নিখোঁজ রোদ

এক রোদের দিনে বাবার মতো মিগেলও নিখোঁজ হয়েছিল। দুই দিনই সকাল থেকে রোদ ছিল টানা, ইলিশের আঁশের মতো চকচকে, ঝকঝকে। দুজনের নিখোঁজ সংবাদ চারদিকে রটিয়ে দিয়ে দুদিনই বিনা নোটিসে রোদ নিখোঁজ হয়েছিল। ম্যাড়ম্যাড়ে আলো ঠাসা ঘরে বসে আমি আর মা রোদের অপেক্ষায় থেকেছি। রোদ আসেনি। বাবা বা মিগেল, দুজনের কেউই আসেনি।

কোন ফাঁকে মিগেল ঘর ছেড়েছিল বা কে ওকে ঘর থেকে নিয়ে গেছে বা বের করে দিয়েছে তা জানতেও পারিনি। ওর জন্য দৌড়েছি, ছুটেছি, হন্যে হয়ে দৃষ্টিসীমার ভেতরে বাইরে সর্বত্র খুঁজে দেখেছি। পাইনি। এর এক সপ্তাহ পর ফেসবুকে একটা রিলসে দেখেছি, মিগেলের মতোই ছোট্ট একটা বাদামি-সাদা দেহ একটা প্রাইভেট কারের নিচে চাপা পড়েছে। প্রাণহীন রক্তাক্ত দেহটা দেখে উত্তেজনায় নিচের ঠোঁটে এমন করে কামড় বসিয়েছিলাম যে চামড়া কেটে রক্ত বেরিয়ে গেছে। অন্তত দশবার রিলসটা দেখার পর বুঝেছি ওটা আমার মিগেল না।

মিগেলের নাম ধরে ডাকলেই ও আমার ঘরে চলে আসত। মেঝেতে শুয়ে বারান্দার গ্রিল পেরিয়ে আসা রোদের ওম নিত। এই বাড়ির চারদিকে আট, দশ তলা ভবন উঠে গেছে। একেবারে নিচে তলিয়ে থাকা আমাদের বাড়ির তিন বারান্দায় তবু তরতাজা রোদ থাকত। মিগেল রোদ ভালোবাসত খুব, খাবার খেয়ে আয়েস করে লিটারবক্সে কাজ সেরে নিয়ে বারান্দার দরজার কাছে এলিয়ে পড়া রোদ গায়ে মেখে ঘুমিয়ে পড়ত। একই ঢঙে ভাতঘুম দেয় মা। হঠাৎ হঠাৎ জেগে উঠে আমার নাম ধরে ডাকে।

‘অপু, অপু...পু...’ হঠাৎ হঠাৎ মা এমনভাবে ডেকে ওঠে যে মনে হয় মিগেলের ফিরে আসার সংবাদ জানাবে। কিন্তু না, ‘খাইতে আয়’ বলে মা স্টিল, সিলভারের বাসনে ঝনঝনে আওয়াজ তোলে। মা শব্দ ছাড়া কাজই করতে পারে না। এমনকি মা খায়ও শব্দ করে। মায়ের হাঁটা, চলা, ঘুম সবকিছুতেই শব্দের আধিক্য থাকে। আর বাবার সব কাজ হয় নিঃশব্দে। একদিন বাবা নিঃশব্দেই দ্বিতীয় বিয়ে করে বাসা ছেড়ে চলে গেছে। এ নিখোঁজ হওয়া না, উপেক্ষা করে চলে যাওয়া। মা বিষয়টা বুঝতে পারে তাই বাবাকে খোঁজে না আর, কিন্তু আমি মিগেলকে খুঁজে বেড়াই।

মিগেলকে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করি, আকাশের মেঘ মেঘ ভাব কাটছে না, ইলিশের আঁশের মতো চকচকে ঝকঝকে রোদও উঠছে না আর। আমাদের ঘরদোর, মেঝে, দেওয়াল ভেজা ভেজা স্যাঁতসেঁতে হয়ে থাকছে। মা রোদের আশায় বারান্দায় যাচ্ছে, আসছে। রোদের দেখা মিলছে না। ম্যাড়ম্যাড়ে আলোভর্তি ঘরে রোদ ঢুকানোর আশায় মা জানালার সব পর্দা খুলে রেখেছে। কোনো লাভ হচ্ছে না। মায়ের কিছু একটা লাভ হচ্ছে বটে, মেঘলা দিনে খিচুড়ি পোলাও খেতে মজা বলে ইকবাল মামার ফরমায়েশে প্রায় রোজই বাসায় এসব রান্না হচ্ছে। বাজারভর্তি ব্যাগ নিয়ে দরজায় পা দিয়ে, ‘সখিনা সখিনা’ বলে ডেকে মামা রোদ না ওঠার দুঃখ ভুলিয়ে দিচ্ছে।

মা জানে না, মায়ের নাম সখিনা বলে মায়ের ভেতরে কোনো আফসোস না থাকলেও আমার ভেতরে আছে। এমন একটা নামের জন্যই বাবা চলে গেছে—এই কথা মাকে বললে মা হেসেই উড়িয়ে দেবে, তাই মাকে কিছু বলি না। আমার নাম সুন্দর, অপর্ণা জাহান, সবাই ডাকে অপু। রুচিশীল বাবার সন্তান হিসেবে আমি গ্রীবা উঁচু করেই চলতাম। আর কেউ মায়ের নাম জানতে চাইলে কখনো বলতাম না। মিগেলের নাম বলতাম।

ইকবাল মামা প্রথমদিন মিগেলের নাম শুনে বলেছিল, ‘বিলাইয়ের নাম আবার মিগেল হয় নাকি, বিলাইয়ের নাম হয় মিনি। এসব মিনি ফিনি বাড়িতে রাইখো না, এদের লোম থেইকা অসুখ-বিসুখ হয়। জাউরাগুলা খামচি দিলে তো আরও সর্বনাশ ঘটে।’ সর্বনাশের নেশাতেই মেতেছিল মিগেল। সুযোগ বুঝে একদিন নখ বসিয়ে আচ্ছামতো ইকবাল মামাকে খামচে দিয়েছিল, আরেক দিন সোফায় হেলান দিয়ে বসে থাকা অবস্থায় পি করে তার মাথার চুল ভিজিয়ে দিয়েছিল। এরপর দিন থেকেই মিগেলকে খুঁজে পাচ্ছি না। মিগেল না বলে কোথাও চলে গেছে। যেভাবে বাবা চলে গেছে।

বাবা তার নতুন সংসারে চলে যাওয়ার পর আমি পাঁচ মাস ঘর থেকে বের হইনি। এর ভেতরে টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেছে। কলেজ থেকে জানিয়ে দিয়েছে টেস্টে উত্তীর্ণ না হওয়ায় আমি এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারব না। অনেক কিছুই করতে পারব না এই রোদহীন জীবনে—জেনে যাওয়ার পর পরীক্ষা দিতে না পারার পরিণতি আমাকে আর কাবু করতে পারে না। মাকেও কাবু করতে পারে না। বাবা আমাদের এই একতলা বাড়িটা ডেভেলপারকে দিয়ে দিয়েছে, মাসখানেকের মধ্যে এই বাড়ি ছেড়ে আমাদের চলে যেতে হবে—এসব খবরও মাকে কাবু করতে পারে না। মা শুধু কম খেলে কাবু হয়।

অপু, অপু...পু...মা খেতে ডাকছে প্রতিদিনের মতোই। সামনে না যাওয়া পর্যন্ত মা ডাকতেই থাকবে। মাকে বরাবর এমনই দেখছি, দম বের হয়ে যাওয়ার মতো আর্তনাদে আমার নাম ধরে মা ডাকতেই থাকবে, ডাকতেই থাকবে। কপালে ভাঁজ তুলে ছুটে গিয়ে সামনে দাঁড়ালেই বলবে, ‘নাশতা খাইছিস বাবা?’

অপু মানে অপর্ণা মানে আমাকে ‘বাবা’ই ডাকে মা। মায়ের মাথার ভেতরে কী কাজ করে কে জানে, বাবা ডাক শুনলে আমার মাথার ভেতরে এখন অনেক চিন্তা আসে। আর মায়ের মাথার ভেতরে তিনবেলা খাবার পরিবেশন করার চিন্তা ছাড়া আর কিছুই আসে না। পুরনো অ্যালবাম ঘেঁটে দেখেছি একটা সময়ে মায়ের দেহকাঠামো আকর্ষণীয় আর ধারালো ছিল। এখন দেখি মায়ের চর্বিসর্বস্ব দেহ। বাবা বাড়ি ছাড়ার পর মায়ের ওজন আরও বেড়েছে। যখনই মায়ের মুখোমুখি হই তখনই দেখতে পাই মায়ের মুখ চলছে। বাবা না থাকলে না খেয়ে মরতে হবে আশঙ্কা করেছিল শুভাকাক্সক্ষীরা। আমার এখন মনে হয়, বাবা নেই বলে একদিন খেতে খেতেই মা মরে যাবে।

রোদহীন দুপুরের প্রবল নিস্তব্ধতা ভেঙে মা আবার ডাকছে, ডাকছে... অপু, অপু... পু...। মনে হচ্ছে একটা বড়সড় পাথর গড়িয়ে পড়ছে, চারদিকের বাড়িঘরের জানালার কাচ ভেঙে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। কাচ গড়াচ্ছে, পাথর গড়াচ্ছে, গড়াচ্ছে... গড়াতে গড়াতে পাথরটা এসে বুকের ঠিক মাঝখানে ঢুকে গেছে, কিছু ভাঙছে না, কোনো শব্দ হতে দিচ্ছে না, হৃৎপি-কে কেবল ধমাধম বাড়ি মেরে থেঁতলে দিচ্ছে।

সহ্য করতে না পেরে ছুটে এসে দুই কান চেপে মায়ের সামনে এসে দাঁড়াই। দেখতে পাই, মায়ের মুখ চলছে। পাকা আম খাচ্ছে মা। মায়ের ঠোঁটের আশপাশে আমের হলুদ রঙ মাখামাখি হয়ে আছে। আমাকে দেখে গাল ভরে হেসে মা বলে, ‘অরজিনাল হিমসাগর আম, তোর ইকবাল মামা একেবারে রাজশাহী থেকে আনছে। রোদ নাই, তাই আমসত্ব দিতে পারতেছি না। কী করমু বল, এত আম না খাইলে নষ্ট হইয়া যাইব। খা, খাইয়াই দ্যাখ, একটা মুখে দিলে এক বসায় দশটা খাইয়া ফেলবি।’ মা এক বসায় দশটা আমই খেয়েছে। মাকে মিগেলের মতো দেখাচ্ছে, থলথলে গোলাকার। চর্বিসর্বস্ব শরীরের ভার টানতে না পেরে মা মিগেলের মতোই নেতিয়ে পড়েছে।

মায়ের দুঃসম্পর্কের ভাই ইকবাল মামা এলে মা কষ্ট করে চাঙা হওয়ার চেষ্টা করে। পরনের ম্যাক্সি নামক আলখেল্লা খুলে শরীরের খাপে খাপে বসানো সালোয়ার-কামিজ পরে, ছুটে ছুটে চা-কফি বানায়। বিরিয়ানি বা পোলাও, রেজালা, কোরমা রান্না করে। এরপর লবণ দেখতে দেখতে বাটি ফাঁকা করতে থাকে। ইকবাল মামার খাওয়ার দিকে বেশি আগ্রহ নেই। তার হালকা-পাতলা শরীরটা দেখে মনে হয়, খাওয়ার রুচিই নেই। মায়ের রান্না বিরিয়ানি তবু আগ্রহ নিয়ে খায় মামা। রান্নার তারিফও করে। আর মা মামার বাজারের তারিফ করে। শুনে ইকবাল মামার মুখ রোদ ঝলসানো মাছের মতো চকচক করে ওঠে, সে কথা দেয় অচিরেই তিন কেজি ওজনের একটা আস্ত রুই মাছ নিয়ে আসবে।

আমাদের দুজনের সংসারে আজ তিন কেজি ওজনের রুই মাছ এসেছে। এমনিতে এই বাড়িতে ইকবাল মামা ছাড়া তেমন কেউ আসে না। মামার সঙ্গে রুই মাছ আসায় মা খুশি মনে রান্না করতে চলে গেছে। মায়ের প্রায়ান্ধকার ঘরের বিছানায় শুয়ে আছে ইকবাল মামা। কাজ শেষ করে তরকারির লবণ চেখে মা মিগেলের মতো হেলেদুলে ঘরের ভেতরে ঢুকেছে। মামা হুট করে ঘরের বাইরে চলে এসেছে। আর একশ কেজি ওজন টেনে ক্লান্ত মা মামার জায়গায় শুয়ে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ঘো ঘো শব্দ তুলে ঘুমিয়ে পড়েছে। টেরও পায়নি, ইকবাল মামা আমার ঘরে এসে আমাকে অনেক অনেক আদরের নামে ডাকছে।

কোনো নামেই সাড়া দিচ্ছি না আমি। মিগেলের মতো থাবার ভেতরে লুকিয়ে রাখা ধারালো নখ বের করেছি। নখের আঁচড় লাগলে শরীরে সুই ফুটাতে হবে আগেরবারের মতো সেই ভয়েই কি না কে জানে, ইকবাল মামা দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। মা কখন ঘুম থেকে উঠে গেছে জানি না। উঠেই রুই মাছের ঝালঝোলের তরকারি ভর্তি বাটিটা ইকবাল মামার গায়ে ছুঁড়ে মেরেছে। মামা দৌড়ে দরজার বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে মা তাড়া করতে করতে শ্রবণ অযোগ্য সব গালি দিচ্ছে, ‘... শুয়োরের বাচ্চা তোকে যদি আর আমার বাড়িতে দেখি! তোর হাল যদি... মতোন না করি তাইলে আমার নামও সখিনা না।’

এই প্রথম মায়ের নামটা মাধুর্যপূর্ণ লাগছে। আমি মনে মনে শত সহস্রবার ডাকছি, ‘সখিনা... সখিনা।’ আর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া রোদটা আচমকা ফিরে এসে আমাদের ঘরদোর আলোয় ভাসিয়ে দিচ্ছে।