কবিতার কামরা

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:২৯ এএম

শাহাবুদ্দীন নাগরী

পি-পি সাইজ মুখশ্রী

স্মৃতি থেকে লাফ দিল একটা পি-পি সাইজ সাদা-কালো ছবি,

বাধাহীন কেড়ে নিল আমার রাতের স্বপ্নমগ্ন তন্দ্রার কাল,

সেই আউলা বয়সে হতে চেয়েছিলাম কাকজ্যোৎস্নার কবি,

মাকড়সার মতো বুনেছিলাম শব্দখেলার নিবিড় অন্তর্জাল।

 

ছবির ভেতর থেকে এক জীবন্ত মানবী উঠে আসে যদি!

যার জন্যে একটা আস্ত আকাশ নামিয়ে আনার পণ ছিল,

প্রস্তুত ছিলাম আঙুল ছিন্ন করে তাকে দেখাতে রক্তের নদী,

যাতনার ক্ষত মুড়ে দেবার মতো আমারও একটা মন ছিল।

 

ঔদ্ধত্যের দেয়াল ভেঙে হতে চেয়েছিলাম ঘাড়কুঁজো বিনয়ী,

হাতের ওপর নির্ভয়ে ঠোঁট রেখে স্বপ্ন ছিল রঙিন পাখি হব,

জানালায় ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ দেখে অনেকেই অযথা হতে চায় জয়ী,

অস্থির বিশ্বাসগুলো মুছে যায় ধুয়ে দেয় জলজ বর্ষা অভিনব।

 

জীবনের খোয়াবনামা পুড়ে পুড়ে ভস্ম হয় ব্যর্থ হই আমি,

সেই পি-পি সাইজ মুখশ্রী কেন এলো জাডনেন অন্তর্যামী।

আরিফ মঈনুদ্দীন

আমার নিয়তি

 

অন্ধকারে হঠাৎ ধবল জ্যোৎস্না ফুটে ওঠে

বোম্বেটে কজন আদমসন্তান প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে

স্ফটিক স্বচ্ছ কাচের বয়ামে কারও কারও আত্মা আজ বন্দি

আত্মার পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে—এসেছে

 

অবিমৃশ্যকারিতায় ভেষজ তেল ঘি ঢালতে ঢালতে

বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে চৌকোনো দুঃখের বাসর

আনন্দের বিপরীতে কাঁটার আঘাত

 

ফকফকে জ্যোৎস্না গায়ে মেখে দাঁত বের করে হাসছেন তারা

বুমেরাংয়ের কঠিন চপেটাঘাত

শরমের মাথা খেয়ে বসে আছে তারা

এখনো কত সময় বাকি কে জানে তা

আমি বন্দি কাচের বয়ামে—এই আমার নিয়তি

 

শাবিহ মাহমুদ

লাশ

 

একটা লাশ টানছে

আরেকটা লাশকে প্রবলভাবে

মুষল বৃষ্টির ফোঁটার মতো নির্লোভ কান্না

বিমর্ষ জিঘাংসার সন্তাপ গলতে থাকা মোমবাতি

নিটোল ত্রস্ত দুপুর ভেদ করা

বাস-ট্রাক-ভ্যান-অবৈধ হুইলার

নির্জন দূরের বনভূমি...

পাথুরে চোখে তাকায় একবার

পরক্ষণে প্রত্যেকেই নিজের কক্ষপথে

আমরা প্রত্যেকেই একেকটা লাশ

মহাসড়কের পাশে... খাদে পড়া


আদনান আলী

ভ্রান্তিবিলাস

 

রক্ত দিয়েছ কিছু, নিয়েছ অনেক

হে গোলাম, দাসত্বের কিংখাবে মুড়ে

দিন শেষে ধরে আছ মনিবের ভেক

জমিনের বুকে কত গুঁড়িয়েছ আশা

জানো কি, অর্থহীন শত বর্ষ শেষে

নীলের চুল্লিতে বাঁধে টিয়াপাখি বাসা?

 

তৃণলতা কুরচি

আম্রমঞ্জরির ঘ্রাণ

 

নীরবতা সাধনার ভাষা মেনে

জাগতিক কেওয়াজ ছেড়ে, নিজের ভেতর

হাঁটু মুড়ে বসে থাকি শূন্যতায়।

কানের লতায় ঝুলে থাকা মেঘনাদ,

ফুসমন্তরে বলে, ছায়াপথের কোথাও

ফুটেছে আরাধ্য আলোফুল।

বাতাসে দোল খায় না

পাপড়ি খসে পড়ে না দমকা হাওয়ায়

দূরাভিলাষী হাতে যায় না ছোঁয়া

শুধু করতলস্থ হয় প্রলম্বিত ছায়ায়।

আকাশের পথ চেয়ে থাকি,

বৃষ্টির কাছে একমুঠো জল পাবার আশায়

চাই প্রবল ঝরে দূরবর্তী আলো, মল্লার হয়ে

ঝরে যাক পায়ের পাতায়, আঙুল থেকে শুষে নিক

সমুদয় আম্রমঞ্জরির ঘ্রাণ

যেন-বা বৈশাখী পূর্ণিমা বুদ্ধের ছদ্মবেশ।

 

সৌমেন্দ্র গোস্বামী

উপমৃত্যু মুখরতা

 

শরীরকে বলেছি, এ সপ্তাহের ছুটি না নিয়েই

বৃহন্নলা যে করুণ বেদনার নীলিমা সাজায়

সেখানে একটু যাব। গন্ধর্বের ছোঁয়া নিতে নিতে

প্রাতকুসুমের ভোরে বিদর্ভের মতো মিশে গেছে

যে প্রাণ প্রকৃতি পুষ্প, বিচ্যুতির প্রান্ত বিন্দু শেষে

তাদের আড়াল হব। কতদিন গত হলো ফের—

কাম বাসনার মোহে যে প্রেমিক হারায়েছে প্রেম,

হারায়েছে কুমারীর শখে গড়া সলাজ বাসনা;

আমি তার রক্ত খাব নগরবধূর হাসি হেসে

তাড়নার ক্রোনোলজি যৌনতার রঙে যায় ভেসে

মৌন-মিহি আলিঙ্গনে জেগে ওঠে সমাধির ফুল

যে পুরুষ জেনে গেছে সব উপকবিতার নাম

তার পায়ে নত হব মন্দিরের পূজারির রূপে

নৈকট্যের ব্যথা সব তুলে নেব সাহসী শরীরে;

শরীরকে বলেছি, এ সপ্তাহের ছুটি না নিয়েই

অবিরত মাধুরীর মতো পরশ্রীকাতর হব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত