বেনজীরকে ধরিয়ে দেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু!

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে বিমানবন্দর থেকে ধরা হয়নি। তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সহায়তায় শপিংমল থেকে গ্রেপ্তার করে দুবাই পুলিশ। তার বন্ধুর সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল দুবাই পুলিশের। ওই বন্ধু একজন আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক নেতা। তিনি বর্তমানে দ্বুাইয়ে অবস্থান করছেন। বেনজীরকে ‘ট্র্যাপে’ ফেলে বাসা থেকে ডেকে একটি শপিংমলে নিয়ে যান বন্ধু। সেখানে কপিশপে আড্ডার সময় পুলিশ এসে বেনজীরকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের সঙ্গে বেনজীরের কথা বলার একপর্যায়ে তার বন্ধু সটকে পড়েন। পরে তাকে দুবাই পুলিশ সদর দপ্তরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বেনজীর নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও ইন্টারপোলের রেড নোটিসের বিষয়টি সামনে আনা হয়।

গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিটের এক কর্মকর্তা দুবাইয়ে বেনজীরের এক আত্মীয়ের কাছ থেকে এ তথ্য পেয়েছেন বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, ‘প্রথম দিন দুবাই পুলিশ বলেছিল বাসা থেকে তাকে ইন্টারপোল ধরেছে। তবে বিমানবন্দর থেকে ধরা হয়নি তা আমরা নিশ্চিত হয়েছি। তাকে শপিংমল থেকে ধরা হয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি পরিবারসহ দুবাইয়ের পাশে আরেকটি শহরের ফ্ল্যাটে বসবাস করে আসছেন।’

এদিকে গতকাল সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলমান আছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি, পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া চলমান। এটি বাংলাদেশ পুলিশের সাম্প্রতিককালের ইতিহাসে অন্যতম সাফল্য।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তা বলেন, মূলত বেনজীর আহমেদ ৮ জুন ধরা পড়েন। প্রকাশ পায় ১২ জুন। দুবাইয়ের ইন্টারপোল মেইল করে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে। প্রথমে আমরা আইজিপি আলী হোসেন ফকিরকে অবহিত করি। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে জানান। তারা প্রধানমন্ত্রীকে জানান। পরে আমরা দুবাইয়ে যোগাযোগ করি। এমনকি সাবেক আইজিপির এক আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তিনি আমাদের জানান, ৮ জুন সকালের দিকে চট্টগ্রামের এক বন্ধু তাকে ফোন দিয়ে ডেকে নেন। দুবাইয়ের পাশেই আজমান শহরে তিনি বসবাস করেন। ওই শহরের একটি শপিংমলে যাওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই স্থানীয় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ওই বন্ধু আওয়ামী লীগবিরোধী একজন রাজনৈতিক নেতা। তিনিই মূলত ‘ট্র্যাপে’ ফেলে তাকে ধরিয়ে দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের আমলে বেনজীর আহমেদ তার বন্ধুকে সব ধরনের সহায়তা করেছিলেন বলে ওই আত্মীয় জানিয়েছেন। বন্ধুর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা থাকলেও কখনো পুলিশ হয়রানি করেনি। তাকে খুব বিশ্বাস করতেন বেনজীর। বেনজীরকে গ্রেপ্তার করে দুবাইয়ে আল-টাওয়ার এলাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই দেশের পুলিশ জানতে পারে, তার বিরুদ্ধে সেখানে কোনো মামলা নেই। কিন্তু বাংলাদেশ পুলিশ কর্তৃক জারি করা ইন্টারপোলে জমা দেওয়া রেড নোটিসটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেনজীরের বন্ধুই পুলিশের কাছে দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করান। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সব ধরনের নথি প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা।

জানা গেছে, বেনজীর আহমেদ একসময় বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ পদে আসীন ছিলেন এবং খুবই প্রভাবশালী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুদকে অনুসন্ধান শুরু হলে এক অভাবনীয় চিত্র দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হয়। গোপালগঞ্জে সাভানা ইকো রিসোর্ট, রূপগঞ্জে শত শত বিঘা জমি, সেন্টমার্টিনে জায়গা, ঢাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাবে শতকোটি টাকার সন্ধান পায় দুদক। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেয়। পরে তিনি সপরিবারে দেশত্যাগ করেন।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, বেনজীরের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ১৭টি, দুদকে ৬টি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) ৩টি পরোয়ানা রয়েছে। তা ছাড়া দুদকের ৬টি মামলার মধ্যে একটিতে পরোয়ানা জারি হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের অভিযোগগুলোর মধ্যে গুম কমিশনের অভিযোগ শাপলা চত্বরে গণহত্যাসহ সারা দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তবে তাকে দেশে ফেরাতে যে প্রত্যর্পণের প্রস্তাব দুবাইয়ে পাঠানো হবে, সেখানে শুধু দুদকের করা দুর্নীতি ও জালিয়াতির নথিপত্র পাঠানো হবে। সঙ্গে দুদকের যে মামলায় পরোয়ানা জারি হয়েছে সেটি যুক্ত করা হবে। ইতিমধ্যে পরোয়ানার কপি আরবিতে ট্রান্সলেট করা হয়েছে। মামলার নথিগুলো প্রস্তুত হলে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাজনৈতিক অধিশাখায় পাঠানো হবে। তারা যাচাই-বাছাই করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। সেখান থেকে দুবাইয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবের চিঠি পাঠানো হবে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠাতে হবে, যা দ্রুতই পাঠানো হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই উল্লেখ করলে সচিব বলেন, চুক্তি নেই, তবে আমরা পারস্পরিক আইনি সহায়তার (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট-এমএলএআর) মাধ্যমে কার্যক্রম এগিয়ে নেব। এ প্রক্রিয়া দুই দেশের সরকার ও তদন্ত সংস্থা একে অপরের সঙ্গে তথ্য, প্রমাণ ও পলাতক আসামির প্রত্যর্পণসংক্রান্ত আইনি সহায়তা প্রদান করে থাকে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, বেনজীরকে ফেরাতে এখন পুলিশের তেমন কোনো কাজ নেই। এনসিবি শাখা থেকে রেড নোটিস জারির পরই আমাদের কাজ শেষ। এখন দুদক নথিপত্র প্রস্তুত করবে। বাকিটা স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখবে।