বিশ্বসংগীতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস আরও বৈচিত্র্যময় ও বৈশ্বিক হয়ে উঠতে নতুন পাঁচটি বিভাগ চালুর ঘোষণা দিয়েছে। আগামী বছর থেকে পুরস্কারের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে সেরা এশিয়ান পপ মিউজিক পারফরম্যান্স এবং সেরা লাতিন গান বিভাগ। সংগীতের বৈশ্বিক বিস্তার এবং ইংরেজি-বহির্ভূত ভাষার গানের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে স্বীকৃতি দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে লাতিন সংগীত ও কে-পপের অভূতপূর্ব সাফল্যের পরই এ ঘোষণা দেয়া হয়। আয়োজকদের মতে, বর্তমান সংগীত জগতের বাস্তবতা এবং শ্রোতাদের রুচির পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করতেই নতুন বিভাগগুলো চালু করা হচ্ছে।
এ বছরের গ্র্যামি আসরে ইতিহাস গড়েন পুয়ের্তো রিকোর জনপ্রিয় শিল্পী ব্যাড বানি। তিনি প্রথম স্প্যানিশ ভাষার অ্যালবাম নিয়ে ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জিতে নজির স্থাপন করেন। শুধু তাই নয়, তিনি ‘বেস্ট মুসিকা উরবানা অ্যালবাম’ এবং ‘বেস্ট গ্লোবাল মিউজিক পারফরম্যান্স’ বিভাগেও পুরস্কার অর্জন করেন। তার এই সাফল্য বিশ্বসংগীতে লাতিন ধারার ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
অন্যদিকে কে-পপও এ বছর নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। অ্যানিমেটেড সিনেমারর গান ‘বেস্ট সং রিটেন ফর ভিজ্যুয়াল মিডিয়া’ বিভাগে জয়ী হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে। এটি প্রমাণ করে যে এশিয়ান পপ সংগীত এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক মূলধারার অংশ হয়ে উঠেছে।
গ্র্যামির আয়োজক প্রতিষ্ঠান রেকর্ডিং একাডেমি জানিয়েছে, নতুন সেরা লাতিন গান বিভাগে অংশগ্রহণকারী গানগুলো প্রধানত স্প্যানিশ ভাষায় পরিবেশিত হতে হবে। অন্যদিকে সেরা এশিয়ান পপ মিউজিক পারফরম্যান্স বিভাগে কে-পপ, জে-পপ, সি-পপসহ এশিয়ার বিভিন্ন জনপ্রিয় পপধারার গান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর ফলে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, চীনসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিল্পীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বেশি স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
রেকর্ডিং একাডেমির প্রধান নির্বাহী হার্ভে মেসন জুনিয়র বলেছেন, সংগীত সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের চাহিদার ভিত্তিতেই এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে। তার মতে, বর্তমান সময়ের সংগীতজগৎ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বৈচিত্র্যময়। তাই পুরস্কার ব্যবস্থাকেও সেই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের সংগীত সম্প্রদায় উদীয়মান এবং বৈচিত্র্যময় ধারার সংগীতকে উদযাপনের আরও সুযোগ চেয়েছে। সেই অনুরোধের প্রতিফলন হিসেবেই নতুন বিভাগগুলো চালু করা হচ্ছে।’
শুধু নতুন বিভাগই নয়, রেকর্ডিং একাডেমি তাদের সদস্য কাঠামোতেও পরিবর্তন এনেছে। গত বছর তারা ভোটার সদস্যদের তালিকায় লাতিন আমেরিকা ও এশিয়ার আরও বেশি শিল্পী, প্রযোজক এবং সংগীতসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্প্রসারণই গ্র্যামিতে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পথ তৈরি করেছে। এছাড়া ‘বেস্ট নিউ আর্টিস্ট’ বা সেরা নতুন শিল্পী বিভাগের নিয়মেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে কোনো শিল্পী সর্বোচ্চ তিনবার এই বিভাগে বিবেচিত হতে পারতেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন চারবার পর্যন্ত মনোনয়নের জন্য আবেদন করা যাবে। এতে উদীয়মান শিল্পীরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আরও একটি অতিরিক্ত সুযোগ পাবেন।
সংগীত শিল্পের পর্যবেক্ষকদের মতে, গ্র্যামির এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক সংগীত অঙ্গনের পরিবর্তিত বাস্তবতাকে স্বীকার করারই প্রতিফলন। গত এক দশকে কে-পপ, লাতিন পপ, আফ্রোবিটস এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ধারার গান আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ফলে শুধু ইংরেজি ভাষার সংগীত নয়, বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির গানও এখন বিশ্ববাজারে সমানভাবে প্রতিযোগিতা করছে।
নতুন বিভাগ যুক্ত হওয়ার ফলে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীরা নিজেদের কাজের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার আরও বড় সুযোগ পাবেন। সংগীতপ্রেমীদের কাছেও এটি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও ভাষার সংগীতকে উদযাপনের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।