বেনজীরকে ফেরাতে পাঠানো হয়েছে নথি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ফেরাতে ১৪৪ পাতার নথি তৈরির পর আরবি ভাষায় অনুবাদ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সরকারের কাছে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। আমিরাত সরকার যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শিগগির বেনজীরকে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। গতকাল শনিবার দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ কথা বলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৫ পুলিশ সদস্যের পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে কথাও বলেন মন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ৩০ দিন নয়, ঘটনার পরের দিনই কাগজপত্র পাঠিয়েছি। ওয়ারেন্ট, মামলার বিবরণীসহ অনেক কাগজ দেওয়া হয়েছে। সেটা আবার আরবিতে অনুবাদ করতে হয়েছে। পুলিশ অফিসাররা ১৪ জুন রাত ৯টা পর্যন্ত ১৪৪ পাতার নথিপত্র তৈরি করেছেন। রাত ১০টার সময় সংসদে বসে আমি সেটি সই করেছি। সেদিনই কাগজপত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুবাইয়ে পাঠিয়েছে এবং লোকাল ইউএই রাষ্ট্রদূতকে জানানো হয়েছে। দুবাই থেকে বেনজীর আহমেদকে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে কি না জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে মনে করার বিষয় নয়, দেখার বিষয়। আমরা আশা করি, দেশটির সরকার যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে খুব শিগগির বেনজীর আহমেদকে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। আমরা পারসুয়েশনে থাকব।’

বেনজীরের বিষয়ে নথি পাঠানোর পরে কোনো উত্তর এসেছে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘তারা এখনো কিছু পাঠায়নি। তাদের দেশের আইন অনুসারে ফেরত পাঠানোর একটা প্রক্রিয়া আছে। শুক্র-শনিবার সেই দেশে হলিডে। কাল রবিবার (আজ) আমরা অফিসিয়ালি খোঁজ নেবো।’ আরব আমিরাতের সঙ্গে বন্দিবিনিময় চুক্তি আছে কি না এবং কোন প্রক্রিয়ায় বেনজীর আহমেদকে ফেরত আনা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এনসিবি ও ইউএই ফেডারেল পুলিশ ডিপার্টমেন্ট আমাদের ইমেইলে অনুরোধ করেছে ৩০ দিনের মধ্যে কাগজপত্র পাঠাতে। চুক্তি থাকুক আর না থাকুক ইউএন চার্টার অনুসারে আমরা কিছু কিছু বিষয়ে স্বাক্ষরিত দেশ। সেখানে তারাও (ইউএই) সই করেছে। ইউএইর সঙ্গে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স রিকুয়েস্ট (এমএলএআর) চুক্তি রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় বেনজীরকে ফেরত আনতে জটিল হবে না।

১৫ পুলিশ সদস্য পুরস্কৃত : কর্তব্যনিষ্ঠা, সাহসিকতা ও জনহিতকর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ চারটি বিশেষ ঘটনায় গতকাল পুলিশের ১৫ সদস্যকে পুরস্কার, সনদ ও আর্থিক সম্মানী প্রদান করেন মন্ত্রী। পরে ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অপরাধ দমন এবং মানবিক দায়িত্ব পালনে পুলিশের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। তাদের ভালো কাজকে উৎসাহিত করতেই এ ধরনের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।

পুরস্কারপ্রাপ্ত চারটি ঘটনার মধ্যে রয়েছে জনভোগান্তি লাঘবে ট্রাফিক পুলিশের উদ্যোগ, আদাবরে অস্ত্রধারী ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারে সাহসিকতা, আনোয়ারার চাঞ্চল্যকর মা-মেয়ে হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন এবং চকরিয়ার আলোচিত ডাকাতি ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার আসামিদের গ্রেফতার।

পুরস্কার পেলেন হামলার শিকার ওসি-এসআই : গত ১৬ জুন আদাবর মফিজবাগ এলাকায় বিকাশের দোকানে ছিনতাইয়ের ঘটনায় অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হন থানার ওসি ও এক এসআই। পুলিশের পাল্টা অভিযানে দুই ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধসহ মোট চারজন আটক হয়। এ ঘটনায় সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে ওসি মো. জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীরসহ ছয় পুলিশ সদস্যকে পুরস্কৃত করা হয়।

ড্রেনের মুখের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার : গত ১০ জুন কুড়িল বিশ্বরোড ফ্লাইওভারের লুপ-টু অংশে ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে ট্রাফিক গুলশান বিভাগের বাড্ডা জোনের কনস্টেবল মো. কামরুজ্জামান নিজ হাতে ড্রেনের মুখের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেন। এতে দ্রুত যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘পুলিশ ফোর্স এক্সেমপ্লারি গুড সার্ভিস ব্যাজ’, অর্থ পুরস্কার ও প্রশংসাপত্র দেওয়া হয়।

মা-মেয়ে হত্যার ঘটনা উদঘাটন : চট্টগ্রামের আনোয়ারার চেনামতি এলাকায় মা ও মেয়ে হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উদঘাটন করে মূল আসামি রিমন বড়ুয়াকে গ্রেপ্তার করায় চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও আনোয়ারা থানার চার সদস্যকে সম্মাননা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল, এসআই শিমুল চন্দ্র দাস, এসআই মোহাম্মদ আবু সেলিম রেজা এবং কনস্টেবল মো. রিমন হোসেন।

মা-মেয়েকে ধর্ষণের আসামি গ্রেপ্তার : কক্সবাজারের চকরিয়ায় ডাকাতি ও মা-মেয়েকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের আলোচিত ঘটনায় দ্রুত অভিযান চালিয়ে সাত আসামিকে গ্রেপ্তার এবং ভুক্তভোগীদের উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করায় মাতামুহুরী তদন্ত কেন্দ্রের চার পুলিশ সদস্যকে পুরস্কৃত করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশ পরিদর্শক (ইনচার্জ) মো. মাসুদ, এএসআই সজীব দাস, কনস্টেবল মাহফুজুর রহমান এবং কনস্টেবল হেফাজত হোসেন।

আওয়ামী লীগ একটি ‘মাফিয়া সংগঠন’ : কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ‘মাফিয়া সংগঠন’ আখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দলটি ২৩ জুন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। এ আশঙ্কায় সারা দেশে পুলিশকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সতর্কতা জারি করা আমাদের দায়িত্ব। ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি সংগঠন কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। পুলিশ সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবে।

আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে দেখেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি মাফিয়া সংগঠন। তারা দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। সে কারণেই সারা দেশে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কোথাও যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

এর আগে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সব মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিদের কাছে একটি জরুরি বার্তা পাঠায়। সেখানে ‘প্রয়োজনীয় সতর্কতা’ ও ‘নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা’ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২৩ জুন আওয়ামী লীগ দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করতে পারে। এসব কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অন্য রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে এনসিপি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে আগাম নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।