হুবহু চেহারা উঠাইবার দুইশ বছর

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৭:২০ এএম

অনেক আগেই লিখেছিলাম, পূর্ব বাংলার ফটোগ্রাফির আদি সময়টাকে ইতিহাসবন্দি করা যায় নাই। প্রথম দিকে যারা ক্যামেরা হাতে নিয়েছিলেন তাদের সঠিক হদিস আমরা করতে পারিনি। ১৮২৬ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে জোসেফ নিসেফোর নিয়েপস (১৭৬৫-১৮৩৩) প্রথম স্থায়ী আলোকচিত্র ধারণ করেন; কেউ কেউ অবশ্য ১৮২৭ সালের কথাও উল্লেখ করেছেন। ফটোগ্রাফির এমন একটি সূচনার জন্য মানবসভ্যতা উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সভ্যতার এই আড়ম্বরহীন সূচনার তেমন কোনো উচ্চকিত ঘোষণা ছিল না। ‘ক্লিক’ শব্দটি না শোনা গেলেও পৃথিবীর বিস্ময়কর ও অচিন্তনীয় এক অর্জনের সূচনা হয়ে গিয়েছিল। এই যাত্রার শুরু ধরে নেওয়া যায় একাদশ শতকে ইবনে আল-হাইথামের (৯৬৫-১০৪০) আলোকবিজ্ঞান ও অপটিকস-সংক্রান্ত আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। বিজ্ঞানের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের এই অগ্রগতির পূর্ণতা পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। আলোকবিজ্ঞানের জনক হাইথাম আমাদের প্রথম আলোকে নতুনভাবে চিনতে শিখিয়েছিলেন। আজও সেই আলোকেই আমরা ছবি সৃষ্টি করে চলেছি।

কিন্তু তার আলো, লেন্স যে যথেষ্ট ছিল না তা বুঝতে সাতশ বছর পেরিয়ে যায়। বুঝতে চেষ্টা করি হাইথাম থেকে নিসেফোর পর্যন্ত আমরা কোথায় ছিলাম। ভূগোলে পূর্ব বাংলার অস্তিত্ব ছিল কিন্তু বিজ্ঞানে ছিল শুধু অন্ধকার। তথাপি ইতিহাস বলছে, এ সময়েই বাংলার বহু সম্পদ বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে ইউরোপীয়রা বাংলায় এসে বুঝতে পেরেছিল, এ অঞ্চল কোনো ঘুমন্ত ভূগোল নয়। এখানকার বণিকরা জাহাজভর্তি পণ্য নিয়ে সমুদ্রপথে যেসব দেশে পৌঁছাতেন, সেসব দেশের ধনাঢ্য ও রাজপরিবারের মানুষ সেগুলোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ইউরোপ ‘ফটোস’ ও ‘গ্রাফোস’ মিলিয়ে ‘ফটোগ্রাফ’কে শনাক্ত করতে পারল, অথচ আমরা সে সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগও পেলাম না। তবে ১৮৪০ সালে কলকাতায় ক্যামেরার আগমন ঘটে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভারতজুড়ে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়। কিন্তু আমরা তখনো নীরব। পূর্ব বাংলার ঢাকা শহর বুঝতেই পারল না যে, ‘হুবহু চেহারা উঠাইবার’ এক নতুন যুগ শুরু হয়ে গেছে।

এখানকার বনেদি ও ব্যবসায়ী মহল যখন নীল, কাপড়, গুড়, পাট কিংবা চামড়া ইউরোপগামী জাহাজে তুলে দিতে ব্যস্ত, তখন কলকাতার রাস্তায় ধ্বনিত হচ্ছিল—‘মশাই, চেহারা উঠাইয়া লন।’ চোঙ্গা মুখে সেই আহ্বানে মানুষ ভিড় জমাচ্ছে। ফ্রান্সে এক দশক আগে যা ঘটেছিল, কলকাতা তা দ্রুত গ্রহণ করতে শিখে গেল। যে পরিবারগুলো এতদিন বিপুল সময় ও অর্থ ব্যয় করে ক্যানভাসে নিজেদের প্রতিকৃতি আঁকাত, তারা এখন স্বল্প খরচে মুহূর্তের মধ্যে ক্যামেরাবন্দি হতে শুরু করল। ভারতবর্ষের ভূখ-ে এমন এক দৃশ্যমান বিপ্লব শুরু হলো, যার সাক্ষী হয়ে উঠল একটি ছোট অন্ধকার ধাতব বাক্স—ক্যামেরা। সভ্যতার কী অপূর্ব জাদু! হাজার বছরের হাতে আঁকা চিত্রকলাকে নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল এই প্রযুক্তি।

ফটোগ্রাফি আধুনিক বিজ্ঞানের এমন এক মৌলিক আবিষ্কার, যার পেছনে বহু দেশের কৌতূহলী মানুষের প্রায় সাতশ বছরের সাধনা রয়েছে। মানবসভ্যতার দীর্ঘ এই অভিযাত্রা আজ সর্বব্যাপী অবদান রেখে চলেছে। কেন আমরা ফটোগ্রাফির এই অভিনব জগতে দ্রুত যুক্ত হতে পারিনি, তার কারণও স্পষ্ট। দৃশ্যশিল্পের প্রতি আমাদের ঐতিহাসিক অনীহা ছিল। ইমেজ, ছবি কিংবা আলোকচিত্রকে ঘিরে ধর্মীয় গোঁড়ামি, নিম্ন শিক্ষার হার এবং কলকাতার মতো সমৃদ্ধ মধ্যবিত্ত ও ধনী শ্রেণির অনুপস্থিতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অনুকূল ছিল না।

তবু ঢাকার নবাবরা ছিলেন ব্যতিক্রম। তারা আলোকচিত্রের ব্যাপারে যথেষ্ট সমঝদার ছিলেন। কলকাতা যখন বাবু-সংস্কৃতি ও মধ্যবিত্ত সমাজের মুখচ্ছবি ক্যামেরাবন্দি করছে, তখন ক্যামেরার লেন্সের ভেতর দিয়ে একটি সমাজের দৃশ্যমান ইতিহাস গড়ে উঠছিল। আর আমরা তখন ধান, পাট, কৃষিকাজ ও নৌযান নির্মাণে ব্যস্ত। সভ্যতার এই আলোকধারা গ্রহণে পিছিয়ে পড়া জাতি হিসেবে আমরা আলো দিয়ে নির্মিত চিত্রের গুরুত্বও যথাসময়ে অনুধাবন করতে পারিনি। বাঙালি সভ্যতার জন্য এটি এক গভীর সংকট।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রায় মধ্যভাগে পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় ফটোগ্রাফি চর্চা কেমন ছিল, তা নিয়ে গভীর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবে নবাব পরিবারের আলোকচিত্র-সংক্রান্ত কর্মকা- পর্যালোচনা করলে ধারণা করা যায়, ঢাকায় ফটোগ্রাফির প্রথম সূর্যোদয় ঘটেছিল বুড়িগঙ্গা তীরের আহসান মঞ্জিলে। নবাবরা প্রায় সবাই খাজা আলীমুল্লাহর উত্তরসূরি। তিনিই ১৮৫৪ সালে ঢাকার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন পর্যন্ত সেটিকেই পূর্ব বাংলার প্রথম আলোকচিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বিশ্ব ফটোগ্রাফির মহাসড়কে আমরা একেবারে পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশের আলোকচিত্র-নির্ভর অনেক অর্জন ও গৌরব রয়েছে। তবে সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার দিক থেকেও আমাদের অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রমী। মুক্তিযুদ্ধের ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে এখনো ফটোগ্রাফির পূর্ণাঙ্গ বিভাগ চালু করা সম্ভব হয়নি। শিল্পকলা একাডেমি নতুন বিভাগ চালুর ঘোষণা দিলেও সেটি কার্যকর হয়নি।

দৃশ্যশিল্পের সব শাখা যদি সমান গুরুত্ব না পায়, তবে আমাদের সাংস্কৃতিক অভিপ্রায় অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপে ফটোগ্রাফির আবির্ভাবের সময় অনেক চিত্রশিল্পী হতাশ হয়েছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, ক্যামেরা বাস্তবকে হুবহু ধারণ করতে পারে, যা হাতে আঁকা ছবিতে সম্ভব নয়। কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যেই ফটোগ্রাফি প্রমাণ করল, অন্যান্য দৃশ্যমান শিল্পের সঙ্গে তার কোনো বিরোধ নেই। বরং চিত্রকলার তুলনায় আলোকচিত্র বিভিন্নভাবে পুনরুৎপাদন করা সম্ভব, যা তাকে নতুন শক্তি দিয়েছে।

১৮২৬ সালের প্রথম স্থায়ী আলোকচিত্র থেকে আজকের ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত ফটোগ্রাফির ইতিহাস প্রায় দুইশ বছর অতিক্রম করেছে। এই দীর্ঘ যাত্রাকে শুধু প্রযুক্তিগত বিবর্তনের ইতিহাস বলা যায় না, বরং স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্ব সংরক্ষণে মানবজাতির এক অনন্য অর্জন হিসেবেই চিহ্নিত করতে হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেমন কৃতী আলোকচিত্রীদের হাত ধরে জাতির দৃশ্যমান ইতিহাস নির্মিত হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশেও সেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে যাচ্ছি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক ইতিহাসকে ধারণ করার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ দৃশ্যশিল্পভিত্তিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠা আজ সময়ের দাবি। ‘ফটোজিয়াম’ নামে ফটোগ্রাফির একটি আধুনিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠা এখন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। সংস্কৃতিবান মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে এটি বাস্তবায়িত হওয়া প্রয়োজন।

ফটোগ্রাফির ইতিহাসে প্রতিকৃতি বা পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। উনিশ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রতিকৃতি ছিল সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিগত স্মৃতির বাহক। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এসে এটি শিল্পের একটি স্বতন্ত্র ভাষায় পরিণত হয়, যেখানে একজন মানুষের মুখ শুধু তার চেহারা নয়, তার সময়, চিন্তা, সংগ্রাম ও সত্তাকেও প্রকাশ করে।

মানুষের মুখকে ইতিহাস ও শিল্পে রূপান্তর করার এই প্রয়াস আমাকে বরাবরই আকৃষ্ট করেছে। অসংখ্য বিশিষ্ট ব্যক্তি আমার ছবিতে স্থান পেয়েছেন। এগুলো কেবল আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক বিশাল ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টেশন। যখন দেশে ফটোগ্রাফির জন্য পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান, পাঠ্যক্রম বা শিল্পবাজার ছিল না, তখন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও নিরলস সাধনার মাধ্যমে একটি নতুন পথ নির্মাণের চেষ্টা করেছি। একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক মুখচ্ছবির ইতিহাস সংরক্ষণকে আমি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে মনে করেছি।

আমার ক্যামেরা সময়কে থামিয়ে দিয়েছে, অথচ সেই স্থিরচিত্রগুলোর মধ্যেই সময়ের প্রবাহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বলা যায়, ফটোগ্রাফির এই দুইশ বছরের ইতিহাসে আমি এবং আমার ক্যামেরা এক অনন্য ‘আই উইটনেস’। আমার ছবিগুলো শুধু একটি যুগের দলিল নয়, এগুলো একটি সভ্যতার স্মৃতি এবং সৃষ্টিশীল মানুষের অন্তর্জগতের মূল্যবান ভাষা। বিশ্ব ইতিহাসের এই দুইশ বছরের কোলাহলের মধ্যে গত ৫৬ বছর ধরে আমি এবং আমার আলোকচিত্র নিজস্ব আলো ছড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে চলেছি।

ফটোগ্রাফির অতীত নিয়ে ক্রমবর্ধমান অনুসন্ধান মানবচিন্তা ও কর্মকান্ডের বহু নতুন দিক উন্মোচন করেছে। অন্য কোনো দৃশ্যশিল্প সম্পর্কে হয়তো এত জোরালোভাবে এ কথা বলা যায় না। এর বিস্তৃত আবিষ্কার ও বিবর্তন এখনো ইতিহাসবিদ ও সমালোচকদের জন্য এক বিশেষ চ্যালেঞ্জ। বৈচিত্র্য, প্রাণচাঞ্চল্য ও সৃজনশীলতার যে পুনর্জন্ম ফটোগ্রাফি ঘটিয়েছে, তা শুধু ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেনি; মানুষের দৃষ্টিবোধ, অভ্যাস ও চিত্রগত জ্ঞানকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় এর অবদান প্রত্যক্ষ ও সুদূরপ্রসারী। ফটোগ্রাফির ব্যবহার আজ শুধু বিজ্ঞান বা শিল্পের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। মানবজাতির দৃশ্যনির্ভর ভাষার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে আলোকচিত্র। অতীত সংরক্ষণ থেকে ভবিষ্যতের ভিজ্যুয়াল পরিকল্পনা—সব ক্ষেত্রেই আলোকচিত্রের গুরুত্ব স্বীকৃত।

ফটোগ্রাফি শুধু দেখার বা স্মৃতি উপভোগের মাধ্যম নয়। বহু আগেই এটি মানবসমাজের অস্তিত্বের ভূগোলে প্রবেশ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে পৃথিবী থেকে মহাকাশের দূরতম অঞ্চল পর্যন্ত দৃশ্যমান ইতিহাস ধারণের অভিযানে ফটোগ্রাফি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ভিনগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকলে তার বাস্তব চিত্র ধারণের লক্ষ্যেও যৌথ বৈজ্ঞানিক অভিযান চলছে। ফটোগ্রাফি ছাড়া আধুনিক বিজ্ঞান এককভাবে এগোতে পারে না।

পৃথিবীর মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই দিনের জন্য, যেদিন আমাদের সৌরজগৎ কিংবা তার বাইরের সম্ভাব্য প্রাণের দৃশ্যমান প্রমাণ আমরা প্রত্যক্ষ করব। সেদিন ক্যামেরা আরেকটি নতুন শিখরে পৌঁছাবে এবং দৃশ্যশিল্পের সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করবে। পৃথিবীর সব মানুষ সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের অংশীদার হতে চাইবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত