বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চে দর্শনভিত্তিক রচনাকে নাট্যরূপ দেওয়ার উদাহরণ খুব বেশি নেই। সেই বিবেচনায় নাট্যকেন্দ্র প্রযোজিত তীর্থযাত্রী ব্যতিক্রমী ও সাহসী প্রয়াস। হুমায়ুন কবিরের দর্শনাশ্রয়ী রচনা ‘তীর্থযাত্রী তিনজন তার্কিক’ অবলম্বনে নির্মিত এই নাটকের মঞ্চরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন তৌকীর আহমেদ। কঠিন দার্শনিক ভাবনাকে নাট্যভাষায় রূপান্তর করা যেমন দুরূহ, তেমনি সেই ভাবনাকে দর্শকের জন্য উপভোগ্য করে তোলাও বড় চ্যালেঞ্জ। তীর্থযাত্রী সেই চ্যালেঞ্জে সফল প্রযোজনা।
নাটকের কেন্দ্রে আছেন তিনজন তীর্থযাত্রী, যারা জ্ঞান ও সত্যের অনুসন্ধানে পথে বের হয়েছেন। তাদের যাত্রা কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে নয়, বরং বলা যায় প্রশ্ন, তর্ক, অভিজ্ঞতা ও আত্মান্বেষণের মধ্য দিয়ে সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর এক অন্তর্যাত্রা। দর্শককে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয় না, প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ফলে মঞ্চে যে তিনজন তীর্থযাত্রীর যাত্রা চলতে থাকে, তেমনি দর্শকও অজান্তেই সেই অনুসন্ধানের অংশ হয়ে ওঠেন।
নাটকটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর বহুস্তরীয় নির্মাণ। নাটকের এক স্তরে এটি সরল গল্পের মতো এগিয়ে যায়, অন্য স্তরে মানবজীবনের নানা অভিজ্ঞতা, সংকট ও উপলব্ধি হয়ে উঠে আসে। আর গভীরতম স্তরে উপস্থিত হয় দর্শন—যা মানুষকে নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এই বহুমাত্রিকতা নাটকটিকে শুধু বিনোদনের গ-িতে আবদ্ধ রাখেনি, দর্শকের মনে গভীর চিন্তার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
তৌকীর আহমেদের নির্দেশনায় নাটকটি কখনোই ভারী বা দুর্বোধ্য হয়ে ওঠেনি। দর্শনের জটিল বিষয়গুলোকে তিনি নাচ, গান, কোরাস, দেহভঙ্গি ও দৃশ্যরূপের মাধ্যমে সহজ ও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য নাটকে ব্যবহৃত গানগুলো—যেগুলো উদ্দেশ্যহীন সংগীতায়োজন নয়, বরং নাটকের ভাবনারই সম্প্রসারণ। যেমন, ‘অন্ধকারে হাঁটতে মানা, আলোর জোগাড় রাখিস/ দিনদুপুরে হাঁটতে গেলেও চোখটি খোলা রাখিস’—গানের কথাগুলো একই সঙ্গে জীবনবোধ ও দর্শনের সারবত্তা বহন করছে।
অভিনয় নাটকটির অন্যতম শক্তির জায়গা। বৃহৎ অভিনয়দলকে একই ছন্দে ধরে রাখা সহজ নয়। প্রধান ও সহ-অভিনেতারা চরিত্রান্তরের মুহূর্তগুলো দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন। বিশেষ করে একই অভিনেতার একাধিক চরিত্রে উপস্থিতি এবং সেই অনুযায়ী কণ্ঠ, শরীরী ভাষা ও অভিনয়ভঙ্গির পরিবর্তন প্রশংসার দাবিদার। যদিও কয়েকজন নবীন অভিনয়শিল্পীর ক্ষেত্রে দার্শনিক সংলাপের অন্তর্গত ভাব সম্পূর্ণভাবে আত্মস্থ করার আরও সুযোগ রয়েছে।
মঞ্চসজ্জা, আলোক পরিকল্পনা, পোশাক, প্রপস, সংগীত ও কোরিওগ্রাফি নাটকটির সামগ্রিক নান্দনিকতাকে সমৃদ্ধ করেছে। কোনো উপাদানই অপ্রয়োজনীয় মনে হয় না। নাটকে সবকিছু পরস্পরকে সম্পূরক করে সুষম নাট্যভাষা নির্মাণ করেছে। বিশেষ করে কোরাসের ব্যবহার এবং দৃশ্যান্তরের মসৃণতা নাটকটিকে এক ধরনের মায়াবাস্তব আবহ দিয়েছে।
তবে নাটকটি নিয়ে কিছু প্রশ্নও থেকে যায়। নাটকের ভাবগত শক্তি যত প্রবল, নাট্যদ্বন্দ্বের জায়গাটি ততটা সুস্পষ্ট নয়। তীর্থযাত্রীদের অনুসন্ধান আকর্ষণীয় হলেও সেই যাত্রার সংঘাত বা নাটকীয় উত্তেজনা সবসময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। ফলে দর্শক ভাবনার ভেতর ডুবে থাকলেও কাহিনিগত চূড়ান্ততার অনুভূতি কিছুটা অপূর্ণ থেকে যেতে পারে। এ ছাড়া ‘তীর্থযাত্রা’ শব্দবন্ধটি সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের ইঙ্গিত দেয়, অথচ নাটকের যাত্রীরা শেষ পর্যন্ত কোথাও পৌঁছান না। যাত্রাটাই হয়ে ওঠে মূল বিষয়। এটিকেই নাটকের দার্শনিক শক্তির জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করা গেলেও, এ বিষয়টিই দর্শকের কাছে প্রশ্নেরও জন্ম দিতে পারে।
সামগ্রিকভাবে তীর্থযাত্রী সমকালীন বাংলা নাটকের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। নাটকটি নিজের ভেতরের অন্ধকার, অহংকার, জ্ঞান ও সত্যের প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায়। নাটক শেষ হওয়ার পরও যার অনুরণন দীর্ঘ সময় ধরে মনে থেকে যায়।
শিল্পী মাইকেলেঞ্জেলোর একটি বিখ্যাত কথা আছে—ভাস্কর্য পাথরের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে, শিল্পীর কাজ শুধু অতিরিক্ত অংশগুলো সরিয়ে দেওয়া। তীর্থযাত্রীও যেন সেই কথারই নাট্যরূপ। সত্য আমাদের ভেতরেই আছে, প্রয়োজন শুধু আবরণগুলো সরিয়ে তাকে আবিষ্কার করা। এই আবিষ্কারের পথেই দর্শককে আমন্ত্রণ জানায় নাটকটি।