী জবে কী দক্ষতা লাগবে সেটা জেনে নিন। এসব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের কাছে চাকরির খোঁজ করুন।

হেড হান্টিং কোম্পানি : ইন্ডাস্ট্রিতে বহু প্রতিষ্ঠান আছে, যারা জব প্লেসমেন্ট নিয়ে কাজ করে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন নিয়মিত এবং আপনার আপডেট সিভি তাদের কাছে দিয়ে রাখুন।

রেফারেল : অনেক কোম্পানিতে সরাসরি আবেদনের চেয়ে রেফারেলের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া সহজ হয়। সেসব কোম্পানিতে কর্মরত প্রফেশনালদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চাকরির পাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করুন।

প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিং বৃদ্ধি করুন

ইন্ডাস্ট্রি লিডার : আপনার সেক্টরের সফল ব্যক্তিদের অনুসরণ করুন এবং তাদের পোস্টে গঠনমূলক মন্তব্য করুন।

অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক : আপনার বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের বড় ভাইবোনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। তারা সাধারণত জুনিয়রদের সাহায্য করতে পছন্দ করেন।

প্রফেশনাল নেটওয়ার্ক : পরিচিত কারও মাধ্যমে নতুন কারও সঙ্গে পরিচিত হওয়া (Mutual Connection) নেটওয়ার্ক বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ উপায়। আপনার নেটওয়ার্কের মানুষের সাফল্যে অভিনন্দন জানান এবং তাদের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ান, তাদের কাজে ভ্যালু অ্যাড করুন।

যেভাবে অ্যাপ্লাই করবেন ইন্টারভিউ কল পাওয়ার জন্য

কেন পুরনো চাকরি ছেড়ে নতুন চাকরিতে যোগ দিতে চান তা ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। এরপর কোনো ওয়ার্ক ফাংশনের সঙ্গে আপনার অভিজ্ঞতা ম্যাচ করে তার তালিকা করুন।

তারপর সিলেক্ট করুন আপনি কোন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে চান (যেমন এফএমসিজি, আরএমজি, টেলকো প্রভৃতি)। যে ধরনের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চান সে ধরনের ১০-১৫টি কোম্পানির নামের তালিকা করুন।

এরপর সেই অনুযায়ী তাদের ওয়েবসাইট, ক্যারিয়ার পেজ অথবা জবসাইটে ওপেনিং দেখে জবের অ্যাপ্লাই শুরু করুন। ওইসব প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র পজিশনে কে আছেন তা লিংকডইনে বা কারও মাধ্যমে খুঁজে বের করে কানেক্ট করুন।

করপোরেট ও লিংকডইন কমিউনিকেশন ডেভেলপ ও পরিচর্যা করুন। লিংকডইনে অতি স্বল্প বা অপরিচিত কাউকে হঠাৎ করে ইনবক্সে সিভি দিয়ে চাকরি না চাওয়াই ভালো।

আপনার বর্তমান অভিজ্ঞতা ও ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে ম্যাচ করে শুধু এমন জবে অ্যাপ্লাই করবেন। চাকরির বিজ্ঞাপনে উল্লিখিত জব রিকুয়ারমেন্ট ম্যাক্সিমাম ম্যাচ করলেই শুধু সেই জবে অ্যাপ্লাই করবেন। জব, মার্কেট ও প্রোডাক্ট নলেজ সম্পর্কে আপডেট থাকুন।

আপনার বিগত ও বর্তমান চাকরির অ্যাচিভমেন্ট সংখ্যাতত্ত্বে সিভির শুরুর দিকে উল্লেখ করুন। কোন জাতীয় প্রোডাক্ট/সার্ভিস এবং কোন লোকেশনে কাজ করেন/ করছেন তা সিভিতে উল্লেখ করুন। উল্লেখযোগ্য কোনো অ্যাচিভমেন্ট বা অ্যাওয়ার্ড পেয়ে থাকলে তা সিভিতে হাইলাইট করুন। ইমেইলে সিভি পাঠালে অবশ্যই মেইলের বডিতে আপনার ক্যারিয়ার ও অ্যাডুকেশন হাইলাইট করে লিখুন।

আপনি যে প্রফেশনে আছেন, সেই প্রফেশনের কোনো অ্যাসোসিয়েশনে থাকলে সেখানে যোগ দিন। এইচআর প্রফেশনালদের সঙ্গে কানেক্টটেড হয়ে যোগাযোগ রাখুন। ই-মেইলে বা কুরিয়ারে জব অ্যাপ্লাই করলে এটেনশন ভালো পাওয়া যায়।

প্রফেশনাল কি (key) পিপলদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। অ্যাপ্লাই করার আগে ও পরে, যে জবে অ্যাপ্লাই করেছেন বা করবেন তার কন্সারনড পারসনকে খুঁজে বের করে তাকে জানানোর চেষ্টা করুন যে, আপনি অ্যাপ্লাই করেছেন। এভাবে ইন্টার্ভিউ দেওয়ার জন্য কল পাওয়া নিশ্চিত করুন।

প্রতিদিন কিছু সময় (যেমন ১ ঘণ্টা) শুধু চাকরির খোঁজ ও আবেদনের জন্য বরাদ্দ রাখুন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত