মানুষের জীবনে শান্তির অনুসন্ধান চিরন্তন। পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ সুখ, স্বস্তি ও প্রশান্তির খোঁজে ছুটে চলেছে। কেউ সম্পদের মধ্যে শান্তি খোঁজে, কেউ ক্ষমতার মধ্যে, কেউ খ্যাতির মধ্যে, আবার কেউ সম্পর্কের উষ্ণতায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব অর্জনের পরও মানুষের হৃদয়ে অস্থিরতা, শূন্যতা ও উদ্বেগ রয়ে যায়। কারণ মানুষের হৃদয় এমন এক সত্তা, যার প্রকৃত প্রশান্তি বস্তুগত অর্জনে নয়, বরং তার স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত। তাই মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘যারা ইমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের হৃদয় প্রশান্ত হয়, জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই হৃদয়সমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ ২৮)
এই আয়াত মানুষের অন্তর্জগতের এক গভীর সত্য উন্মোচন করে। মহান আল্লাহ মানুষের স্রষ্টা। তিনি মানুষের মনের গঠন, আবেগ, ভয়, আশা ও চাহিদা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন। তাই মানুষের হৃদয়ের প্রকৃত চিকিৎসাও তিনিই জানেন। পৃথিবীর কোনো বস্তু, ব্যক্তি কিংবা অর্জন মানুষের অন্তরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না, যদি সেখানে মহান আল্লাহর স্মরণ না থাকে।
মহান আল্লাহর জিকির বা স্মরণ শুধু মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণের নাম নয়। এটি এমন এক অবস্থা, যখন মানুষের হৃদয় তার রবের প্রতি সচেতন থাকে। সে জানে, মহান আল্লাহ তাকে দেখছেন, শুনছেন এবং তার সব অবস্থার খবর রাখছেন। এই উপলব্ধি মানুষের অন্তরে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করে। তখন জীবনের কঠিন পরীক্ষাও তাকে ভেঙে ফেলতে পারে না।
বর্তমান যুগে উদ্বেগ, হতাশা ও মানসিক অস্থিরতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রযুক্তির উন্নতি মানুষকে অনেক সুবিধা দিলেও হৃদয়ের শান্তি দিতে পারেনি। বরং মানুষের ব্যস্ততা, প্রতিযোগিতা ও ভোগবাদী মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোরআনের এই নির্দেশনা আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। যখন একজন মানুষ নামাজে দাঁড়ায়, কোরআন তেলাওয়াত করে, তাসবিহ পাঠ করে অথবা নির্জনে বসে মহান আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন তার হৃদয়ে এক বিশেষ প্রশান্তি নেমে আসে। কারণ সে তখন দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী বিষয় থেকে নিজেকে সরিয়ে চিরস্থায়ী শক্তির উৎসের সঙ্গে সংযুক্ত হয়।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর স্মরণকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি হিসেবে সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালককে স্মরণ করে এবং যে ব্যক্তি স্মরণ করে না, তাদের উদাহরণ জীবিত ও মৃত ব্যক্তির মতো।’ (সহিহ বুখারি) এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মহান আল্লাহর স্মরণে হৃদয় জীবন্ত থাকে। জিকিরবিহীন হৃদয় ধীরে ধীরে কঠিন ও নির্জীব হয়ে যায়।
মহান আল্লাহর স্মরণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন কোনো বিপদ আসে, তখন একজন মুমিন জানে যে, সবকিছু মহান আল্লাহর ইচ্ছাতেই ঘটে। তাই সে হতাশ না হয়ে ধৈর্যের আশ্রয় নেয়। মহান আল্লাহর প্রতি ভরসা তাকে শক্তি জোগায়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক ৩)
জিকির মানুষের চরিত্রকেও সুন্দর করে তোলে। যে ব্যক্তি নিয়মিত মহান আল্লাহকে স্মরণ করে, সে পাপ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে। তার অন্তরে আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয়, যা তাকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে। ফলে তার ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন এবং সামাজিক আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
মহান আল্লাহর স্মরণের অন্যতম মাধ্যম হলো নামাজ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমার স্মরণের জন্য নামাজ আদায় করো।’ (সুরা তাহা ১৪) নামাজ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে দৃঢ় করে। দিনে পাঁচবার সে তার রবের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে এবং সাহায্য প্রার্থনা করে। এই সম্পর্কই তাকে মানসিক শক্তি ও প্রশান্তি দেয়।
এ ছাড়া কোরআন তেলাওয়াতও হৃদয়ের প্রশান্তির একটি বড় উৎস। কোরআন শুধু একটি ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি মানুষের জন্য হেদায়েত, রহমত ও অন্তরের আরোগ্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি কোরআন নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত। কিন্তু তা জালেমদের ক্ষতিই বাড়িয়ে দেয়।’ (সুরা ইসরা ৮২)
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক