মহিয়সী নারী উম্মে সালামা (রা.)

আপডেট : ১৬ জুন ২০২৬, ০৬:৪৫ এএম

ইসলামের ইতিহাসে যেসব মহীয়সী নারী রয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম উম্মে সালামা (রা.)। তার প্রকৃত নাম হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের একজন সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত নারী। সৌন্দর্য, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতার সমন্বয়ে তিনি ছিলেন সমসাময়িক নারীদের মধ্যে বিশেষভাবে স্বীকৃত। তার পিতা আবু উমাইয়া ছিলেন মক্কার অন্যতম উদার ব্যক্তি।

ইসলামের সূচনালগ্নেই উম্মে সালামা (রা.) সত্যের আহ্বানে সাড়া দেন। তার স্বামী আবু সালামা (রা.)-ও ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের সাহসী মুসলমানদের একজন। নবীজি (সা.)-এর গোপন দাওয়াতের সময়ই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। এই দম্পতি ইসলামের প্রথম সারির সেই সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত, যারা সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ইমানের পথে অবিচল ছিলেন।

যখন মক্কার কাফেররা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন শুরু করল, তখন নবীজি (সা.) সাহাবিদের একটি দলকে আবিসিনিয়ায় হিজরতের অনুমতি দেন। উম্মে সালামা (রা.) ও তার স্বামীও সেই দলের সদস্য ছিলেন। এই হিজরতকে ইসলামের বিশ্বজনীন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আবিসিনিয়ায় কাটানো দিনগুলো ছিল তাদের জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়। সেখানে তাদের প্রথম সন্তান সালামার জন্ম হয়। কয়েক বছর পর তারা মক্কায় ফিরে আসেন, যেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে থেকে ইসলামের দাওয়াতি কাজে অংশ নিতে পারেন। কিন্তু মক্কার পরিস্থিতি তখন আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নির্যাতন, উপহাস ও ষড়যন্ত্র ক্রমেই বাড়তে থাকে। তাই মুসলমানরা মদিনায় হিজরত করেন। উম্মে সালামা (রা.) ও তার স্বামীও সেখানে হিজরত করেন। এর কিছুদিন পর তার স্বামী আবু সালামা (রা.) ইন্তেকাল করেন।

এই মৃত্যু উম্মে সালামা (রা.)-কে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। তিনি স্বামীকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। স্বামীর অনুপস্থিতি তার হৃদয়কে শূন্য করে দিয়েছিল। তবে এই কঠিন সময়েও তিনি নববী শিক্ষার আলো আঁকড়ে ধরেছিলেন। তার স্বামী তাকে একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস শুনিয়েছিলেন। সেখানে বলা হয়েছিল, কোনো মুসলমান বিপদে পড়লে যদি বলে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ এবং আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান কামনা করে, তাহলে আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন। (সহিহ মুসলিম)

উম্মে সালামা (রা.) নিয়মিত এই দোয়া পড়তেন। কিন্তু তার মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেত, আবু সালামার চেয়ে উত্তম মানুষ আর কে হতে পারে? তার কাছে তো স্বামীই ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন। ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তার কাছে একাধিক বিয়ের প্রস্তাব আসে। আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.)-এর মতো বিশিষ্ট সাহাবিরাও তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি বিনয়ের সঙ্গে সব প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।

এরপর এমন একটি প্রস্তাব এলো, যা তার কল্পনাতেও ছিল না। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই তাকে বিয়ের আগ্রহ প্রকাশ করলেন। উম্মে সালামা (রা.) সম্মানিত বোধ করলেও নিজের কিছু সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, তার মধ্যে ঈর্ষাপ্রবণতা রয়েছে, নবীজির অন্য স্ত্রীদের উপস্থিতিতে ঈর্ষাপ্রবণতা কাজ করতে পারে। বয়সও বেড়েছে এবং তার অনেক সন্তান রয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত স্নেহপূর্ণ উত্তর দিলেন। তিনি বললেন, তার ঈর্ষাভাব দূর করার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। বয়স কোনো সমস্যা নয়, কারণ তিনি নিজেও বয়সে বড়। আর সন্তানদের ব্যাপারে বললেন, আল্লাহ ও তার রাসুল তাদের দেখভাল করবেন। (সুনানে আবু দাউদ)

এভাবেই সম্পন্ন হয় বরকতময় এই বিয়ে। তখন উম্মে সালামা (রা.) উপলব্ধি করেন, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি কখনো ব্যর্থ হয় না। তিনি যে দোয়া পড়েছিলেন, তার বাস্তব প্রতিফলন তিনি নিজের জীবনেই দেখলেন। প্রিয় স্বামীর বিচ্ছেদের বেদনা তাকে কাঁদিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তার জন্য এমন এক মর্যাদা নির্ধারণ করেছিলেন, যা কোনো মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। তিনি হয়ে ওঠেন মুমিনদের মা এবং ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত